৯ জিলহজ পবিত্র আরাফা দিবস: আরাফার ইতিহাস ও গুরুত্ব
রফিকুল হাসান: ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু দিন রয়েছে, যেগুলো কেবল পঞ্জিকার পাতা বা নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিনগুলো মানুষের আত্মশুদ্ধি, বিনয়, অহংকার মুক্তি, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক অনন্য ও সর্বজনীন শিক্ষা বহন করে। ইসলামের ইতিহাসে তেমনই এক সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত দিন হল ‘আরাফা দিবস’। প্রতি বছর ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জির শেষ মাস অর্থাৎ জিলহজ মাসের ৯ তারিখে এই পবিত্র দিনটি পালিত হয়। বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মেলন হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান রোকন বা অংশ হল আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। আর এই কারণেই নবী করীম (সা.) পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘আল-হাজ্জু আরাফাহ্’ অর্থাৎ আরাফার ময়দানে অবস্থান করাই হল হজ। সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত প্রায় ১২ কিমি বিস্তৃত এক বিশাল প্রান্তর, যা ‘ময়দানে আরাফাত’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। প্রতি বছর জিলহজ মাসের এই নির্দিষ্ট দিনে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে, ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ মুসলমান এই পবিত্র ময়দানে এসে সমবেত হন। সবার পরনে থাকে একই রকম সেলাইবিহীন সাদা ইহরামের পোশাক। সেই বিশাল জনসমুদ্রে যখন ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা, শাসক-শোষিত, কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারে এসে দাঁড়ায়, তখন জাগতিক সব বৈষম্য ও কৃত্রিম দেয়াল মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই দৃশ্য যেন গোটা মানবজাতির ঐক্য, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং পরকালের মহা-হাশরের ময়দানের এক অপূর্ব ও হৃদয়স্পর্শী প্রতিচ্ছবি।
‘আরাফা’ শব্দের অর্থ হল পরিচয় হওয়া, জানা বা গভীর কোনো সত্য উপলব্ধি করা। এই নামকরণের পিছনে ইসলামী ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু বর্ণনা রয়েছে। তফসীরবিদ ও ঐতিহাসিকদের মতে, আদি পিতা হযরত আদম (আ.) ও আদি মাতা বিবি হাওয়া (আ.) আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে পতিত হয়েছিলেন। দীর্ঘকাল ধরে কান্নাকাটি ও বিচ্ছেদের যাতনা সহ্য করার পর, অবশেষে জিলহজ মাসের ৯ তারিখে এই বিশাল প্রান্তরে এসে তাঁদের পুনর্মিলন হয়েছিল। তাঁরা একে অপরকে চিনতে পেরেছিলেন এবং আল্লাহর দরবারে তাওবাহ করেছিলেন। একে অপরকে চেনার বা পরিচিত হওয়ার এই ঐতিহাসিক সূত্র ধরেই স্থানটির নাম হয়েছে ‘আরাফাত’। অন্য এক বর্ণনা মতে, হযরত জিবরাইল (আ.) যখন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে হজের সমস্ত নিয়ম-কানুন হাতে-কলমে শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন এই ময়দানে এসে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আ-রাফতা?’ অর্থাৎ ‘তুমি কি সব বুঝতে পেরেছ?’ ইব্রাহিম (আ.) উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আরাফতু’ (হ্যাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি)। এই কারণে একে আরাফাত বলা হয়। মানবেতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল এই আরাফার ময়দানেই। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজে (প্রথম ও শেষ হজ) এই আরাফার ময়দানে অবস্থিত ‘জাবালে রহমত’ বা রহমতের পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক ও কালজয়ী ভাষণ প্রদান করেছিলেন। ১০ হিজরির সেই ভাষণে তিনি কেবল মুসলমানদের জন্যই নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির মুক্তির সনদ হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। তিনি মানবতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, নারীর অধিকার, দাসের অধিকার, জান-মালের নিরাপত্তা, সুদ প্রথার বিলোপ এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এমন এক কঠোর ও অকাট্য বার্তা দিয়েছিলেন, যা আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে অন্ধকার পৃথিবীকে আলোর পথ দেখিয়েছিল এবং আজও বিশ্বমানবতার জন্য এক অনন্য দিকনির্দেশনা হয়ে আছে।

তিনি সেদিন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের, কিংবা কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো প্রাধান্য নেই। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান, যে বেশি পরহেজগার ও চরিত্রবান।” আরাফার দিনের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব এতটাই অপরিসীম যে, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এই দিনের প্রশংসা করেছেন। এই দিনেই দ্বীন বা ইসলাম পূর্ণতা লাভ করেছিল। সূরা আল-মায়েদাহর তিন নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।” ইসলামী ইতিহাস ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই মহান ঐতিহাসিক আয়াতটি বিদায় হজের দিন আরাফার ময়দানেই নাযিল হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে, এই দিনটি মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পরম উপহার এবং ইসলামের পূর্ণতার মহাস্মারক। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরাফাত থেকে ফেরার পরের করণীয় সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন: “অতঃপর যখন তোমরা আরাফাত থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশআরে হারামের (মুজদালিফার) নিকট আল্লাহকে স্মরণ করো এবং তাঁকে তেমনভাবে স্মরণ করো, যেমনটি তিনি তোমাদের শিখিয়েছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৯৮)।
এই নির্দেশটি আরাফার ময়দানের অবস্থান এবং তার পরবর্তী ইবাদতের গুরুত্বকে আরও বেশি স্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে, আরাফার দিন হল চোখের পানি ফেলার দিন, একান্ত মোনাজাত, তাওবাহ ও আত্মবিশ্লেষণের দিন। এই দিনে হাজিগণ দ্বিপ্রহরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাত তুলে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করেন, নিজেদের জীবনের জানা-অজানা সমস্ত গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মানুষ তার অতীত জীবনের ভুল-ত্রুটি ও অহংকার ধুয়ে-মুছে ফেলে এক নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র হয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার দীপ্ত অঙ্গীকার করে। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন,“আরাফার দিনের চেয়ে আর কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তাআলা এত বিপুল সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন।” এই দিনে শয়তান সবচেয়ে বেশি লজ্জিত, অপমানিত ও বিতাড়িত বোধ করে। কারণ, সে মানুষের দীর্ঘদিনের জমানো পাপের পাহাড়কে আল্লাহর ক্ষমার সাগরে নিমেষেই বিলীন হয়ে যেতে দেখে। যেসব মুসলিম নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মক্কায় গিয়ে হজের এই মহাসম্মেলনে অংশ নিতে পারেন না, দয়াময় আল্লাহ তাদের জন্য এই দিনের বরকত থেকে বঞ্চিত করেননি। বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত সাধারণ মুসলমানদের জন্য আরাফার দিনে রোযা রাখার বিশেষ বিধান ও ফজিলত রয়েছে। সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আরাফার দিনের রোযার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এই রোযা তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা বা ক্ষমা হিসেবে গণ্য হবে।” এই একটি মাত্র রোযা ঘরে বসেই একজন মুমিনকে ধৈর্য, আত্মসংযম এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অনন্য সুযোগ করে দেয়।

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক পৃথিবীতে মানুষ বাহ্যিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের নৈতিকতা, আত্মিক শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। হিংসা, অহংকার, জাতিগত বিদ্বেষ-বৈষম্য, লোভ এবং চরম স্বার্থপরতা আজ পুরো বিশ্বসমাজকে এক গভীর অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ক্ষয়িষ্ণু সময়ে আরাফার শিক্ষা আমাদের চেতনাকে নাড়া দেয়। এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সব ক্ষমতা, ধন-সম্পদ ও অহংকার ক্ষণস্থায়ী। আল্লাহর দরবারে মানুষের গায়ের রঙ বা ব্যাংক ব্যালেন্সের কোনো মূল্য নেই, সেখানে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিষয় হল অন্তরের পবিত্রতা ও তাকওয়া। আরাফা কেবল চব্বিশ ঘণ্টার একটি নির্দিষ্ট দিনের নাম নয়, এটি মানুষের ঘুমন্ত আত্মাকে জাগ্রত করার এক জীবন্ত ও চিরন্তন পাঠশালা। এটি মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে শেখায়, অন্যায়ের পথ ছেড়ে ন্যায়ের পথে ফেরার সৎ সাহস জোগায়। আজ ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটা স্তরে মানুষ যদি আরাফার এই মহান ও সাম্যবাদী শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, তবে এই পৃথিবী থেকে সমস্ত যুদ্ধ, হানাহানি ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে এবং মানবসভ্যতা এক শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও সুন্দর আগামীর দিকে এগিয়ে যাবে।








