কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষকে সমৃদ্ধ করে
রফিকুল হাসান: মানুষের জীবন শুধু দেহ, অর্থ কিংবা বাহ্যিক সাফল্যের সমষ্টি নয়। মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তার চরিত্র, আচরণ ও মানসিকতার মধ্যে। এমন অনেক গুণ আছে, যা মানুষকে শুধু ভাল মানুষই বানায় না; বরং তার জীবনকে অর্থবহ ও সুন্দর করে তোলে। কৃতজ্ঞতা তেমনই এক অনন্য গুণ। এটি এমন একটি আলো, যা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে, সম্পর্ককে মজবুত করে এবং জীবনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। যে মানুষ কৃতজ্ঞ হতে জানে, সে কখনও পুরোপুরি নিঃস্ব হয় না। কারণ, তার হৃদয়ে সবসময় প্রাপ্তির অনুভূতি বেঁচে থাকে। বর্তমান যুগে মানুষ উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। প্রযুক্তির বিস্ময়, আধুনিক সভ্যতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি — সবকিছু যেন মানুষের হাতের মুঠোয়। কিন্তু এত উন্নতির মাঝেও মানুষের অন্তরে অদ্ভুত এক শূন্যতা বাড়ছে। মানুষ আগের তুলনায় বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, কিন্তু শান্তি কমে যাচ্ছে। কারণ, মানুষ ধীরে ধীরে কৃতজ্ঞতা বোধ হারিয়ে ফেলছে। মানুষ নিজের প্রাপ্তির দিকে না তাকিয়ে সবসময় অপূর্ণতার দিকে তাকিয়ে থাকে। ফলে, তার জীবন অভিযোগ, হতাশা ও অস্থিরতায় ভরে ওঠে। একজন কৃতজ্ঞ মানুষ, আর একজন অকৃতজ্ঞ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। কৃতজ্ঞ মানুষ অল্পের মাঝেও সুখ খুঁজে পান। তিনি জানেন, জীবনের প্রতিটি ছোট নিয়ামতেরও মূল্য আছে। সকালে সুস্থ শরীরে ঘুম থেকে ওঠা, পরিবারের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, কারও আন্তরিক ভালবাসা পাওয়া, একবেলা খাবার খেতে পারা — এগুলোই তো জীবনের প্রকৃত সম্পদ। কিন্তু মানুষ যখন শুধু অভাবের হিসাব করতে শুরু করে, তখন সে নিজের আশপাশের অসংখ্য নিয়ামতকে অস্বীকার করে বসে।
অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকা বা মানুষের সমৃদ্ধির একমাত্র মানদণ্ড যে ধন-সম্পদ নয় — এই বাস্তবতা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। পৃথিবীতে এমন বহু ধনী মানুষ আছেন, যাদের ঘরে অর্থ আছে কিন্তু শান্তি নেই, খ্যাতি আছে কিন্তু সুখ নেই। আবার এমন বহু মানুষ আছেন, যাদের সম্পদ কম হলেও হৃদয়ে প্রশান্তি রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হল, কৃতজ্ঞতা বোধ। কৃতজ্ঞ হৃদয় মানুষকে সন্তুষ্ট থাকতে শেখায়। আর সন্তুষ্টিই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ইসলাম কৃতজ্ঞতার শিক্ষা অত্যন্ত সুন্দরভাবে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:“তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।”(সূরা ইবরাহিম: ০৭)। এই আয়াতের মধ্যে মানুষের জীবনের গভীর এক রহস্য লুকিয়ে আছে। আল্লাহ কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে (নিয়ামত) বৃদ্ধি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই বৃদ্ধি শুধু অর্থের নয়; বরং জীবনের প্রতিটি কল্যাণের। কখনও তা হয় রিজিকের বরকত, কখনও মানসিক প্রশান্তি, কখনও ভাল সম্পর্ক, আবার কখনও সম্মান ও ভালবাসা। কৃতজ্ঞ মানুষ আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে, আর আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট হন, তার জীবন কখনও অর্থহীন থাকে না।

কৃতজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী করে। কারণ, কৃতজ্ঞ মানুষ উপলব্ধি করেন, তিনি একা সবকিছু অর্জন করেননি। তার পেছনে অসংখ্য মানুষের অবদান রয়েছে। একজন সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের ত্যাগ আছে, একজন শিক্ষিত মানুষের জীবনে শিক্ষকের পরিশ্রম আছে, একজন সফল মানুষের জীবনে সমাজের সহযোগিতা আছে। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে মহান আল্লাহর অশেষ দয়া ও রহমত। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে। অহংকার মানুষকে ধ্বংস করে, আর কৃতজ্ঞতা মানুষকে উন্নত করে। যে ব্যক্তি নিজের সব অর্জনকে শুধু নিজের কৃতিত্ব মনে করে, সে ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যায়। কিন্তু কৃতজ্ঞ মানুষ সবসময় অন্যের অবদান স্মরণ রাখেন। তাই তিনি মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন, ছোট উপকারকেও মূল্য দেন এবং কাউকে তুচ্ছ মনে করেন না। আজকের সমাজে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল অকৃতজ্ঞতা। মানুষ অন্যের ভালবাসা ও ত্যাগকে খুব দ্রুত ভুলে যায়। সন্তান বাবা-মায়ের কষ্ট ভুলে যায়, শিক্ষার্থী শিক্ষকের সম্মান ভুলে যায়, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের অবদানকে অবহেলা করে। ফলে, সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ একটি ছোট “ধন্যবাদ”, একটি আন্তরিক কৃতজ্ঞতার বাক্য কিংবা কারও উপকার স্মরণ রাখা — সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুন্দর করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়।”(সুনানে তিরমিযী)। এই হাদিস আমাদের শেখায়, মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ঈমানের সৌন্দর্যের অংশ। কেউ সামান্য সাহায্য করলেও তাকে সম্মান করা, তার জন্য দোয়া করা এবং তার উপকার স্মরণ রাখা একজন মুমিনের আসল পরিচয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সমাজে মানুষ খুব সহজে অভিযোগ করতে শেখে, কিন্তু কৃতজ্ঞ হতে শেখে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ অন্যের বিলাসী জীবন দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভাবতে শুরু করে। ফলে, তার মধ্যে হীনমন্যতা ও অস্থিরতা জন্ম নেয়। অথচ যদি সে নিজের জীবনের প্রাপ্তিগুলোর দিকে তাকায়, তাহলে বুঝতে পারবে, আল্লাহ তাকে কত অগণিত নিয়ামত দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ”বলার নাম নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত অনুভূতি। প্রকৃত কৃতজ্ঞতা হল নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার করা, আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতসমূহের খেয়ানত না করা। আল্লাহ জ্ঞান দিলে তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা, সম্পদ দিলে গরিবের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষমতা দিলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা — এগুলোই প্রকৃত শুকরিয়া। কারণ, কৃতজ্ঞতা শুধু অনুভূতি নয়, এটি দায়িত্ববোধও সৃষ্টি করে। মানুষ যখন কৃতজ্ঞ হতে শেখে, তখন তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সে হতাশার মাঝেও আশা খুঁজে পায়, বিপদের মাঝেও শিক্ষা খুঁজে পায়। এমনকি দুঃখের সময়েও সে বুঝতে পারে, আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালার মধ্যেই কোনো না কোনো কল্যাণ রয়েছে। এই বিশ্বাসই তাকে ভেঙে পড়তে দেয় না।

কৃতজ্ঞতা মানুষকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে। কারণ, কৃতজ্ঞ মানুষ সবসময় প্রাপ্তির দিকে তাকায়, হারানোর দিকে নয়। তাই তার অন্তরে হিংসা কম থাকে, অভিযোগ কম থাকে এবং হতাশাও কম থাকে। সে অন্যের সুখ দেখে কষ্ট পায় না, বরং নিজের নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। আমাদের উচিত প্রতিদিন কিছু সময় নিজের জীবনের দিকে তাকানো। ভাবা, “আমরা কী কী পেয়েছি?” হয়ত আমাদের সব স্বপ্ন পূরণ হয়নি, কিন্তু এমন অসংখ্য নিয়ামত আমাদের কাছে আছে, যা অন্য অনেক মানুষের কাছে কেবলই স্বপ্ন। কেউ হাসপাতালে শুয়ে সুস্থতার জন্য কাঁদছে, কেউ একমুঠো খাবারের জন্য সংগ্রাম করছে, কেউ আপনজন হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। সেখানে আমরা কত কিছু পেয়েও অখুশি থাকি! এই উপলব্ধি মানুষকে কৃতজ্ঞ হতে শেখায়। কৃতজ্ঞতা মানুষকে শুধু সমৃদ্ধই করে না; বরং মানুষের জীবনের সৌন্দর্যকেও বৃদ্ধি করে। কৃতজ্ঞ হৃদয় অন্ধকারের মাঝেও আলো খুঁজে পায়। কারণ সে জানে, প্রতিটি নিয়ামতের পেছনে দয়াময় মহান রবের ভালবাসা রয়েছে। পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান হল সেই হৃদয়, যে হৃদয় কৃতজ্ঞ হতে জানে। তাই আসুন, আমরা অভিযোগের ভাষা কমিয়ে কৃতজ্ঞতার ভাষা শিখি। প্রাপ্তির হিসাব করতে শিখি। মানুষের উপকারকে সম্মান করি। বাবা-মা, শিক্ষক, সমাজ ও সর্বোপরি মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হই। কারণ, কৃতজ্ঞ হৃদয়ই প্রকৃত অর্থে সবচেয়ে ধনী হৃদয়, আর কৃতজ্ঞ মানুষই সত্যিকারের সমৃদ্ধ মানুষ।








