যুদ্ধ ব্যবসা: প্যালেন্টিয়ারের অন্ধকার দিক ও মানবতার সংকট
মাফিকুল ইসলাম
নতুন পয়গাম, ৬ সেপ্টেম্বর:
কল্পনা করুন, আপনি কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটছেন, হঠাৎ আপনার ফোনের ক্যামেরা, আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারি করছে এবং কোথাও একটি কম্পিউটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আপনি বাঁচবেন কী মরবেন। কি ভয়ঙ্কর, তাই না? গাজার ধ্বংসস্তূপে এমনই ঘটছে, যেখানে প্যালেন্টিয়ার নামক এক আমেরিকান কোম্পানির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ড্রোন হামলায় নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। ২০২৩ সালে গাজায় ইসরাইলের ড্রোন হামলায় ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হয়, যার মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। প্যালেন্টিয়ারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই টার্গেটিংয়ে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রযুক্তি যদি কলকাতার রাস্তায় বা ভারতের কোনো শহরে চালু হয়, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা আর নিরাপত্তার কী হবে?
প্যালেন্টিয়ার, আমেরিকার মিলিটারি ও ন্যাটোর সঙ্গে কাজ করা একটি সার্ভেইলেন্স জায়ান্ট, যুদ্ধকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। এই কোম্পানি তাদের গোথাম ও ফাউন্ড্রি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ করে টার্গেট কিলিংয়ের জন্য নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করে, যা আফগানিস্তান থেকে ইরান পর্যন্ত নিরীহ মানুষের ওপর হামলার কারণ হয়েছে। এই কলামে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে প্যালেন্টিয়ার যুদ্ধের অর্থনৈতিক চক্র সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং কেন ইসলামের শিক্ষার আলোকে মুসলিম যুবকদের এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
প্যালেন্টিয়ার নামটি শুনলে মনে হতে পারে এটি কেবল আরেকটি প্রযুক্তি কোম্পানি, কিন্তু এর আসল চেহারা অনেক ভয়াবহ। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আমেরিকান কোম্পানির পেছনে রয়েছেন পিটার থিল ও অ্যালেক্স কার্প, হার্ভার্ড ও স্ট্যানফোর্ডের পড়ুয়া, যারা তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যুদ্ধকে ব্যবসার রূপ দিয়েছে। তাদের গোথাম প্ল্যাটফর্ম বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ করে, যা আমেরিকার মিলিটারি ও ন্যাটো ব্যবহার করে টার্গেট কিলিংয়ের জন্য। আফগানিস্তানে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাজার হাজার ‘সন্দেহভাজন’ মানুষকে টার্গেট করা হয়েছিল, অথচ পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০০১–২০২১ আফগান যুদ্ধে নিহত প্রায় ২ লক্ষ ৪৩ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন সাধারণ নাগরিক। ইরাকেও একই গল্প ২০০৩ সালের পর মার্কিন ড্রোন হামলায় প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এই হত্যাযজ্ঞের পিছনে যে প্রযুক্তি কাজ করেছে, তার অন্যতম অংশীদার প্যালেন্টিয়ার। গাজায় ২০২৩-২৪ সালে ইসরাইলি হামলায় তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, যা ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। এটি কোনো নির্দোষ প্রযুক্তি নয়, এ যেন এক অদৃশ্য চোখ, যা সব দেখে এবং হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। প্যালেন্টিয়ার শুধু ডেটা বিশ্লেষণ করে না; বরং যুদ্ধের প্রক্সি হিসেবে কাজ করে, মানুষের জীবনকে মুনাফার হিসেবে গণনা করে।
প্যালেন্টিয়ারের মতো কোম্পানিগুলো যুদ্ধকে শুধু ধ্বংস নয়, মুনাফার মেশিনে পরিণত করেছে। আমেরিকার করদাতাদের টাকায় যুদ্ধের অর্থায়ন হয়, আর সেই টাকা কর্পোরেশনের পকেটে ঢোকে। ২০২৪ সালে প্যালেন্টিয়ার ডিপার্টমেন্ট অফ ডিফেন্সের কাছ থেকে ৭৯৫ মিলিয়ন ডলারের কন্ট্র্যাক্ট বা বরাত পেয়েছে, আর আইসিই-এর সঙ্গে ৩০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে অভিবাসীদের নজরদারির জন্য। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২০১৭ সালে আমেরিকার মিসিসিপিতে ৬৮০ জন অভিবাসীকে গ্রেফতার করা হয়, যার মধ্যে অনেকে ছিল নিরীহ শ্রমিক। এই অর্থনৈতিক চক্র আরও গভীরে যায়, ২০২৪ সালে প্যালেন্টিয়ার লবিংয়ে ৫.৭৭ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের প্রভাবিত করতে। ফলাফল? ট্রাম্প প্রশাসনে তাদের প্রভাব বেড়েছে, যারা তাদের ফাউন্ড্রি সফটওয়্যার ব্যবহার করে অভিবাসীদের ট্র্যাক করছে। এটি একটি নোংরা চক্র: যুদ্ধ সৃষ্টি করে লাভ, আর লাভ দিয়ে ক্ষমতা কেনা।
প্রযুক্তি মানবকল্যাণের জন্য হলেও, প্যালেন্টিয়ার সেটিকে রূপ দিয়েছে রক্তঝরা অস্ত্রে। গাজায় সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েলি সেনারা যে ‘এআই টার্গেটিং সিস্টেম’ ব্যবহার করেছে, তার পেছনে প্যালেন্টিয়ার প্রযুক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে কোন ঘরবাড়ি বা বিল্ডিং ধ্বংস হবে, কোন গাড়ি টার্গেট হবে, সিদ্ধান্ত আসে সফটওয়্যারের পরামর্শে। ফলে নভেম্বর ২০২৩ গাজায় ১৫ জনের একটি পরিবার মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ ধরনের টার্গেট কিলিং শুধু গাজাতেই নয়; ইরান ও আফগানিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলাতেও একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। আফগানিস্তান যুদ্ধে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহতদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সাধারণ মানুষ। অথচ প্যালেন্টিয়ারের ফাউন্ডাররা দাবি করেন, যুদ্ধ আর নজরদারির মাধ্যমেই বিশ্বে ‘শান্তি’ আসবে। বাস্তবে তাদের প্রযুক্তি শান্তি নয়; বরং নিরীহ মানুষের কান্না আর রক্তের স্রোত তৈরি করছে।
কুরআনের সূরা বাকারার ২০৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করেছেন: ‘যারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংস সৃষ্টি করে, তারা নিজেদের কাজকে সংস্কার বলে দাবি করে।’ প্যালেন্টিয়ারের কাজ এই আয়াতের আলোকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, তারা উন্নয়নের নামে ধ্বংস ডেকে আনে। গাজায় তাদের এআই সিস্টেম নিরীহ মানুষকে টার্গেট করেছে, যেমন ২০২৩ সালে আল-শাতি ক্যাম্পে হামলায় ৫০ জন নারী ও শিশু নিহত হয়। আফগানিস্তানে তাদের গোথাম প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ড্রোন হামলায় স্কুল ও হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে। এই বিশৃঙ্খলা কুরআনের শিক্ষার পরিপন্থী। মুসলিম বিশ্বকে এই ধ্বংসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের হৃদয়ে বেদনা জাগে যখন দেখি, প্রযুক্তির নামে মানবতা পিষ্ট হচ্ছে। কুরআন আমাদের শিখিয়েছে, ন্যায় ও শান্তির পথে লড়তে, আর এই সংকটে আমাদের সেই পথে হাঁটতে হবে।
প্যালেন্টিয়ারের মতো কোম্পানির হাতে নিজেদের মেধা বিক্রি করবেন না। ভারতের মুসলিম তরুণরা, যারা বেঙ্গালুরু বা কলকাতার টেক হাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সফটওয়্যারে কাজ করছেন, তাদের উচিত নিজেদের দেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি তৈরি করা। মুসলিম বিশ্বকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে জেগে উঠতে হবে, যাতে আমরা অন্যায়ের এই চক্রের অংশীদার না হই। চোখ বন্ধ করে প্রযুক্তির নামে যুদ্ধ ব্যবসার সাফল্যকে হাততালি দেবেন না। বরং সচেতনতা ছড়িয়ে দিন, নিজেদের সন্তানদের শিক্ষিত করুন এবং মানব কল্যাণমুখী প্রযুক্তি নির্মাণে তাদের উৎসাহিত করুন। কুরআনের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করায়, অন্যায়ের সহযোগী হইও না; বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াও।
মুসলিম যুবসমাজের প্রতি আহ্বান, প্যালেন্টিয়ারের মতো কোম্পানির হাতে নিজেদের মেধা বিক্রি করবেন না। ভারতের মুসলিম তরুণরা, যারা বেঙ্গালুরু বা কলকাতার টেক হাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সফটওয়্যারে কাজ করছেন, তাদের উচিত নিজেদের দেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি তৈরি করা। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের DRDO ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যেখানে ২০২৪ সালে ১২০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ হয়েছে। প্যালেন্টিয়ারের মতো কোম্পানি ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধে অংশ নিয়ে মুনাফা করেছে ১.৭ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু আমাদের তরুণ-যুবরা এই ধ্বংসের অংশ হবে কেন? আল্লাহর নির্দেশনায় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কাজ করুন।
আজকের আলোচনায় আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, প্যালেন্টিয়ারের মতো কোম্পানিগুলো প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে মুনাফার জন্য, কিন্তু এর মূল্য দিচ্ছে নিরীহ মানুষ। গাজা, ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা অভিবাসনবিরোধী অভিযানে তাদের সফটওয়্যার মানুষের রক্তে রঞ্জিত। মার্কিন করদাতাদের টাকা দিয়ে এই যুদ্ধ ব্যবসার জাল বোনা হচ্ছে, আর রাজনৈতিক লবিংয়ের মাধ্যমে তারা শাসক দলের নীতিকে প্রভাবিত করছে। এটি একটি দুষ্টচক্র, যুদ্ধ সৃষ্টি হয়, যুদ্ধ থেকে লাভ হয়, আর সেই লাভ দিয়ে নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মানবতার জন্য এ এক ভয়ঙ্কর সংকেত।
কিন্তু এ সংকট আমাদের নিরুপায় করে না। আজকের মুসলিম বিশ্বকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে জেগে উঠতে হবে, যাতে আমরা অন্যায়ের এই চক্রের অংশীদার না হই। চোখ বন্ধ করে প্রযুক্তির নামে যুদ্ধ ব্যবসার সাফল্যকে হাততালি দেবেন না। বরং সচেতনতা ছড়িয়ে দিন, নিজেদের সন্তানদের শিক্ষিত করুন এবং মানব কল্যাণমুখী প্রযুক্তি নির্মাণে তাদের উৎসাহিত করুন। কুরআনের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করায়, অন্যায়ের সহযোগী হইও না; বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াও।
আমাদের ভরসা করতে হবে একমাত্র আল্লাহর উপর। ইতিহাস সাক্ষী, অন্যায়ের সাম্রাজ্য যতই শক্তিশালী হোক, শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর হই এবং ইসলামের নৈতিক শক্তিকে আঁকড়ে ধরি, তবে যুদ্ধ ব্যবসার এই অন্ধকার ভেদ করে মানবতার নতুন আলো জ্বালানো সম্ভব। আল্লাহর সাহায্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবেই, এ বিশ্বাসই আমাদের পথচলার মূল শক্তি।








