গণতন্ত্রের মঞ্চে সাধারণ মানুষের নীরব কান্না
সফিয়ার সরদার: ভারতবর্ষ আজ এক গভীর যুগ-সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার পর বহু দশক কেটে গেলেও রাজনৈতিক রঙের পালাবদল ছাড়া সাধারণ মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা এসেছে — সে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। শাসকের মুখ বদলেছে, পতাকার রং বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি বিভাজন ও মেরুকরণের রাজনীতি, বদলায়নি খেটে খাওয়া অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস। আজকের রাজনৈতিক কোলাহলে সবচেয়ে বেশি চাপা পড়ে যাচ্ছে সেই মানুষগুলোর আর্তনাদ, যাদের শ্রমে শহর বেঁচে থাকে, অর্থনীতির ভিত দাঁড়িয়ে থাকে। রিকশাচালক, দিনমজুর, কৃষক, পরিযায়ী শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী — এই মানুষগুলিই দেশের প্রকৃত চালিকাশক্তি। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। ইতিহাস সাক্ষী, যে শাসনব্যবস্থা সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচারের বোঝা চাপিয়েছে, তার পরিণতি কখনো শুভ হয়নি। কারণ, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; কোনো রাজত্বই অনন্তকাল টিকে থাকেনি, ভবিষ্যতেও থাকবে না। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এই নিষ্ঠুর মঞ্চে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা, বেকারত্ব, কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার যন্ত্রণা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য। একদিকে অল্প কয়েকজন পুঁজিপতির সম্পদের পাহাড় উঁচু হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ ন্যূনতম খাদ্য ও চিকিৎসার জন্য সংগ্রাম করছেন। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে আনুমানিক ১৬ থেকে ২০ কোটি মানুষ এখনও নিয়মিত পর্যাপ্ত খাবার পায় না, কিংবা ক্ষুধার ঝুঁকিতে বাস করে। রাজনৈতিক মঞ্চে কেউ বলেন “হিন্দুরা বিপদে”, কেউ বলেন “মুসলিমরা বিপদে”। অথচ বাস্তবতা হল — বিপদে আছে সাধারণ মানুষ। সাইক্লোন, বন্যা কিংবা মহামারিতে হিন্দু-মুসলিমের আলাদা লাশ ভেসে যায় না; ভেসে যায় মানুষের লাশ। দুর্যোগ ধর্ম দেখে আসে না। কিন্তু এই বিভেদের আগুনে রাজনৈতিক স্বার্থের হায়নারা নিজেদের সিংহাসন শক্ত করে।

মহাত্মা গান্ধীর সেই বিখ্যাত বাণী আজও প্রাসঙ্গিক:“যখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ হবে, তখন সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্বল মানুষটির মুখ মনে করো এবং নিজেকে প্রশ্ন করো — তোমার সিদ্ধান্ত তার কোনো উপকারে আসবে কি?” দুঃখের বিষয়, আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই মানবিক দর্শন থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। মহান মনীষীদের ছবি আজ দেওয়ালে টাঙানো থাকে, কিন্তু তাঁদের আদর্শ উপেক্ষিত হয় ক্ষমতার করিডরে। দেশের সংবিধান নাগরিককে সমতা, স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শোষণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা এবং সাংবিধানিক প্রতিকার-সহ একাধিক মৌলিক অধিকার দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় — এই অধিকার কি সত্যিই দেশের প্রত্যেক নাগরিক সমানভাবে পাচ্ছেন? দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থাও আমাদের সামনে কঠিন বাস্তব তুলে ধরে। দুর্গম আদিবাসী অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, ভাঙন কবলিত অঞ্চল, শহরের বস্তি কিংবা দরিদ্র গ্রামীণ সমাজে এখনও শিক্ষার আলো পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায়নি। বহু স্কুলে শিক্ষক নেই, ল্যাব নেই, ডিজিটাল সুযোগ নেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দশ বছরে দেশে ৯৩ হাজারেরও বেশি স্কুল বন্ধ হয়েছে বা একীভূত হয়েছে। একইসঙ্গে বহু সরকারি স্কুলে ছাত্র সংখ্যা শূন্যে নেমে এসেছে। শুধু শিক্ষা নয়; স্বাস্থ্য ব্যবস্থাতেও রয়েছে তীব্র বৈষম্য। শহরের উন্নত হাসপাতালের বিপরীতে গ্রামীণ মানুষ এখনও ন্যূনতম চিকিৎসার জন্য বহু কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, বেডের অভাব, চিকিৎসক সংকট ও অতিরিক্ত ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের ছবিও কম ভয়াবহ নয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে গড়ে প্রতি ১৬ থেকে ১৮ মিনিটে একটি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়। প্রবীণ নির্যাতনের ক্ষেত্রে বহু সমীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা নিজেদের সন্তানদের কাছেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আবার বহু নবজাতককে ডাস্টবিন বা অনিরাপদ স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে বহু মানুষ খুন হচ্ছেন, বহু শিশু অপহৃত হচ্ছে, বহু কৃষক ঋণ ও অনিশ্চয়তার চাপে আত্মহত্যা করছেন। NCRB-র রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৮ থেকে ২৯ জন কৃষক বা কৃষিশ্রমিক আত্মহত্যা করেন। এমন বাস্তবতায় লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক জীবিকার সন্ধানে বিদেশমুখী হচ্ছেন। বর্তমানে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক। এটি যেমন দেশের মানবসম্পদের শক্তির পরিচয়, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার সংকটের প্রতিফলনও বটে। সবথেকে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার চেয়ে ধর্মীয় বিভাজন আজ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কে কী খায়, কে কোন ধর্ম মানে, কে কোন ভাষায় কথা বলে — এই তর্কে সমাজকে বিভক্ত করা হচ্ছে। অথচ প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত — কে না খেয়ে আছে, কে শিক্ষা-বঞ্চিত, কে চিকিৎসাহীন, কে বেকার।
ভারতবর্ষের ঐতিহ্য বিভেদের নয়; সহাবস্থানের। এদেশের মাটিতে স্বামী বিবেকানন্দ যেমন মানবতার বাণী দিয়েছেন, তেমনি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ শিক্ষার আলো ও জাতীয় ঐক্যের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কোটি কোটি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, বিচারক, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিন্দু-মুসলিম শিক্ষকের হাত ধরেই বড় হয়েছেন। সেখানে কখনো ধর্মের ভিত্তিতে জ্ঞানকে ভাগ করা হয়নি। তাই রাজনীতি যদি সত্যিই মানুষের জন্য হয়, তবে তা হওয়া উচিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষক কল্যাণ, সংস্কৃতি ও মানবিক মর্যাদার জন্য। বিভাজনের নয়, রাজনীতি হোক সমাধানের। ধর্মগ্রন্থের ভুল খোঁজার চেয়ে সংবিধানের মূল্যবোধ রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি। কারণ, শেষ পর্যন্ত মানুষই রাষ্ট্রের প্রাণ, আর মানুষের কল্যাণই হওয়া উচিত গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ লক্ষ্য।








