রাজনীতির অঙ্গনে ‘ডিম থেরাপি’; গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী
নাসির ওয়াদেন: গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সমালোচনা করার অধিকারও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দিন দিন এমন এক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে যুক্তি ও সংলাপের পরিবর্তে অপমান, বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসার ভাষা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এরই একটি প্রতীকী প্রকাশ হল তথাকথিত “ডিম থেরাপি”— অর্থাৎ রাজনৈতিক বিরোধী বা বিরুদ্ধমতের ব্যক্তিকে ডিম নিক্ষেপ করে প্রতিবাদ জানানো। অনেকের কাছে এটি হাস্যরসাত্মক বা অহিংস প্রতিবাদের রূপ মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য গভীরভাবে গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ মানসিক চাপ থেকে শারীরিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত উষ্মা থেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ডিম প্রক্ষেপণ-এর ইতিহাস নতুন নয়; বিভিন্ন দেশে অসন্তুষ্ট জনগণ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য ডিম ছুড়েছেন। অনেক সময় এটি জনগণের হতাশা ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু যখন এই ধরনের কর্মসূচি একটি নিয়মিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন তা গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করে। কারণ, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হল যুক্তির লড়াই, মতের আদান-প্রদান এবং সহনশীলতা। সেখানে ডিম, জুতা বা অন্য কোনো বস্তু নিক্ষেপের মাধ্যমে ব্যক্তিকে অপমান করার প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অসুস্থ করে তোলে। এর ফলে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় এবং প্রতিহিংসার মনোভাব জাগ্রত করে।

“ডিম থেরাপি”শব্দবন্ধটি নিজেই একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক ভাষা। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ডিম মেরে যেন শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু, গণতন্ত্রে শিক্ষা দেওয়ার অধিকার কারও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে নয়। একজন নাগরিক যদি কোনো নেতা বা দলের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন, তবে তিনি সভা-সমাবেশ, লেখালিখি, বিতর্ক কিংবা ভোটের মাধ্যমে তার মত প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু শারীরিকভাবে অপমান অপদস্থ করার প্রচেষ্টা কখনোই গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তির মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ণ করে না; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও আঘাত হানে। যখন কোনো বক্তা বা ব্যক্তিকে, তাঁর বক্তব্যের কারণে, কিংবা রাজনৈতিক নীতির কারণে তাঁকে ডিম নিক্ষেপ, হেনস্তা বা শারীরিক আক্রমণ করা হতে পারে, তখন তিনি নিজের মত প্রকাশে সংকোচ বোধ করেন। এর ফলে এক “ভয়ের সংস্কৃতি”তৈরি হয়। গণতন্ত্রে ভয় নয়; বরং মুক্ত চিন্তা ও মতের বহুমাত্রিকতাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক ভিত্তি। রাজনীতিতে সহনশীলতার সংকট আজ বিশ্বব্যাপী এক বড় সমস্যা। সমাজমাধ্যমের প্রসার যেমন মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে, তেমনি ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতিকেও উসকে দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বেড়েছে। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় ‘ডিম থেরাপি’র মতো অপমাননির্ভর প্রতিবাদ। এর মাধ্যমে মূল রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায় এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ঘটনার নাটকীয়তা।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধিতা অবশ্যই থাকবে; বরং বিরোধিতাই গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত রাখে। কিন্তু সেই বিরোধিতা হতে হবে সভ্য, যুক্তিনির্ভর এবং মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন। কোনো ব্যক্তি যতই বিতর্কিত হোন না কেন, তাকে অপমান করার অধিকার কারো নেই। কারণ, আজ যে ব্যক্তি ডিমের আঘাতের শিকার হচ্ছেন, কাল সেই একই সংস্কৃতি অন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে এটি শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই অসহিষ্ণুতার দিকে ঠেলে দেয়। ডিম থেরাপির সমর্থকেরা প্রায়ই বলেন, এটি সহিংস নয়; তাই এতে সমস্যা কোথায়? কিন্তু গণতন্ত্র শুধু শারীরিক সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়। গণতন্ত্র হল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক সংস্কৃতি। কাউকে প্রকাশ্যে হেয় করা, তার মর্যাদা নষ্ট করা কিংবা তাকে জনসমক্ষে অপদস্থ করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তাই ডিম নিক্ষেপকে নিছক হাস্যরস বা নিরীহ প্রতিবাদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিরোধী মতকে শত্রু না ভেবে প্রতিপক্ষ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া। মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু সেই অমিলের সমাধান হতে হবে কথোপকথন ও যুক্তির মাধ্যমে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি অপমান ও বিদ্বেষের ওপর দাঁড়ায়, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। সুতরাং রাজনীতির মাটিতে “ডিম থেরাপি”কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতীক নয়; বরং এটি রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হওয়ার এক উদ্বেগজনক লক্ষণ। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে অপমানের রাজনীতি নয়, যুক্তির রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ, ডিমের আঘাতে কোনো মতবাদ পরাজিত হয় না; পরাজিত হয় কেবল গণতান্ত্রিক শালীনতা, সৌজন্যতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি। ডিম থেরাপির সংস্কৃতি দিন দিন কদর্য রূপে প্রকাশ হয়ে পড়ছে। কোন রাজনৈতিক দল জনাদেশের মাধ্যমে পরাজিত হলে, একশ্রেণির উদগ্র ব্যক্তি ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার প্রয়াসে অরুচিকর পরিবেশ ও পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। মুষলপর্ব জোর গতিতে ছুটে যাচ্ছে সামাজিক প্রেক্ষিত উপেক্ষা করে এবং বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে প্রচণ্ডভাবে বাধা প্রয়োগ করা হয়েছে। তাতে গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত হয়েছে ও ব্যক্তি মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে, প্রতিহিংসার লেলিহান শিখা ক্রমাগত বাড়ছে। তাই ডিম থেরাপির মতো এক ধরণের অপসংস্কৃতি সমাজ থেকে নির্মূল হওয়া অতীব জরুরী।








