আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়ের স্থায়ী প্রশান্তি
রফিকুল হাসান: মানুষের জীবন আজ এক অন্তহীন দৌড়ের নাম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা, দুশ্চিন্তা আর অজানা ভবিষ্যতের ভয় মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে তুলছে। আধুনিক সভ্যতা মানুষকে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু দিতে পারেনি কাঙ্ক্ষিত মানসিক শান্তি। বাহ্যিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অন্তরে অস্থিরতা যেন আরও বেড়েছে। আজ পৃথিবীর বহু মানুষ অর্থ, ক্ষমতা ও প্রাচুর্যের মাঝে থেকেও শান্তির জন্য হাহাকার করছে। কারণ, হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি কোনো বাজারে বিক্রি হয় না, তা আসে কেবলই স্রষ্টার স্মরণ থেকে। মানুষের মন এমন এক অদ্ভুত সত্তা, যা পার্থিব কোনো বস্তু দিয়ে পূর্ণ হয় না। অর্থ দিয়ে শরীরের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু আত্মার শূন্যতা পূরণ করা অসম্ভব। আত্মার প্রকৃত খাদ্য হল মহান আল্লাহর স্মরণ। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন: “জেনে রাখো! আল্লাহর স্মরণেই কেবল হৃদয়সমূহ শান্তি লাভ করে।” (সূরা আর-রা‘দ: ২৮)। এই একটি আয়াত মানব জীবনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্যকে উন্মোচন করে। মানুষ যখন তার স্রষ্টাকে ভুলে যায়, তখন তার অন্তরে এক ধরনের শূন্যতা ও অস্থিরতার জন্ম নেয়। আর যখন সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তাঁর নাম উচ্চারণ করে এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখে, তখন হৃদয়ের গহীনে এক অনাবিল প্রশান্তি নেমে আসে।
বর্তমান বিশ্বে উদ্বেগ, হতাশা ও বিভিন্ন মানসিক ব্যাধি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। মানুষ বাইরে হাসছে, কিন্তু অন্তরে কান্না লুকিয়ে রাখছে। সমাজমাধ্যমে সুখের কৃত্রিম অভিনয় থাকলেও, পর্দার আড়ালে অনেকেই চরম নিঃসঙ্গতা ও দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। এর মূল কারণ, মানুষ তার রবের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক দুর্বল করে ফেলেছে। অথচ যে হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তা সাময়িক ধাক্কায় ভেঙে পড়লেও কখনো ধ্বংস হয়ে যায় না। আল্লাহর স্মরণ কেবল জিহ্বার কিছু উচ্চারণের নাম নয়, এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ। “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” — এই শব্দগুলো কেবল ঠোঁটের চর্চা নয়; বরং ঈমানের শক্তি ও আত্মার আলো। যখন কোনো বান্দা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন তার হৃদয়ের সমস্ত অন্ধকার দূর হতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে স্মরণ করে, আর যে স্মরণ করে না, তাদের উদাহরণ হল জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো।” (সহীহ বুখারি)। এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, আল্লাহর জিকির মানুষের আত্মাকে জীবিত রাখে। যে হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ নেই, সেখানে ধীরে ধীরে এক ধরনের জড়তা ও নিষ্ঠুরতা জন্ম নেয়। তেমন মানুষ বাহ্যিকভাবে জীবিত থাকলেও আত্মিকভাবে মৃত।
পার্থিব জীবনের বিপদ-আপদ, কষ্ট ও পরীক্ষার মুহূর্তে আল্লাহর স্মরণই মানুষের সবচেয়ে বড় ঢাল। একজন মুমিন যখন কোনো সংকটে পড়ে বলে, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী), তখন সে মূলত নিজের মনকে সান্ত্বনা দেয়। এই বিশ্বাস মানুষকে যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্যশীল ও দৃঢ়পদ রাখে। আজকের মানুষ শান্তির খোঁজে বিভিন্ন মরীচিকার পেছনে ছুটছে — কেউ বিনোদনে, কেউ মাদকের নীল দংশনে, কেউ-বা উগ্র ভোগবিলাসে শান্তি খুঁজছে। কিন্তু এগুলো সাময়িক অবশতা দিতে পারলেও স্থায়ী প্রশান্তি দিতে পারে না। যেহেতু মানুষের আত্মার উৎস মহান আল্লাহ, তাই তার শান্তিও কেবল আল্লাহর সান্নিধ্যেই নিহিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আরও সতর্ক করেছেন: “আর যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার জীবন হবে সংকীর্ণ।” (সূরা ত্ব-হা: ১২৪)। এই “সংকীর্ণ জীবন” কেবল বস্তুগত দারিদ্র্য নয়; বরং এটি হল মানসিক অশান্তি, আত্মিক শূন্যতা ও চিরস্থায়ী অস্থিরতার জীবন।
আল্লাহর স্মরণ মানুষের চরিত্রকেও অলংকৃত করে। যে ব্যক্তি নিয়মিত জিকির করে, নামায পড়ে ও কুরআন তিলাওয়াত করে, সে সমাজেও একজন নম্র, ধৈর্যশীল ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হিসেবে প্রকাশ পায়। আল্লাহর জিকির হৃদয় থেকে হিংসা, অহংকার, বিদ্বেষ ও লোভের মতো আত্মিক ব্যাধিগুলো দূর করে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলব না, যা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে সবচেয়ে পবিত্র, তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে কার্যকর?” সাহাবীগণ বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ‘তা হল আল্লাহর জিকির’ (জামে তিরমিযি)। ব্যক্তিজীবন ছাড়িয়ে আজ আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে যে অবক্ষয় ও পরসহিষ্ণুতার অভাব, তার অন্যতম কারণ হল আল্লাহর স্মরণ থেকে আমাদের এই দূরত্ব। আজ ঘরে ঘরে প্রযুক্তির কোলাহল আছে, কিন্তু কুরআনের মধুর ধ্বনি নেই, হাতে দামি স্মার্টফোন আছে, কিন্তু তাসবীহ নেই, দুনিয়াবি ব্যস্ততা আছে, কিন্তু রবের দরবারে দাঁড়ানোর সময়টুকু নেই। ফলে সমাজ আজ আত্মিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করা উচিত। ফজরের পর কিছুক্ষণ জিকির, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত (অর্থ-সহ) এবং একান্তে রবের কাছে নিজের মনের কথা বলা — এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মহৌষধ। মানুষ যখন আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা) করতে শেখে, তখন দুনিয়ার বড় বড় সংকটও তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল ও নশ্বর, কিন্তু আল্লাহর স্মরণই চিরস্থায়ী প্রশান্তির একমাত্র উৎস। দুনিয়ার এই তুমুল কোলাহলের মাঝেও আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে। কারণ, হৃদয় যখন তার স্রষ্টাকে চিনে নেয়, তখন অশান্ত পৃথিবীর বুকেও সে পরম শান্তি খুঁজে পায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি তাঁর স্মরণ করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের হৃদয়কে সুদৃঢ় ঈমান ও প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ করে দিন। আমীন।








