ইসলাম ও শিশু-শ্রম: এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
সাবিরুল ইসলাম: ১২ই জুন, বিশ্ব শিশু-শ্রম বিরোধী দিবস (World Day Against Child Labour)। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই বিশেষ দিবসকে নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল। বিশেষত ইসলাম মানব-মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষার ধর্ম। শিশুদের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল ও কল্যাণমুখী। আধুনিক অর্থে “শিশু শ্রম” শব্দবন্ধনী কুরআন ও হাদীসে না থাকলেও, শিশুদের উপর অত্যধিক শ্রমের বোঝা চাপিয়ে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করার বিরুদ্ধে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। কুরআন মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর” (সূরা তাহরীম: ৬)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব হল সন্তানদের জন্য সু-শিক্ষা, লালন-পালন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

রাসূলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তিনি শিশুদের স্নেহ করতেন, তাদের সঙ্গে খেলতেন এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক কল্যাণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি (সা.) বলেছেন, “যে ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (তিরমিযি)। ইসলামী শরিয়াহর একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল, কারো ওপর তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কুরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)। এই নীতির আলোকে শিশুদেরকে কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ বা শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে — এমন কাজে নিয়োজিত করা ইসলামের ন্যায়বিচার ও দয়ার শিক্ষার পরিপন্থী।

তবে ইসলাম শিশুদেরকে দায়িত্ববোধ ও কর্মশিক্ষা থেকে বিরত রাখে না। নবী-রাসূলদের জীবনীতে দেখা যায়, তারা শৈশব বা কৈশোরে পরিবারকে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু এটি ছিল শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও পারিবারিক সহায়তার অংশ; শোষণমূলক শ্রম নয়। ইসলাম এমন কাজকে সমর্থন করে, যা শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করে তাকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে। আধুনিক বিশ্বে অনেক শিশু দারিদ্র্যের কারণে কল-কারখানা, খনি, নির্মাণক্ষেত্র বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য হয়। ইসলামী দৃষ্টিতে সমাজ, রাষ্ট্র এবং সচ্ছল মানুষের দায়িত্ব হল দান-খয়রা, যাকাত, সাদকা ও সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি দূর করা। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মূলত দুর্বল ও অসহায় মানুষের সুরক্ষা এবং সর্বোপরি সার্বিক জনকল্যাণের লক্ষ্যেই প্রণীত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম শিশুদের শোষণ, নির্যাতন ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চনার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করাই ইসলামের শিক্ষা। তাই এমন কোনো শ্রম, যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয় বা তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তা ইসলামের ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।








