জন্ম শতবর্ষের আলোয় মহানায়ক উত্তমকুমার
রাজু পারাল: জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে মহানায়ক উত্তমকুমারকে নতুন করে স্মরণ করার প্রয়োজন কেন — এ প্রশ্নের উত্তর তাঁর অভিনয়ের আকর্ষণ। আজকের সিনেমাপ্রেমীরা, বিশেষ করে তরুণ দর্শকবৃন্দ, এখনও তাঁর অভিনয়ে খুঁজে পান বাঙালির ঘরের ছেলেকে। মুখে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তুলে সুদর্শন পুরুষটি কখনও রোমান্টিক অভিনয়ে, কখনও পরিবারিক কাহিনিতে, কখনও-বা হাসির সিনেমায় তাঁর সাবলীল অভিনয় দক্ষতা আজও মুগ্ধ করে সকলকে। সময় বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু মানুষের আশা ভরসা, প্রেম-ভালবাসার অনুভূতি বদলায়নি। তাই পুরনো দিনের সাদা-কালো পর্দায় মহানায়কের অভিনীত সিনেমা আজও ছোট-বড় সকলে দেখেন চোখ টান টান করে। বাংলা সিনেমার একশো বছরের ইতিহাসে অসংখ্য নায়ক এসেছেন; কিন্তু মহানায়ক একজনই। মানুষের উজাড় করা ভালবাসা যেমন পেয়েছিলেন, তেমনই নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিঃশেষে নিঙড়ে দিয়েছিলেন সেই অকুণ্ঠ ভালবাসার ঋণ শোধ করতে। আজও উত্তমকুমার নামের ম্যাজিকে আপ্লুত মানুষ, মহানায়কের বিকল্প খুঁজে পায় না। কতখানি অপমান, লাঞ্ছনা আর উপেক্ষার কাঁটা বিছানো পথ মাড়িয়ে তিনি সাফল্যের চূড়ায় উঠেছিলেন, সে ইতিহাস বিস্ময়ের। দর্শক-ভক্তদের কাছে শুধু একজন অভিনেতা হিসেবেই নন; মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন বহু ঊর্ধ্বে। সিনেমার সর্বস্তরের কর্মী-সহ অসংখ্য বাইরের মানুষকেও তিনি সাহায্য করে গেছেন অকাতরে, সেটা অনেকেই জানেন না। অন্তত, তখন তিনি কাউকে জানতে দিতেন না। কত টেকনিসিয়ান, স্টুডিওর কত দুস্থকর্মীকে তিনি সাহায্য করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। একসময় ‘শিল্পী সংসদ’ গড়ে তুলেছিলেন মহানায়ক। নিজের নির্মিত তহবিল থেকে দুস্থ ও কলাকুশলীদের প্রতি মাসে সাহায্য করতেন। দুস্থ শিল্পীদের নিয়ে মহানায়কের অনেক কাজের স্বপ্ন ছিল। ওল্ড এজ হোম নির্মাণ, কুটির শিল্প স্থাপন ইত্যাদি ছিল তাঁর মন জুড়ে। আসলে যে জগতে কাজ করতেন, সেই জগতের কীভাবে ভালো হয়, তার জন্য সব সময় ভাবতেন। অর্থ ও খ্যাতির সুউচ্চ পিরামিডে দাঁড়িয়েও মনুষত্ব ও মানবিকতা বোধকে মান্যতা দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি মহানায়ক উত্তমকুমার। সেই সঙ্গে একজন বড় শিল্পী হয়ে ওঠার জন্য তাঁর ত্যাগ স্বীকারের তো কোনও তুলনাই ছিল না।

উত্তমকুমারের পিতৃদত্ত নাম অরুণ কুমার। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার আহিরীটোলায় মামার বাড়িতে চপলা দেবী এবং সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র অরুণের (উত্তম কুমার) জন্ম হয়। পরে তাঁরা ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জী রোডে বসবাস শুরু করেন। অল্প বয়সে চক্রবেড়িয়া হাইস্কুল এবং পরে সাউথ সুবার্বন মেন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন অরুণ কুমার। তারপর গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স থেকে স্নাতক হন। জন্মসূত্রেই অভিনয় এবং গানের প্রতি ছিল অরুণের অগাধ ভালবাসা। ছোট থেকেই শিল্প-সাহিত্য-গান-নাটক চর্চার পরিবেশ ছিল তাঁদের পরিবারে। উল্লেখ্য, তাঁদের পরিবারেই ‘সুহৃদ সমাজ’ নামে এক অপেশাদার নাট্যগোষ্ঠী ছিল। তিনি সংগীত শিক্ষার পাঠ নিয়েছিলেন সংগীত শিক্ষক নিদানবন্ধু বন্দোপাধ্যায়ের কাছে। পাশাপাশি স্থানীয় ক্লাবে লাঠি খেলা, নিয়মিত ফুটবল খেলা এবং ভবানীপুর সুইমিং ক্লাবে সাঁতার শেখা — সবই করেছেন ঐকান্তিক আগ্রহ এবং উৎসাহে। তবে মনে মনে স্বপ্ন দেখতেন, ভাল অভিনেতা হয়ে ওঠার। কিন্তু বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে বৃহৎ পরিবারের দায়িত্ব এসে চাপে অরুণের কাঁধে। নায়ক হবার স্বপ্ন বোধহয় চিরতরে হারিয়েই গেল। পরিবারের মুখ চেয়ে পোর্ট ট্রাস্টের সামান্য কেরানির চাকরিতে যোগ দিলেন বটে; কিন্তু অভিনয়ের ঝোঁক তাঁর মাথা থেকে গেল না। সময়-সুযোগ পেলেই ছুট দিতেন প্রখ্যাত নাট্যকার শিশির ভাদুড়ির অভিনয় দেখতে। দশটা পাঁচটা’র অফিস করেও নায়ক হবার স্বপ্নকে বুকের মধ্যে পুষে রাখলেন সযত্নে। পরবর্তীতে মহানায়ক নিজেই বলেছিলেন — “কেরানি তো ছিলামই একদিন, গানও গাইতাম। গান ভালো লাগত, কিন্তু চাকরি আমার ধাতে সইত না। চাইতাম স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জন করতে। এবং মনে হত তা করবার একমাত্র রাস্তা সিনেমায় অভিনয়। আমার আকাঙ্খা খুব বেশি ছিল না। ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় এবং স্বাধীনভাবে কিছু উপার্জন। তখন কি জানতাম, আকাশ আর কত উঁচু, মানুষের আকাঙ্খা তাকেও ছাড়িয়ে যায়?”

১৯৪৭ সালে এক বন্ধুর সহযোগিতায় ‘মায়াডোর’ নামে একটি হিন্দি সিনেমায় ছোট চরিত্রে অভিনয় করার প্রথম সুযোগ পেলেন অরুণ। কিন্তু দুঃখের কথা, সে ছবি মুক্তি শেষপর্যন্ত পায়নি। পরের বছর পরিচালক নীতীন বসুর ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে অভিনয় করলেন। ছবিটি ফ্লপ হল। ১৯৪৯ সালে ‘কামনা’ ছবিতে তিনি প্রথম নায়কের ভূমিকায় অবর্তীণ হলেন। প্রকৃত নাম অরুণ কুমারের পরিবর্তে ‘উত্তম কুমার’ নামে অভিনয় করলেন। নায়ক হিসেবে পথচলার শুরু এখান থেকেই। অবশ্য ইতিমধ্যেই অগ্রজ শিল্পী পাহাড়ি সান্যালের পরামর্শে উত্তমকুমার নামে ‘সহযাত্রী’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। সেই সময় বেশ কয়েকটি ছবিতে তিনি অভিনয় করলেও দুর্ভাগ্যবশত তাঁর অভিনীত কোনও সিনেমাই বাণিজ্যিক সফলতা পায়নি। সে কারণে তিনি তীব্র বিদ্রুপের শিকার হন এবং ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিত হন ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ নামে। মানসিক চাপে সিনেমা জগৎ থেকে নিজেকে যখন সরিয়ে নেবার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই পরিচালক নির্মল দে’র সিনেমা ‘বসু পরিবার’-এ অভিনয় করার ডাক পান উত্তমকুমার। সবাইকে চমকে দিয়ে ছবিটি হিট করল। প্রত্যেক দর্শকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল উত্তমকুমারের নাম। সে সময়ের পত্র পত্রিকাগুলি উত্তমকুমারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিল। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিটি উত্তমকুমারকে চলচ্চিত্র জগতে দিল স্থায়ী আসন। এই ছবিতে উত্তমের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন নবাগত নায়িকা সুচিত্রা সেন। সিনেমাটি এতটাই সাফল্য পেয়েছিল যে, পরবর্তী কুড়ি বছরে শুধুমাত্র নায়িকা হিসেবে তিরিশটি সিনেমায় সুচিত্রা সেনের বিপরীতে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন উত্তমকুমার। হারানো সুর, অগ্নিপরীক্ষা, সবার উপরে, সাগরিকা, পথে হল দেরি, শিল্পী, সপ্তপদী, বিপাশা, চাওয়া পাওয়া-সহ বিভিন্ন ছবিতে অসাধারণ অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন উত্তম-সুচিত্রা জুটি। সাত দশক পেরিয়ে আজও দর্শকদের স্মৃতি উত্তম-সুচিত্রার নষ্টালজিয়ায় ভেসে ওঠে।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির পরে নায়িকা সুপ্রিয়া চৌধুরীর কথা অবশ্যই বলতে হয়। বাংলা সিনেমায় নায়ক-নায়িকা হিসেবে উত্তম-সুপ্রিয়া জুটিও সেকালে বেশ সাফল্য লাভ করেছিল। লাল পাথর, কাল তুমি আলেয়া, জীবন মৃত্যু, বন পলাশীর পদাবলী, সন্ন্যাসী রাজা, চিরদিনের-সহ বিভিন্ন সিনেমায় উত্তম-সুপ্রিয়া জুটিও বাংলা সিনেমা জগতে বাণিজ্যিক সফলতা পেয়েছিল। সুচিত্রা সেন ও সুপ্রিয়া চৌধুরী ছাড়াও উত্তমকুমারের বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন সন্ধ্যারানী, কাবেরি বসু, অঞ্জনা ভৌমিক, অরুন্ধতী দেবী, আরতি ভট্টাচার্য, মালা সিনহা, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, তনুজা, সুমিত্রা দেবী, মিঠু মুখার্জী, সুমিত্রা মুখার্জী, মৌসুমী চ্যাটার্জী, লিলি চক্রবর্তী, অনুভা গুপ্ত প্রমুখ। দীর্ঘ ৩৩ বছরের অভিনয় জীবনে প্রায় ২০০টি ছবিতে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার। বাংলা সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন একশো বছরের দূরত্বে একাই। তার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল নিরলস অধ্যবসায়। উত্তমকুমার কখনো ধৈর্য্য হারাননি। হতাশার সমুদ্রে বসেও হাল ছাড়েননি কখনো তিনি। তাই সিনেমা জগতে তিনি চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে সলিল দত্তের ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ সিনেমার শুটিং করতে করতেই উত্তমকুমার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। শত চেষ্টা করেও মহানায়ক’কে বাঁচানো যায়নি। তাঁর শেষ যাত্রার সাক্ষী ছিলেন অগণিত কলকাতাবাসী। সিনেমাপ্রেমী অনুরাগীদের কাছে উত্তমকুমারের প্রয়াণযাত্রা ছিল এক পরম আত্মীয়ের বিদায় যাত্রা। তাঁর প্রয়াণের পর ময়রা স্ট্রিটের নামকরণ হয়েছে ‘উত্তমকুমার সরণী’। টালিগঞ্জে নিত্য স্টুডিওতে যাওয়া আসার পথে চারমাথার মাঝখানে শোভা পাচ্ছে উত্তমকুমারের আট ফুট লম্বা ব্রোঞ্চের মূর্তি। পাশাপাশি টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের নামকরণ হয়েছে ‘মহানায়ক উত্তমকুমার’।








