চাইলেই কি হকার উচ্ছেদ করা যায়?
আবীর লাল মন্ডল: একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, কতটা গণতান্ত্রিক এবং কতটা মানবিক, তার পরিমাপ আকাশছোঁয়া অট্টালিকা হোক বা ঝকঝকে রেলস্টেশন, মেট্রো রেল কিংবা এক্সপ্রেসওয়ের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত পরিমাপ করা যায় সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল, দরিদ্র এবং প্রান্তিক নাগরিকদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার ভিত্তিতে। কারণ, উন্নয়নের প্রকৃত উদ্দেশ্য হল মানুষের জীবনকে উন্নত করা। আজ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রেলস্টেশন চত্বর এবং শহরাঞ্চলে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত এই মৌলিক প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে, যে উন্নয়নের নামে কি রাষ্ট্র মানুষের রুজি-রুটি কেড়ে নিতে পারে? স্টেশন চত্বরে চা বিক্রেতা, ফল বিক্রেতা, বই বিক্রেতা, হরেক রকম খাবারের দোকানদার কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোনো একদিন হঠাৎ করে সেখানে এসে বসে পড়েননি। তাঁদের অনেকেই ২০-৩০ বছর ধরে একই জায়গায় ব্যবসা করে সংসার চালিয়েছেন। সেই আয় দিয়েই সন্তানের পড়াশোনা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, পরিবারের ভরণ-পোষণ করেছেন। অথচ ভাগ্যের কী নিদারুণ পরিহাস। আজ তাঁদের অনেকের দোকান রাতারাতি বুলডোজারের নিচে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি তাঁরা এতদিন অবৈধই হয়ে থাকেন, তাহলে প্রশাসন এত বছর তাঁদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নীরব ছিল কেন? আর যদি প্রশাসন তাঁদের উপস্থিতি মেনে নিয়ে থাকে, তাহলে বিনা পুনর্বাসনে তাঁদের উচ্ছেদ করার নৈতিক ও আইনি ভিত্তি কোথায়? দেশের সংবিধান অবশ্য এ প্রশ্নের উত্তর বহু আগেই দিয়ে দিয়েছে। সংবিধানের ২১ নম্বর ধারায় প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ধারাবাহিকভাবে বলেছে, জীবনের অধিকার মানে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার, আর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য জীবিকার অধিকার অপরিহার্য।

১৯৮৫ সালের ঐতিহাসিক Olga Tellis vs Bombay Municipal Corporation মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট বলেছিল, জীবিকার অধিকার জীবনের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন মানুষের জীবিকার উৎস ধ্বংস করে দিলে তার জীবনকেই বিপন্ন করা হয়। আদালতের এই রায় আজও ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে দরিদ্র মানুষের অধিকারের অন্যতম শক্তিশালী স্বীকৃতি বা রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হয়। শুধু তাই নয়, Sodan Singh vs New Delhi Municipal Committee (১৯৮৯) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আরও এক ধাপ এগিয়ে রাস্তার বিক্রেতাদের ব্যবসা করার অধিকারকে সংবিধানের ১৯(১)(জি) ধারার অধীনে স্বীকৃতি দেয়। আদালত বলেছিল, রাস্তা জনগণের জন্য হলেও জনসাধারণের সুবিধা নষ্ট না করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সেখানে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল, ভারসাম্য রক্ষা করা। ২০১৪ সালে কেন্দ্র সরকার Street Vendors (Protection of Livelihood and Regulation of Street Vending) Act প্রণয়ন করে। এই আইন হকারদের আন্দোলনের দীর্ঘ সংগ্রামের ফল ছিল। আইনটির মূল কথা ছিল খুবই স্পষ্ট, হকারদের নগর অর্থনীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই আইনে বলা হয়েছে, কোনো হকারকে উচ্ছেদ করার আগে সমীক্ষা করতে হবে, টাউন ভেন্ডিং কমিটির মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নির্ধারণ করতে হবে, নোটিশ দিতে হবে এবং পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা ILO-র তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নগর কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের উপর নির্ভরশীল। ভারতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী কয়েক কোটি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে স্ট্রিট ভেন্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের নগর অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান বিপুল। তাঁরা শুধু নিজের পরিবারের ভরণ-পোষণ করেন না; শহরের সাধারণ মানুষের কাছে সুলভ মূল্যে পণ্য ও পরিষেবা পৌঁছে দেন। শহরের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা তাঁদের শ্রম ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সত্য রয়েছে। আমাদের রাজ্য তথা সারা দেশেই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। নিয়মিত সরকারি চাকরি বা সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। এই পরিস্থিতিতে অসংখ্য মানুষ বাধ্য হয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা বা হকারির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। রাষ্ট্র যদি তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থান দিতে না পারে, তাহলে তাঁদের বর্তমান জীবিকার পথ বন্ধ করার নৈতিক অধিকার রাষ্ট্রের নেই।

উন্নত দেশগুলির অভিজ্ঞতা এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে। সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শহর-রাষ্ট্র। কিন্তু ৬০-৭০ এর দশকে সেখানে হাজার হাজার রাস্তার হকার ছিলেন। সরকার তাঁদের উচ্ছেদ করেনি। পরিকল্পিত হকার সেন্টার তৈরি করে বৈধ ব্যবসার সুযোগ দিয়েছে। আজ সিঙ্গাপুরের হকার সংস্কৃতি UNESCO-র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থাৎ যাদের একসময় সমস্যা মনে করা হত, তাদেরই উন্নয়নের অংশীদার করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্কক শহরেও রাস্তার খাবার বিক্রেতারা শহরের পরিচয়ের অংশ। প্রশাসন নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁদের ব্যবসার সুযোগ দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল শহরে স্ট্রিট ভেন্ডরদের জন্য নির্দিষ্ট বাজার অঞ্চল তৈরি করা হয়েছে। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় পুনর্বাসন, ক্ষুদ্রঋণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হাজার হাজার হকারকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। উন্নত নগর ব্যবস্থাপনার এই উদাহরণগুলো দেখায় যে, মানবিকতা ও আধুনিকতা পরস্পরের বিরোধী নয়। অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ড. অমর্ত্য সেন বহুবার বলেছেন, উন্নয়নের মূল লক্ষ্য মানুষের Capability বা সক্ষমতার বিকাশ। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের স্বাধীনতা ও সম্ভাবনাকে প্রসারিত করে। যে উন্নয়ন একজন শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা কেড়ে নেয়, তাকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। একইভাবে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, কোনো নীতি গ্রহণের আগে সেই দরিদ্রতম মানুষটির মুখ মনে করতে হবে, যার উপর সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে।
আজ হকার উচ্ছেদের প্রশ্নে এই নৈতিক দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বস্তুত, একটি দোকান ভেঙে দেওয়া হলে তার সঙ্গে ভেঙে যায় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একটি শিশুর স্কুলের ফি দেওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে যায়। একজন বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ কেনার টাকা শেষ হয়ে যায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকারসম্পন্ন মানুষ। তাই উন্নয়ন যদি প্রয়োজন হয়, পুনর্বিন্যাস যদি জরুরি হয়, পরিকাঠামো নির্মাণ যদি অপরিহার্য হয়, তবে তার আগে পুনর্বাসনও সমানভাবে অপরিহার্য। যে মানুষটি ৩০ বছর ধরে একটি জায়গায় ব্যবসা করছেন, তাঁকে বিকল্প জায়গা না দিয়ে উচ্ছেদ করা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না। তাই আজ প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা, স্বচ্ছ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট ভেন্ডিং জোন, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন। সরকারের কাছে তাই আবেদন, হকারদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তাঁদের মানবসম্পদ ও পরিশ্রমী নাগরিক হিসেবে দেখা হোক। তাঁদের উচ্ছেদ করার আগে তাঁদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হোক ।








