গোরু বিতর্ক: বহুত্ববাদী বাস্তবতাকে মানলেই সংঘাত কমবে
রফিক আনোয়ার: ভারত এমন এক দেশ যেখানে ধর্ম, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি আর জীবনযাত্রার বৈচিত্র হাজার বছরের ইতিহাসে গড়ে উঠেছে। এই বহুত্ববাদই ভারতের শক্তি। আবার কখনও কখনও এই বৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করেই সংঘাতের সৃষ্টি। সাম্প্রতিক সময়ে ‘গোরু বিতর্ক’ বা গরুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক উত্তেজনা ভারতের জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে গরু বহু হিন্দুর কাছে পবিত্র প্রাণী হিসেবে গণ্য হয়, অন্যদিকে দেশের বহু সম্প্রদায়ের খাদ্য সংস্কৃতি, জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে গরু ও গোমাংস জড়িত। এই বাস্তবতায় ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্রকে স্বীকার ও সম্মান করাই সংঘাত কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ। ভারতের ইতিহাসে গরুর গুরুত্ব নতুন নয়। কৃষিনির্ভর সমাজে গরু ছিল সম্পদ, শ্রমশক্তি ও জীবিকার অন্যতম ভিত্তি। হিন্দুধর্মে গরুকে ‘গোমাতা’ হিসেবে শ্রদ্ধা করার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তাই বহু মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে গরুর সম্পর্ক গভীর। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, ভারত একক সংস্কৃতির দেশ নয়। মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত, আদিবাসী আর উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু উপজাতি, আদিবাসী ও জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসে গোমাংসের উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। কেরল, গোয়া, নাগাল্যান্ড, মেঘালয় কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মতো বহু অঞ্চলে গোমাংস সামাজিক বাস্তবতার অংশ। ফলে একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিকে রাষ্ট্র বা সমাজের একমাত্র মানদণ্ড বানালে অন্য সম্প্রদায়ের অধিকার ও সংস্কৃতি উপেক্ষিত হয়। ভারতীয় সমাজে গরুকে ঘিরে বর্তমানের বিতর্ক বুঝতে হলে ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি, জাতপাত, অর্থনীতি আর পরিচয়-রাজনীতিকে একসঙ্গে দেখতে হয়। ‘গোমাতা’ ধারণা যেমন বহু শতকে গড়ে উঠেছে, তেমনই গোমাংস নিয়ে সংঘাতও আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে নতুন রূপ পেয়েছে।
প্রাচীন ভারতে গরুর ভূমিকা ছিল মূলত অর্থনৈতিক। কৃষি, দুধ, জ্বালানি ও পরিবহনের সঙ্গে গরু ও বলদ গভীরভাবে যুক্ত ছিল। বৈদিক যুগে পশুবলি ও গোমাংস ভোজনের উল্লেখ বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায় বলে বহু ইতিহাসবিদ মত দেন। পরে উপনিষদীয় চিন্তা, বৌদ্ধ-জৈন অহিংসা আর কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থার কারণে গরুকে ‘অহিংসা’ ও ‘পবিত্রতা’র প্রতীক হিসেবে দেখা শুরু হয়। মধ্যযুগে এসে কৃষ্ণভক্তি, পুরাণ আর গ্রামীণ লোকবিশ্বাসের মাধ্যমে ‘গোমাতা’ ধারণা আরও শক্তিশালী হয়। গরু তখন শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, ধর্মীয় পরিচয়েরও প্রতীক হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক যুগে এই প্রশ্ন আরও রাজনৈতিক হয়ে যায়। ঊনিশ শতকে উত্তর ভারতে ‘গোরক্ষা আন্দোলন’ শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময় বহু জায়গায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কেন্দ্রে ছিল গোহত্যার প্রশ্ন। কারণ, একদিকে বহু হিন্দুর কাছে গরু ছিল পবিত্র; অন্যদিকে মুসলিম সমাজের একাংশে গোমাংস খাদ্য সংস্কৃতির অংশ ছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন অনেক সময় এই বিভাজনকে নিয়ন্ত্রণের বদলে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। স্বাধীনতার পরে ভারতের সংবিধানে পশুসম্পদ রক্ষার কথা বলা হলেও দেশজুড়ে একরকম আইন তৈরি হয়নি। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন নিয়ম তৈরি হয়। কোথাও সম্পূর্ণ গোহত্যা নিষিদ্ধ, কোথাও আংশিক, আবার কোথাও বৈধ। ফলে বিষয়টি আইনি ও সাংস্কৃতিক — উভয় দিক থেকেই জটিল রয়ে যায়। গত কয়েক দশকে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষত ২০১৪-র পর থেকে ‘গোরক্ষা’র নামে গণপিটুনি, মব লিঞ্চিং, মারধর ও হত্যার ঘটনা সামনে আসে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ছিল, কারও বাড়িতে গোমাংস আছে, কেউ গরু পাচার করছে, বা গরু জবাই করেছে। পরে বহু ঘটনায় দেখা গেছে, অভিযোগ প্রমাণ হয়নি, কিন্তু ততক্ষণে সহিংসতা ঘটে গেছে। সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির রিপোর্ট অনুযায়ী এই ঘটনাগুলির বড় অংশে মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জাতপাত ও শ্রমবিভাগ। ঐতিহাসিকভাবে চর্ম শিল্প, মৃত পশু সরানো বা কসাইয়ের কাজ বহু দলিত ও মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবিকার অংশ ছিল। গোরক্ষা-রাজনীতি কঠোর হওয়ার ফলে এইসব পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে বহু হিন্দুর কাছে গরু রক্ষার দাবি ধর্মীয় অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। ফলে একই বিষয় এক এক সম্প্রদায় একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও আঙ্গিক থেকে দেখে। রাজনীতিও এখানে বড় ভূমিকা নিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গরুকে কখনও ধর্মীয় আবেগ, কখনও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, কখনও সংখ্যালঘু রাজনীতির প্রশ্ন হিসেবে ব্যবহার করেছে। সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও উত্তেজনামূলক প্রচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেক সময় কোনও ভিডিও বা গুজব মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে, আর তা থেকে হিংসার সূত্রপাত হয়। তবে এটাও সত্য যে, ভারতীয় সমাজ একরৈখিক নয়। সব হিন্দু গোমাংস-বিরোধী নন, আর সব মুসলিম বা খ্রিস্টান গোমাংস খানও না। উত্তর-পূর্ব ভারত, কেরল, গোয়া বা কিছু আদিবাসী সমাজে গোমাংস খাদ্য সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ। আবার বহু হিন্দু পরিবারে গরুকে সত্যিই মাতৃসম মর্যাদা দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ভারতীয় বাস্তবতায় ধর্মীয় বিশ্বাস ও খাদ্যাভ্যাস — দুটিই বহুবিচিত্র।
বর্তমান সংঘাতের মূল সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসকে জোর করে অন্যের উপর চাপানো হয়, অথবা খাদ্যাভ্যাসকে ‘দেশপ্রেম’ বা ‘ধর্মবিশ্বাস’ যাচাইয়ের হাতিয়ার বানানো হয়। ইতিহাস দেখায়, গরু নিয়ে ভারতীয় সমাজে ধারণা সময়ের সঙ্গে বদলেছে। তাই এই প্রশ্নকে যদি শুধুই ‘চিরন্তন ধর্মীয় সত্য’ বা ‘সম্পূর্ণ আধুনিক ষড়যন্ত্র’ — এই দুই চরম অবস্থানে দেখা হয়, তাহলে বাস্তবের জটিলতা ধরা পড়ে না। গরুকে ঘিরে আবেগ ভারতের বহু মানুষের কাছে আন্তরিক ধর্মীয় অনুভূতি। আবার খাদ্যাভ্যাস ও জীবিকার স্বাধীনতাও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। সংঘাত কমানোর পথ সম্ভবত এখানেই — আইনের শাসন, গুজব-নির্ভর হিংসার বিরোধিতা, আর ভারতের বহুত্ববাদী বাস্তবতাকে স্বীকার করার মধ্যে। আবার দেখা গেছে, সমস্যা তখনই তীব্র হয়, যখন গোরু বিতর্ককে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গোরক্ষা বা গোমাংস নিষিদ্ধকরণের নামে বহু ক্ষেত্রে হিংসা, গণপিটুনি ও সামাজিক বিভাজনের ঘটনা ঘটেছে। এতে শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নয়; বহু দরিদ্র পশুপালক, চর্মশিল্পের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে, আর নাগরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ায়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের বদলে আবেগ বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাপ যদি প্রধান হয়ে ওঠে, তবে তা সমাজে স্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করতে বাধ্য।
এই পরিস্থিতিতে সংবিধানের চেতনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের কথা বলে। অর্থাৎ প্রত্যেক নাগরিকের নিজের ধর্ম পালনের অধিকার যেমন আছে, তেমনি নিজের খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতি অনুসরণের অধিকারও রয়েছে, যতক্ষণ তা আইনসম্মত। বহুত্ববাদ মানে সবাই একই রকম হবে না; বরং ভিন্নতাকে স্বীকার করেই একসঙ্গে বসবাস করার মানসিকতা গড়ে তোলা। ভারতের শক্তি এখানেই যে, এদেশে বহু পরিচয় সুদীর্ঘকাল ব্যাপী পাশাপাশি টিকে থাকতে পেরেছে। সংঘাত কমাতে পারস্পরিক সহনশীলতা ও সংলাপ অত্যন্ত জরুরি। যারা গরুকে পবিত্র মনে করেন, তাঁদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। একইভাবে যেসব সম্প্রদায়ের খাদ্যসংস্কৃতিতে গোমাংস রয়েছে, তাদেরও নাগরিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে মর্যাদা দিতে হবে। সামাজিক সম্প্রীতি তখনই সম্ভব, যখন কেউ নিজের বিশ্বাস অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে না। শিক্ষা, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হওয়া উচিত মানুষের মধ্যে সহাবস্থান ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দুগ্ধশিল্প, পশুপালন, চর্মশিল্প আর মাংস রপ্তানির সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। গোরু নিয়ে আবেগপূর্ণ রাজনীতি অনেক সময় এই বাস্তব অর্থনৈতিক দিকগুলোকে আড়াল করে দেয়। ফলে নীতিনির্ধারণে যুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে সমাজের একটি বড় অংশ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সবশেষে বলা যায়, গোরু বিতর্ক আসলে ভারতের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার একটি পরীক্ষা। এই বিতর্কের সমাধান একপক্ষের জয় বা অন্যপক্ষের পরাজয়ে নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, সাংবিধানিক মূল্যবোধ আর বৈচিত্র্যের স্বীকৃতির মধ্যেই নিহিত। ভারতকে শান্তিপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ রাখতে হলে ‘এক দেশ, এক সংস্কৃতি’র ধারণার বদলে ‘বহু সংস্কৃতির সহাবস্থান’ বা ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’কে শক্তিশালী করতে হবে। বহুত্ববাদকে মান্যতা দেওয়াই সংঘাত কমানোর মূলমন্ত্র। একইসঙ্গে এটাই ভারতের গণতান্ত্রিক চেতনার প্রকৃত ভিত্তি।








