সুরাবর্দী এভিনিউ-এর নাম পরিবর্তনের পিছনে ভাবনা
তায়েদুল ইসলাম: সুরাবর্দী এভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন করে গোপাল ব্যানার্জির নামে করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে বর্তমানে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নয়, রাজনৈতিক মহল, বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বলা যায়, ঠিক এই ধরনের বিতর্কই নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণকারীদের অন্যতম প্রত্যাশিত ফল। এই বিতর্কে যারা নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ মূলত প্রশ্ন তুলছেন, ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিংশ শতাব্দীর বাংলায় ‘সুরাবর্দী’ পদবিধারী একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। যাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল, তাঁকে উপেক্ষা করে অন্য একজন সুরাবর্দীর পরিচয় সামনে এনে নাম পরিবর্তনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে — আসলে কোন সুরাবর্দীর নামে রাস্তার নামকরণ হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল, যদি ধরে নেওয়াও যায় যে, নামকরণটি সেই সুরাবর্দীর নামেই করা হয়েছিল, যাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি আপত্তি তুলছে, তাহলেও কি নাম পরিবর্তন ন্যায়সংগত হয়ে যায়? উত্তর হল — না। কারণ, কোনো স্থানের নাম পরিবর্তন কখনোই কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর পিছনে থাকে একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য। বর্তমান বিতর্কে সেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটিই আড়ালে চলে যাচ্ছে, আর বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নামকরণের ঐতিহাসিক তথ্যগত প্রশ্ন। এই নাম পরিবর্তনের পিছনে বিজেপির রাজনীতির অন্তত দুটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে হয়।

প্রথমত: মুসলিম ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে জনপরিসর থেকে ক্রমশ মুছে ফেলার প্রচেষ্টা। এর অংশ হিসেবে মুসলিম ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা, তাঁদের ভূমিকার একপাক্ষিক ব্যাখ্যা দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের মনে তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টির চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার প্রসঙ্গকে সামনে আনা হচ্ছে এবং অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে একমাত্র বা প্রধান দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা একটি জটিল ও বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক ঘটনা। এর কারণ, দায় এবং প্রেক্ষাপট নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। ইতিহাসের কাজ হল নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, যাতে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি উন্নত সমাজ গঠন করা যায়। ইতিহাসকে যদি ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা ইতিহাসচর্চার উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দেয়। ইতিহাস কখনো গণিত নয়; যেখানে দুই আর দুই সবসময় চার হবে। ইতিহাসের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়ন নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে সামাজিক বিভাজন বাড়ানো কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ নয়।

দ্বিতীয়ত: এই নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে ইতিহাসের বিতর্কিত বা কুখ্যাত ব্যক্তিদের নতুনভাবে বীরত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার একটি প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। যাঁদের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে সমাজে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ধারণা প্রচলিত ছিল, তাঁদের নতুন পরিচয়ে উপস্থাপন করে ইতিহাসের স্মৃতিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, যেমন নাথুরাম গডসেকে একাংশের মধ্যে দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে, তেমনি ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে পরিচিত গোপাল পাঁঠাকে হিন্দু সম্প্রদায়ের রক্ষাকর্তা বা বীরযোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টাও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। ফলে এখানে মূল প্রশ্ন কেবল একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন নয়। মূল প্রশ্ন হল, কোন ইতিহাসকে স্মরণ করা হবে, কোন ইতিহাসকে বিস্মৃত করা হবে এবং কী উদ্দেশ্যে সেই স্মৃতি নির্মাণ করা হবে। একজন সুপরিচিত রাজনৈতিক নেতাকে বিতর্কিত ও ঘৃণিত চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং একই সঙ্গে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে বীরের মর্যাদা দেওয়ার প্রচেষ্টা ইতিহাসচর্চার নয়; বরং রাজনৈতিক স্মৃতি-নির্মাণের অংশ। যদি সত্যিই উদ্দেশ্য হত জনপরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করা, তাহলে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম পরিবর্তন করে তাঁর চেয়েও অধিক অবদানসম্পন্ন বা সর্বজনস্বীকৃত কোনো মহান ব্যক্তির নামে নামকরণ করা যেত। কিন্তু একজন জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতার পরিবর্তে একটি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সঙ্গে যুক্ত বিতর্কিত ব্যক্তির নাম সামনে আনা যে রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, তা নিয়ে সমাজের গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। অতএব, সুরাবর্দী এভিনিউ-এর নাম পরিবর্তনকে কেবল নামকরণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ইতিহাস, স্মৃতি, পরিচয় এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বিষয়। আর সেই কারণেই এর আলোচনা হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি ও ইতিহাসের নিরপেক্ষ চর্চার ভিত্তিতে; সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা রাজনৈতিক প্রচারণার ভিত্তিতে নয়।








