বন্দে মাতরম বিতর্ক: সাংস্কৃতিক আধিপত্য, বহুত্ববাদ ও জাতীয়তাবাদের জটিলতা
রফিক আনোয়ার: ‘বন্দে মাতরম্’ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এমন একটি প্রতীক, যা একইসঙ্গে আবেগ, গৌরব, স্মৃতি, বিতর্ক আর রাজনৈতিক সংঘাত — সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই গান মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছিল, আর জাতীয় চেতনার অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু একইসঙ্গে এই গানকে ঘিরে অনেকদিন ধরে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কও চলেছে। কারও কাছে এটি মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসার সর্বোচ্চ প্রকাশ, আবার কারও কাছে এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক। ফলে ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে বিতর্ক আসলে শুধুমাত্র একটি গানকে কেন্দ্র করে নয়; বরং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের চরিত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ আর রাষ্ট্রের পরিচয় নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন। এই বিতর্ককে বুঝতে হলে ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজতত্ত্ব — সবকটি স্তর একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঊনিশ শতকের বাংলায় নবজাগরণের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক। তাঁর উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ ‘বন্দে মাতরম্’ প্রথম প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটির পটভূমি ছিল সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক রোমান্টিক ও সাংস্কৃতিক কল্পনা নির্মাণ করা হয়েছিল। ‘মাতৃভূমি’-কে সেখানে শুধু ভূখণ্ড হিসেবে নয়; দেবীমূর্তিরূপে কল্পনা করা হয়। দেশ যেন একদিকে মা, অন্যদিকে দেবী দুর্গার প্রতীক। ঊনিশ শতকের বাংলায় হিন্দু সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয়ের সন্ধান আর জাতীয়তাবাদের উত্থান — এই তিনটি প্রবাহের মিলনস্থলে ‘বন্দে মাতরম্’ জন্ম নিয়েছিল। ফলে গানটির ভেতরে একদিকে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের প্রতিরোধ, অন্যদিকে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতীকের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। বিশেষত বঙ্গ-বিভাজনের সময় ‘বন্দে মাতরম্’ এক শক্তিশালী রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। স্বদেশি আন্দোলনের মিছিল, সভা, ছাত্র আন্দোলন — সবখানেই এই গান উচ্চারিত হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার অনেক ক্ষেত্রে গানটি নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করে। কারণ, সেটি ঔপনিবেশিক বিরোধিতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ফলে বহু ভারতীয়ের কাছে ‘বন্দে মাতরম্’ স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, আত্মত্যাগ ও জাতীয় জাগরণের আবেগের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়।

জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক কল্পনা: জাতীয়তাবাদ শুধুমাত্র রাজনৈতিক ধারণা নয়; সাংস্কৃতিক কল্পনারও বিষয়। একটি জাতি নিজেকে কীভাবে কল্পনা করবে, কোন প্রতীক ব্যবহার করবে, কী ধরনের ভাষা ও ইতিহাসকে ‘জাতীয়’ বলে স্বীকৃতি দেবে — এসবের ওপর জাতীয়তাবাদের চরিত্র নির্ভর করে। ‘বন্দে মাতরম্’-এ মাতৃভূমিকে দেবীমূর্তিরূপে কল্পনা করা হয়েছিল। অনেকের কাছে এটি কাব্যিক ও আবেগঘন রূপক। ভারতীয় উপমহাদেশে মাটি, নদী, দেশকে ‘মা’ হিসেবে কল্পনা করার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। ফলে গানটির সমর্থকদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রচার নয়; বরং দেশপ্রেমের সাংস্কৃতিক ভাষা। কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় তখন, যখন এই সাংস্কৃতিক রূপককে রাষ্ট্রের সর্বজনীন প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়। কারণ, সব নাগরিক একই ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতীকের সঙ্গে সমানভাবে সংযোগ অনুভব করেন না। বিশেষত মুসলিম সমাজের একাংশ মনে করেছিল, মাতৃভূমিকে দেবীমূর্তিতে কল্পনা করা ইসলামের একেশ্বরবাদী ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের কাছে এটি কেবল দেশপ্রেমের কবিতা ছিল না; বরং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় কল্পনার আধিপত্যও ছিল। এখান থেকেই ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বনাম ‘প্লুরালিজম’ তথা ‘বহুত্ব’ প্রশ্নটি সামনে আসে। সাংস্কৃতিক আধিপত্য; সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির কেন্দ্রায়ন: আন্তোনিও গ্রামিস্ক ‘কালচারাল হেজেমনি’ বা ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ ধারণার মাধ্যমে দেখান, সমাজে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী শুধুমাত্র রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়; সংস্কৃতি ও প্রতীকের মাধ্যমেও নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। কোন ভাষা ‘শুদ্ধ’, কোন ইতিহাস ‘জাতীয়’, কোন প্রতীক ‘দেশপ্রেমিক’ — এসব নির্ধারণের মধ্য দিয়েও ক্ষমতা কাজ করে।
‘বন্দে মাতরম্’ বিতর্কে এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হল, ভারতের জাতীয় পরিচয় কি মূলত একটি হিন্দু সাংস্কৃতিক কল্পনার ওপর দাঁড়াবে? যদি দাঁড়ায়, তাহলে অন্যান্য সম্প্রদায়ের স্থান কোথায়? সমালোচকদের মতে, ‘বন্দে মাতরম্’ ধীরে ধীরে এমন এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যা অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষত যখন ‘বন্দে মাতরম্ বলতেই হবে’ ধরনের রাজনৈতিক দাবি ওঠে, তখন এটি সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রূপ নেয়। কারণ, তখন গানটি আর ঐতিহাসিক স্মৃতি থাকে না; বরং নাগরিক আনুগত্য যাচাইয়ের মানদণ্ডে পরিণত হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সাংস্কৃতিক আধিপত্য সবসময় জোরপূর্বক আসে না। অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতিকে ‘স্বাভাবিক জাতীয় সংস্কৃতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে সংখ্যালঘুদের আপত্তি বা অস্বস্তিকে অস্বাভাবিক, এমনকি ‘দেশবিরোধী’ হিসেবেও উপস্থাপন করা হতে পারে।
বহুত্ববাদ ও বহুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ: ভারতের বাস্তবতা মূলত বহুত্ববাদী। এখানে বহু ধর্ম, ভাষা, জাতিগত পরিচয় ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি সহাবস্থান করে। ফলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একটি বড় ধারা মনে করে, জাতীয় পরিচয়কে একক সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। প্লুরালিজম বা বহুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ মনে করে, ‘একটি জাতি বহু কণ্ঠের সমষ্টি হতে পারে; রাষ্ট্রের প্রতীক এমন হওয়া উচিত, যাতে বিভিন্ন সম্প্রদায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন; নাগরিকত্বের ভিত্তি হওয়া উচিত সাংবিধানিক অধিকার ও সমতা, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই স্বাধীনতার পরে ‘জন-গণ-মন’-কে জাতীয় সঙ্গীত আর ‘বন্দে মাতরম্’-কে জাতীয় গান হিসেবে পৃথক মর্যাদা দেওয়া হয়। এটি ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক কম্প্রোমাইস। রাষ্ট্র একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিক আবেগকে অস্বীকার করেনি, অন্যদিকে ইনক্লুসিভনেস বা অন্তর্ভুক্তি-র প্রশ্নও বিবেচনায় নিয়েছিল। এখানে বহুত্ব-র মূল বক্তব্য হল, একটি রাষ্ট্রে ঐক্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই ঐক্য সাংস্কৃতিক একরূপতার ওপর দাঁড়াতে হবে — এমন নয়; বরং বিভিন্ন পরিচয়ের সহাবস্থানই গণতান্ত্রিক শক্তির উৎস হতে পারে।
ধর্মীয় পরিচয় ও মুসলিম প্রতিক্রিয়া: ‘বন্দে মাতরম্’ বিতর্কের কেন্দ্রে মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এটিকে সরলীকরণ করা ঠিক নয়। সব মুসলিম নেতা বা সংগঠন একইভাবে গানটির বিরোধিতা করেননি। অনেক মুসলিম স্বাধীনতা সংগ্রামীও ‘বন্দে মাতরম্’-কে ঔপনিবেশিক বিরোধিতার প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন। তবে রাজনৈতিকভাবে আপত্তি বাড়তে থাকে, যখন গানটির দেবীমূর্তি-সংক্রান্ত অংশগুলোকে রাষ্ট্রের সর্বজনীন প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মুসলিম সমাজের একাংশ মনে করেছিল, এতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ক্রমশ হিন্দু সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, একটি বহুধর্মী রাষ্ট্র কি এমন প্রতীক বেছে নিতে পারে, যা একটি বড় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অস্বস্তির কারণ হয়? বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি বলবে, রাষ্ট্রের উচিত এমন পথ খোঁজা, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের ঐতিহাসিক আবেগ ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাবোধ — দুই-ই সম্মান পায়।

দেশপ্রেম ও বাধ্যতামূলক প্রতীক: বিতর্কের সবচেয়ে জটিল অংশ তৈরি হয়, যখন ‘বন্দে মাতরম্’ উচ্চারণকে দেশপ্রেমের পরীক্ষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ: ‘বলতেই হবে’; ‘না বললে দেশদ্রোহী’। আপত্তি মানেই ‘আন্টি-ন্যাশনাল’ বা ‘জাতীয়তা বিরোধী’ ধরনের অবস্থান ‘প্লুরাল ডেমোক্রেসি’ বা বহুত্ববাদী গণতন্ত্র ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেশপ্রেম সাধারণত নাগরিক অধিকার, সাংবিধানিক আনুগত্য ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কোনো নির্দিষ্ট প্রতীক বা স্লোগানের প্রতি বাধ্যতামূলক আনুগত্য গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সংকুচিত করে। এখানে ‘কনস্টিটিউশনাল প্যাট্রিওটিজম’ বা ‘সাংবিধানিক দেশপ্রেম’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারণা অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তি হবে, সংবিধান / গণতন্ত্র / সমতা / স্বাধীনতা / আইনের শাসন। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতীক নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বন্দে মাতরম্’ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রতীক হতে পারে, কিন্তু নাগরিকত্ব বা দেশপ্রেম যাচাইয়ের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।
প্রতীকের বহুমাত্রিকতা: ‘বন্দে মাতরম্’-এর সবচেয়ে জটিল দিক হল, এটি একইসঙ্গে মুক্তি ও এক্সক্লুশন বা বাদ দেওয়ার প্রতীক হতে পারে। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর কাছে এটি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্মৃতি। একজন সংখ্যালঘু নাগরিকের কাছে এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আধিপত্যের আশঙ্কা সৃষ্টি করে। এই দ্বৈততাকে অস্বীকার করলে বাস্তবতা ধরা পড়ে না। একটি প্রতীক বিভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এই ধরনের দ্বৈততা নতুন নয়। ফ্রান্স, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা বা অন্যান্য বহু রাষ্ট্রেও জাতীয় প্রতীক নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক দেখা গেছে।
সমাধানের সম্ভাব্য পথ: ‘বন্দে মাতরম্’ বিতর্কের সম্পূর্ণ সমাধান হয়ত সম্ভব নয়। কারণ, এটি গভীর ঐতিহাসিক ও আবেগগত প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। তবে কিছু ‘ডেমোক্রেটিক অ্যাকোমোডেশন’ বা ‘গণতান্ত্রিক স্বীকৃতি’ সংঘাত কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রথমত: দেশপ্রেমকে কোনো একক প্রতীকের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একীভূত না করা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ ‘বন্দে মাতরম্’ বলতেই পারেন, আবার কেউ নাও বলতে পারেন —এই স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া ‘প্লুরাল ডেমোক্রেসি’ বা ‘বহুত্ববাদী গণতন্ত্র’-র জন্য জরুরি। দ্বিতীয়ত: গানটিকে প্রাসঙ্গিকতার সঙ্গে পড়ানো দরকার। একে শুধু ‘মহিমান্বিত জাতীয় প্রতীক’ বা ‘সাম্প্রদায়িক প্রতীক’ — এই দুই প্রান্তিক স্তরে না ফেলে এর ঐতিহাসিক জটিলতা বোঝানো প্রয়োজন। তৃতীয়ত: রাষ্ট্রের উচিত সংঘাত এড়িয়ে ‘ভোলান্টারি রেসপেক্ট’ বা স্বতঃস্ফূর্ত সম্মাননার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বাধ্যতামূলক দেশপ্রেম সাধারণত বেশি সংঘাত তৈরি করে। চতুর্থত: ভারতীয় জাতীয় পরিচয়কে স্তরভিত্তিক হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ ‘বন্দে মাতরম্’ / ‘জন গণ মন’ / সংবিধান / তেরঙ্গা পতাকা / আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য — সব মিলিয়েই ভারতীয় পরিচয় নির্মিত হতে পারে।
মোটকথা, ভারতের মতো বহুধর্মী ও বহুভাষিক সমাজে ‘বন্দে মাতরম্’ বিতর্ক আসলে জাতীয়তাবাদের প্রকৃতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দেয়। জাতীয় ঐক্য কি একক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর দাঁড়াবে, নাকি বহুত্বের সহাবস্থানের ওপর? সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির ঐতিহাসিক আবেগকে কতদূর পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতীকে রূপ দেওয়া যায়? সংখ্যালঘুদের অস্বস্তি কি গণতান্ত্রিক আলোচনায় বৈধ স্থান পাবে? ‘বন্দে মাতরম্’ এই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর দেয় না; বরং এটি দেখায়, জাতীয়তাবাদ সবসময় একরৈখিক নয়; এর মধ্যে স্মৃতি, আবেগ, আধিপত্য, প্রতিরোধ ও অন্তর্ভুক্তির জটিল সম্পর্ক কাজ করে। সম্ভবত এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল, গণতন্ত্রে ঐক্য মানে একরূপতা নয়। একটি জাতি বহু ইতিহাস, বহু সংস্কৃতি ও বহু কণ্ঠের সমষ্টিও হতে পারে। আর সেই বহুত্বকে স্বীকার করেই হয়ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদ তার সবচেয়ে শক্তিশালী ও মানবিক রূপ খুঁজে পেতে পারে।








