থাইকা খ্যস্তা গেনু: মৃত্যু, স্মৃতি ও সময়ের গল্প
উমর ফারুক: “থাইকা খ্যস্তা গেনু…” এই বাক্যটি শুনেই আমি আঁতকে উঠলাম। মাস ছয়েক আগে একবার গিয়েছি বড়-মা সাক্ষাৎ করতে। আমার আওয়াজ পেয়েই বলল- কে, ফারুক? আমি বললাম, হ্যাঁ, বড়-মা। তোমাকে দেখতে এসেছি। একথা শুনে সে অত্যন্ত মায়াবী স্বরে বলল, এতদিন পর! তোর কথা অনেক মনে পড়ে। এভাবে বলতে বলতে অনেক পুরনো কথাও বলল। এমনকি সে তার বাল্যকালের স্মৃতিকথাও আমাকে শুনিয়েছিল। দাদুদের অনেক পুরনো শেকড় তাদের বংশের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। দাদুর মৃত্যু প্রসঙ্গ আস্তে আস্তে বড়-মা একবার আক্ষেপের সুরে বললেন… “থাইকা খ্যস্তা গেনু…” এই বাক্যটি শুনে আমি চমকে উঠলাম। কেন তোমার মৃত্যুর ভয় করে না। বলল, আমার বয়সের কেউ আর বেঁচে নেই। যারা মারা যাচ্ছে, তারা আমার মেয়ের বয়সী। আসলে মানুষ মৃত্যুকে তখনই ভয় করে, যখন দুনিয়ায় বেঁচে থাকার তার নানান ধরনের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে থাকে। মানুষ মৃত্যুকে তখনো ভয় করে, যখন দুনিয়ার মোহ তাকে আষ্টেপিষ্টে ধরে মাকড়সার জালের মতো সে জড়িয়ে পড়ে দুনিয়াবী কাজ-কামে। পরকালের চিন্তা-ভাবনা যখন সে ভুলে যায়। মৃত্যুর পরে যে আরেকটা জীবন আছে, সেই জীবনের কথা যখন স্মরণ করতে ভুলে যায়, তখনই মানুষ মৃত্যুকে ভয় করে; কিন্তু যখন তার পরকাল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে নিজের মধ্যে কনফিডেন্স তৈরি হয়ে যায়, তখন তার কাছে মনে হয়, এটা একটা আমার জন্য বড় প্রাপ্তি সংবাদ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র জীবনবিধান আল কুরআনে বলেছেন, প্রত্যেক ব্যক্তিকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, কেউ এর থেকে রেহাই পাবে না, অতীতে কেউ পায়নি। পাঠের সম্পদের অধিকারী। কারণ, মুসা নবীর জামানায় নিজেকে দুনিয়ার বাদশাহ বলে ঘোষণা করেছিল। সে বলেছিল, তার কখনো মৃত্যু হবে না, তার সম্পদ কখনো ধ্বংস হবে না, সে সারা জীবনের জন্য এই সম্পদ নিয়ে বেঁচে থাকবে। অতঃপর মুসা নবীর ঈশ্বর তত্ত্বে স্বীকার করল না। ফলে আল্লাহ তাকে এমন শাস্তি দিল তার সম্পদ এবং সে কেয়ামত পর্যন্ত ভূগর্ভে প্রবেশ করবে। শেষ পর্যন্ত তাকেও মরতে হয়েছে। মানবজাতির পিতা নবী ইব্রাহিম (আ.) এর জামানায় আরেকটি ঘটনা উল্লেখ রয়েছে। নমরুদ নামক এক অত্যাচারী শাসক ছিল, যে নিজেকে ঈশ্বরের পরপর স্থান দাবি করেছিল। তার মতে, কখনো সে ঈশ্বরকে স্বীকার করবে না, সে মরবে না, তার সমস্ত সম্পত্তি আজীবন পর্যন্ত টিকে থাকবে; কিন্তু তাকে এমন এক করুণ মৃত্যু দিল, যেটা সারা পৃথিবীর জন্য ইতিহাস হয়ে থাকল। সামান্য একটি মশার কারণে তার মৃত্যু হয়েছিল। এমন করে বহু ঘটনা উল্লেখ আছে কুরআনে, যারা নিজেকে মৃত্যুর দূত বলে দাবি করলেও তাদের কিন্তু শেষ পর্যন্ত মরতে হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করার পরে পরেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কুল্লু নাফসিন জাইকাতুল মাউত’ অর্থাৎ প্রত্যেক জীবকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তিনি একথা বলেননি যে, মানুষকে তিনি বলেছেন, জীব বলতে আমরা বুঝি, যাদের জন্ম আছে। সুতরাং মৃত্যুবরণ করতে হবে, এটাই শেষ কথা, এটাই চূড়ান্ত।
যখন কেয়ামত সংঘটিত হবে, পৃথিবী যখন ভেঙে খানখান হয়ে যাবে, আকাশ চুরমার হয়ে যাবে, পাহাড়-পর্বত নদী-নালা সাগর-মহাসাগর শুকিয়ে যাবে, সারা পৃথিবী যখন একটা ময়দানে পরিণত হবে, সেই সময় যখন একটা মানুষ বা জীব প্রজাতি বেঁচে থাকবে না, তখনও যারা প্রত্যেকটা মানুষের জান কবজ করে, সেই আজরাইল ফেরেস্তা, তাকেও মরতে হবে। তার মৃত্যুটা কীভাবে হবে, এ কথাও হাদিস পাকে উল্লেখ করা আছে। আজরাইল ফেরেশতা যখন নিজের জান কবজ করবে, তখন সে বিকট চিৎকার করবে, আর সেই চিৎকারে আকাশ ফেটে যাবে, সে নিজেই নিজেকে হত্যা করবে, আর সেই হত্যার দৃশ্য তখন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখবেন। মৃত্যুর জন্য এতটা কঠিন এবং করুণ শাস্তির বিধান আল্লাহ দিয়েছেন প্রত্যেকটা মানুষকে শুধরানোর জন্য। শুধু আমরা মানুষই বোকা। মানুষ দুনিয়াবী সম্পদের লোভে ঠুনকো লোভ-লালসায় নিজেকে এতটাই ডুবিয়ে রেখেছে যে, পরকালের কথা স্মরণ করতেই ভুলে যায়।
বর্তমানে দেখা যায়, প্রবীণ মানুষগুলো ক্রমে ক্রমে দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, আর রেখে যাচ্ছে নবীন প্রজন্ম, যারা লোভ-লালসায় নিজেকে অন্ধ করে রাখছে। আমরা শোকাহত, মর্মাহত এই ধরনের প্রবীণ মানুষগুলো, যারা ছাতার মতো নবীন প্রজন্মকে নিরাপত্তার বলয়ে ঢেকে রাখত, একে একে তারা সবাই দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে। নবীন প্রজন্ম ধীরে ধীরে ধূসর গোধূলির অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। পৃথিবীকে জন্ম দিচ্ছে নরকের আঁতুড়ঘর। ২০২১ থেকে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ অত্যন্ত শোকস্তব্ধ ছিল আমার জীবনে। কারণ, এই সময় কালের মধ্যে আমরা এমন এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রবীন মানুষদেরকে হারিয়েছি, যারা শুধু আমাদের গ্রামকেই নয়; আমাদের যুব সমাজকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে কম করে হলেও ১০০ জন বয়স্ক ব্যক্তিকে হারিয়েছি। এরপর থেকে গ্রামের মোড়ল-সরদার সমস্ত কিছু একটা টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে, যারা সমাজকে আরো অন্ধকারের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এরকম সমাজ আমরা কখনোই চাই না, যেখানে থাকবে হিংসার রাজনীতি। ন্যায় এবং সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা হারিয়ে গিয়েছে নোংরা রাজনীতির আখড়ায়। এমতাবস্থায় দাঁড়িয়ে ২০২১ সালের আগের দৃশ্য এটা প্রমাণ করে যে, বর্তমান প্রজন্ম ধীরে ধীরে হকের পথ থেকে বিমুখ হয়ে গিয়েছে।
ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা, যেখানে বয়স্কদের কথা তরুণ সমাজ শুনছে না। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস আলাদা করলে দেখা যায়, সর্বপ্রথম বয়স্কদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল সভা। এই সভা নেতৃত্ব সমাজের ধীরে ধীরে গড়ে উঠল রাজা-মন্ত্রীপরিষদ অতঃপর দেশ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। গৌতম বুদ্ধ যে অঞ্চলে জন্মেছিলেন, সেটি ছিল বজ্জি রাজ্য। এটি উপজাতি সম্প্রদায়ের অঞ্চল নামে পরিচিত। খ্রিষ্ট্রীয় ষোড়শ শতকে যে ১৬টি মহাজনপদ গড়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল বজ্জি। তবে অন্যান্য ১৪টি মহাজনপদ ছিল রাজতান্ত্রিক; আর বজ্জি ও মল্ল ছিল একমাত্র গণতান্ত্রিক রাজ্য। কিন্তু রাজতান্ত্রিক রাজ্যগুলি গণ রাজ্য বা গণতান্ত্রিক রাজ্যগুলোকে বারবার আক্রমণ করত। গৌতম বুদ্ধ নিজের জাতি ও দেশকে রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বারোটি উপদেশ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হল, বয়স্কদের কথা মেনে চলা। তাহলে এখান থেকেও পরিষ্কার যে, ভারতীয় উপমহাদেশে শাসনব্যবস্থা মূলত গড়ে উঠেছিল বয়স্কদের নিয়েই। সেই নিরিখে বর্তমান সমাজকে যদি তুলনা করতে যায় তাহলে দেখতে পাব, এই সমাজ কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তাহলে কি এটা চিন্তার বিষয় নয় যে, বয়স্করা হারিয়ে যাওয়ায় সমাজ কত মূল্যবান রত্ন হারাচ্ছে? আমরা বয়স্কদের অবদান কীভাবে ভুলতে পারব? গ্রাম থেকে যদি শুরু করা যায়, তাহলে এই প্রবীণদের কথাই প্রথম মাথায় আসবে, যাদেরকে আমরা হারিয়ে দিচ্ছি ধীরে ধীরে, তাদেরকে কিন্তু আমরা কেউ আর স্মরণ করি না, তাদের পথ ও মত কখনোই আমরা মেনে চলতে চাই না। কাজেই ধীরে ধীরে সমাজ অপসংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে পড়েছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে যুবসমাজ, আর এই যুব সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল বৃদ্ধ প্রবীণদের কথা শোনা, তাদের পথ ও মতের অনুসারী হওয়া।








