কাজী নজরুল ইসলাম: শৃঙ্খলভাঙা মানবাত্মার ঘোষণা
সোনিয়া তাসনিম: ১৯২২ সালে প্রকাশিত নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটিকে অনেকেই ওয়াল্ট হুইটম্যানের “সং অফ মাইসেল্ফ” কবিতার এক প্রচ্ছন্ন দর্পণ অথবা সম্ভাব্য অনুপ্রেরণা বলে মনে করেন। একরাতে কবির কলমে রচিত এই “বিদ্রোহী” কবিতার ছত্রে ব্যবহৃত পৌরাণিক রূপক ও অলংকরণের ধারা এতটাই মাধুর্যতায় পরিপূর্ণ যে, কবিতার প্রতিটি ছন্দ হৃদস্পন্দন হতে মস্তিষ্ক অবধি প্রতিবাদের অনুরণন বাজিয়ে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সময়কালীন বৃটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার হিসেবে চাকুরিরতকালে দেশি-বিদেশি সৈনিকদের সাহচর্য কবিকে মূলত গ্রীক এবং ইন্ডিয়ান মিথের ওপর দারুণ দখল জমিয়ে নিতে সহায়ক হয়। মিশ্র মিথলজির এই যে সুষম ধারা, এই ধারার দ্রোহের প্রয়োগই নজরুলকে মূলত এই বিদ্রোহী কবিতার মধ্য দিয়ে চিনিয়েছে নতুন করে। করে তুলেছে, আপসহীনতার এক শক্তিশালী প্রতীক। এই মিশ্র মিথলজির নকশা কেবল তাঁর কবিতা অলংকরণের সস্তা অলংকার নয়; বরং এটি ছিল একটি ক্ষুরধার আয়ূধ।
ঔপনিবেশিক শোষণ, সামন্ত মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় কুসংস্কার — এসব কিছুর বিপরীতে অবস্থান করে নজরুল এখানে আর্বিভূত হয়েছিলেন একজন সত্যিকারের বিদ্রোহী বেশে। তাঁর ছত্রে ঘোষিত হয়েছে, সত্য সুন্দর মঙ্গলের বাসনা, দ্রোহের তীক্ষ্ণ ফলা বিদ্ধ করেছে যাবতীয় অপশক্তির অসুরকে। ছিন্ন করেছে ধর্মীয় শোষণ এবং জীর্ণ সনাতন মূল্যবোধের নিন্দিত আকরকে। পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির উৎসারিত পথের অভিলাস কবিকে যথার্থ অর্থে করে তুলেছে বিপ্লবী। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সৃষ্টিশীল পুরাণ-চেতনার সঙ্গে ঐতিহ্য ভাবনা নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাকে করে তুলেছে অনবদ্য। পুরাণ আর ঐতিহ্যের আলোকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন সমকালের যাপিত শৃঙ্খলিত জীবনকথা। নানান ঐতিহ্যের তীর্থভূমি ছুঁয়ে নিতে উত্তাল নজরুল যেন উদগ্রীব ছিলেন সমাজ পরিবর্তনের নিমিত্তে বিদ্রেহী আত্মায় দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ জাগিয়ে তুলতে। ভারতীয় পুরাণের সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার ঐতিহ্য, সাথে গ্রীক পুরাণের এক সৌষ্ঠব গাঁথুনি তাঁর এই সৃজনকে কেবল খাতার পাতায় নয়; বরং খোদিত করেছে মানব-মনের উন্মুক্ত বেদীতে। বিদ্রোহী কবিতায় কবি এই পুরাণ ও ঐতিহ্যের মিশেল ব্যবহারের ক্ষুরধার চেতনা বিশ্লেষণে তিনি এসবের মিলন ঘটিয়েছেন মূলত ঔপনিবেশিক শিকল ভাঙার জন্য। আর সেই ভাঙনের মধ্য দিয়েই উপলব্ধি করাতে চেয়েছিলেন নব্য সৃজনের এক তীক্ষ আকাঙ্খা। জনজীবন ও ঐতিহ্য সম্পৃক্ততায় তিনি ছিলেন দ্বিমাত্রিক ঐতিহ্য চেতনার উত্তরসূরী। তাই বুঝি তাঁর সৃজনে প্রেম-বিদ্রোহের যুগলধারা খুঁজে নিয়েছে জাগরণের নতুন দিশা।
কবিতায় এক বলিষ্ঠ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কবি দাসত্বে শৃঙ্খলিত একটি জাতিকে মুক্তির পাঠ পড়িয়ে নেন সর্বাগ্র চেতনাকে ধারণ করে। যেখানে ধর্মীয় ঐতিহ্যকেও তিনি উপস্থাপন করেছেন কঠোর, অথচ নান্দনিক ছন্দে। ব্রিটিশ শাসনকালে রাজনৈতিক নিপীড়ন-সহ আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও ধর্মীয় সংকীর্ণতা মানুষকে আত্মিকভাবে দুর্বল করে তুলেছিল। আর এই নতজানু চেতনাকেই সোজা করে দাঁড় করাতে নজরুল প্রতিষ্ঠা করেন মানুষের জন্মগতভাবে স্বাধীন চেতনা বোধের শক্তির অনুধাবনের প্রচেষ্টা, যা তাঁকে মাথা না নোয়ানোর শিক্ষা দেয়। মুক্তির দর্শনের সঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে নজরুল দ্রোহের আলোকিত মঞ্চে সাজিয়েছেন পারস্পরিক সম্পূরক রূপে। বিদ্রোহ মানে কেবলই ধ্বংস নয়; বরং সকল অনৈতিকতার বিরুদ্ধে মানবাত্মার সবল জাগরণ। আর এই জাগরণ তথা মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন মানুষ তার আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হবে। তাইতো কবি নিজেকে কখনও ঝঞ্ঝা, কখনও ঘূর্ণিঝড়, কখনও অগ্নি, আবার কখনও আখ্যায়িত করেছেন, মহাপ্রলয় রূপে। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন, মানুষের জয় নিশ্চুপে নিপীড়িত হবার মাঝে নয়; বরং সে যখন এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে তখন তাঁর ভেতরে এক অদম্য শক্তির জন্ম দেয়। যেই শক্তির আগ্রাসনী যাত্রায় সকল বাধাই খড়-কুটোর মতো উড়ে যায়। নজরুলের এই বিদ্রোহ যে কেবল রাজনৈতিক নয়; বরং সমাজের সকল বিভাজন আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তিনি তাঁর এই সাম্য-বাণীতে নিজেকে তাই কখনও হিন্দু দেবতার অক্ষয় শক্তি (শিবের পিনাকপাণি, পরশুরামের কঠোর কুঠার) তো কখনও ইসলামী ঐতিহ্যের বীরত্ব ও আধ্যাত্মিকতার এক শাণিত চৌকষ চেতনায় উজ্জীবিত এক প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এর মাধ্যমেই তিনি মানবতার সার্বজনীন পরিচয়কে এঁকেছেন কবিতার সূক্ষ চারকোলের কালিতে।
ভয়ের শৃঙ্খল হতে মুক্তির ডাকের আহ্নবানের জয়পথ কবি এই “বিদ্রোহী” কবিতায় ছন্দিত করেছেন সুগভীর ভাবনার আলোকে। সমাজ শোষনে শাসকগোষ্ঠী কতৃক শোষিত মানুষের ওপর নিক্ষেপ করা সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হল মানবমনে ত্রাসের পাঁচিল গড়ে তোলা। বিদ্রোহী কবিতার মধ্য দিয়ে নজরুল সেই পাঁচিলকে কেবল গুঁড়িয়ে নয়; বরং প্রতিবাদের এমন এক অগ্নিময় ও গতিময় ভাষা তৈরী করেছেন যে, সেই স্ফুলিঙ্গ আজও মুক্তিকামী মানুষের রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে পৃথিবী বদলালেও শোষণ ও নিপীড়নের সিলসিলা এখনও অব্যাহত। আজও মত প্রকাশে মানুষ ত্রস্ত, সংকুচিত, ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের কাছে অবদমিত। এই অসহায়ত্বের ছায়ায় আজও যখন নিষ্পেষিত মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন নজরুলের কণ্ঠ আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় নীরবতায় মুক্তি মেলে না। কাঙ্ক্ষিত মুক্তির স্বাদ আস্বাদনে শির উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। তাতেই মানুষের পরিচয়। মানবতার জয়। কেবল ভেঙে-চুরে চুরমার করা নয়; বরং নতুন করে সমাজ গড়ে তোলার ব্রতটাও যে মানব অগ্রযাত্রার মহাপাঠ — একথা তিনি বিদ্রোহী কবিতার মধ্য দিয়েই বুঝিয়েছেন। তাঁর কবিতায় যেমন আগুনের লেলিহান আগ্রাসন আছে, তেমনি রয়েছে প্রেমের সৌন্দর্য ও মানবতার সুর। জাগরণের কবি নজরুলের এই বিদ্রোহী কবিতাকে নিছক একটি কবিতা না বলে যদি একে শক্তিশালী এক কাব্যিক ঘোষণা বলা হয়, তবে সেটা হবে যথার্থ মূল্যায়ন। নজরুলের অগ্নিময় ভাষা মানুষকে পড়িয়েছে প্রকৃত মুক্তির পাঠ। তাই সময় অনেকদূর গতি বদলালেও আজও বদলায়নি এই কবিতার জ্বালাময়ী আবেদন। মানুষের মুক্তির বাসনা, স্বাধীনতার সংগ্রাম যতদিন এই ধরিত্রীর বুকে জাগ্রত থাকবে, ততদিন মিথ আর ঐতিহ্যের সোনালি রিবনে সাজানো নজরুলের এই বিদ্রোহী কবিতার সবল উচ্চারণ ও প্রাসঙ্গিকতা বেঁচে থাকবে স্বমহিমায়, স্বগর্বে।








