একমেরু বিশ্বের অধ্যায় শেষ; শুরু বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা
খান বাহাদুর শেখ: স্নায়ুদ্ধের পর যখন ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে, তখন আমেরিকা বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী তিন দশক ধরে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী নিজেদের তৈরি করা নিয়ম ও মানদণ্ড অনুযায়ী একচ্ছত্রভাবে রাজত্ব করেছে, যাকে বলা হয় নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার। ইউরোপও ন্যাটোর ছায়াতলে এসে ওয়াশিংটনের নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়। সেই সময়ে চীন ও রাশিয়া আমেরিকার সাথে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে অত্যন্ত ধীর ও হিসেবি উপায়ে ভিতরে ভিতরে নিজেদের শক্তি গড়ে তোলে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে এবং ইউরোপ এখন নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের দিকে ঝুঁকছে। তাই ট্রাম্প বনাম ইউরোপ সম্পর্কে ইদানীং ফাটল ক্রমেই চওড়া হচ্ছে। অন্যদিকে, ২০০৯ সাল থেকে চীন-রাশিয়া এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী অ-পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কারণে রাশিয়া এখন তাদের অর্থনৈতিক মনোযোগ পুরোপুরি পূর্ব দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। চীনও এখন পশ্চিমা ব্যবস্থাপনার ওপর একতরফা নির্ভর না করে বেল্ট অ্যান্ড রোড এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে নিজেদের বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে চীনা মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি এর বড় প্রমাণ। দীর্ঘদিন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং ব্রিকস প্লাসের মাধ্যমে এক নতুন কৌশলগত সুরক্ষাকবচ খুঁজে পেয়েছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইল যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর আগের মতো একজোট না হওয়া। জ্বালানি বা পেট্রোল-গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা, সংকট এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিপর্যয় সত্ত্বেও মিত্ররা এবার ওয়াশিংটনের পেছনে এসে দাঁড়ায়নি। একই সাথে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার পশ্চিমা কৌশলও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, এ বছরও রাশিয়ার অর্থনীতি জার্মানি বা ফ্রান্সের চেয়েও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্পের চীন সফর এবং তাদের আলোচ্যসূচিও বিশ্বশক্তির এই ভারসাম্যের পরিবর্তনকে প্রমাণ করে। বোয়িং বিমান কেনা, AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা, হরমুজ প্রণালী ও তাইওয়ান ইস্যু — সব মিলিয়ে বেইজিং এখন কৌশলগত দরকষাকষিতে ওয়াশিংটনের তুলনায় অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ট্রাম্পের চীন সফর সূচিত হয় ইরানি বিদেশমন্ত্রীর বেইজিং সফরের ঠিক পর পরই এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরের ঠিক আগে। আজ চীন বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি প্রবাহ এখন আর মার্কিন পরাশক্তির পুরনো হিসাব অনুযায়ী চলে না। চীন সরাসরি কোনো যুদ্ধে না জড়িয়ে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব সংকটকে নিজেদের স্বার্থে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হওয়া এবং রাষ্ট্রসংঘের সর্বোচ্চ সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) নিষ্ক্রিয়তা প্রমাণ করে, বৈশ্বিক মেরুকরণ এখন আর ওয়াশিংটনের হাতে একতরফা নিয়ন্ত্রণে নেই। একসময় যে আমেরিকা সারা বিশ্বকে নিয়ম শেখাত, আজ সেই আমেরিকাকেই নতুন বিশ্বের নিয়মের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। সুতরাং, একমেরু বিশ্বের অধ্যায় শেষ; এখন শুরু বহুমেরু শক্তির বাস্তবতা।








