ডোমকলের উন্নয়নের স্থপতি আনিসুর রহমান, পুর ভোট না হওয়ায় চরম দুর্দশায় শহরবাসী
মাসুদ রহমান: একটি জনপদকে আধুনিক শহরে রূপান্তর করতে প্রয়োজন কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতা নয়; বরং প্রবল সদিচ্ছা ও দূরদর্শিতা। মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকল মহকুমার ক্ষেত্রে সেই সদিচ্ছারই অন্য নাম আনিসুর রহমান। এক সময়ের পিছিয়েপড়া সীমান্ত অঞ্চল ডোমকল আজ যেভাবে আধুনিক পরিকাঠামোয় সেজে উঠেছে, তার নেপথ্যে অন্যতম কারিগর হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা আছে প্রাক্তন প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুর রহমানের নাম। মহকুমা হিসেবে ডোমকলের আত্মপ্রকাশ এবং পরবর্তীকালে একে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত করার পথটা মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে এসডিও অফিস, এসডিপিও অফিস, কোর্ট, স্টেডিয়াম এবং রবীন্দ্র সদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভবন তৈরির জন্য যখন এক লপ্তে প্রচুর জমির প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রয়োজনীয় খাস জমির অভাব। কিন্তু উন্নয়ন যাঁর লক্ষ্য, কোনো বাধাই তাঁকে থামাতে পারে না।
উন্নয়নের সেই সন্ধিক্ষণে এক ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেন তৎকালীন মন্ত্রী আনিসুর রহমান। ডোমকলের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে যখন কৃষি দপ্তরের জমি পাওয়ায় আইনি বা প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দেয়, তখন তিনি নিজের বিচক্ষণতাকে কাজে লাগান। ডোমকলের ওই প্রয়োজনীয় জমিতে প্রশাসনিক পরিকাঠামো তৈরির পথ প্রশস্ত করতে তিনি প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে হরিণঘাটায় সমপরিমাণ জমি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন। তাঁর এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলেই ডোমকলের প্রাণকেন্দ্রে আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এসডিও অফিস, আধুনিক স্টেডিয়াম এবং সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক তীর্থ রবীন্দ্র সদন।
কেবল প্রশাসনিক ভবনই নয়; ডোমকলের সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রসারেও তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। নারীশিক্ষার প্রসারে ডোমকল গার্লস কলেজ ও ছাত্রীদের জন্য সুরক্ষিত হস্টেল নির্মাণ তাঁরই পরিকল্পনার ফসল। ডোমকলবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি মেনে আজ যেখানে মহকুমা আদালত ও প্রাণীসম্পদ বিকাশ ভবন সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর থেকে শুরু করে জমি অধিগ্রহণ — সব ক্ষেত্রেই ছিল আনিসুর রহমানের সক্রিয় তদারকি।
ডোমকলের মানুষ আজ স্বীকার করেন, “সদিচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই যে আটকে থাকে না”, আনিসুর রহমান তার উজ্জ্বল প্রমাণ। দলমত নির্বিশেষে তাঁকে ‘ডোমকলের উন্নয়নের কান্ডারী’বলা হয় কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়; বরং তাঁর নিরলস কর্মতৎপরতা ও মাটির টানের কারণে। আজকের আধুনিক ডোমকলের প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে মিশে আছে সেই উন্নয়নমুখী মানসিকতার ছাপ, যা আগামী প্রজন্মের কাছে এক আদর্শ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
ডোমকলের এই রূপান্তর কেবল একটি ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; বরং এক জননেতার উন্নয়নের প্রতি দায়বদ্ধতার দলিল।
ডোমকল পৌরসভার নাটকীয় উদ্বোধন: ২০০১-০২ সালের সেই সময় ছিল ডোমকলের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম উত্তাল অধ্যায়। একদিকে তৎকালীন দাপুটে সিপিআই (এম) নেতা তথা মন্ত্রী আনিসুর রহমান চেয়েছিলেন ডোমকলকে একটি আধুনিক শহরে উন্নীত করতে, অন্যদিকে শরিক দল ফরোয়ার্ড ব্লক-এর নেত্রী ছায়া ঘোষ ছিলেন এর ঘোর বিরোধী। ডোমকল পৌরসভার উদ্বোধনের দিন ছায়া ঘোষের নেতৃত্বে ফরোয়ার্ড ব্লক-এর কর্মীরা ইসলামপুরে মূল রাস্তা অবরোধ করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মন্ত্রীর কনভয় আটকে দেওয়া, যাতে উদ্বোধন অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে মন্ত্রী আনিসুর রহমান মূল সড়ক এড়িয়ে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে ঘুরে ডোমকলে পৌঁছান।
ফরোয়ার্ড ব্লক যখন ইসলামপুরে অবরোধ নিয়ে ব্যস্ত, তখন আনিসুর রহমান ডোমকলে পৌঁছে পৌরসভার আনুষ্ঠানিক ফলক উন্মোচন করেন। এভাবেই চরম শরিকি বিবাদ আর অবরোধের নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ডোমকল পৌরসভার যাত্রা শুরু হয়। এই ঘটনা আজও মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে আনিসুর রহমান ও ছায়া ঘোষের স্নায়ুযুদ্ধের প্রতীক হিসেবে চর্চিত হয়। মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকল পৌরসভার প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ২০১৭ সালের ১৪ মে। এবং ফলাফল ঘোষিত হয়েছিল ১৭ মে। এই নির্বাচিত বোর্ডের ৫ বছরের মেয়াদ সাধারণত ২০২২ সালের মে মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

এখন ক্যালেন্ডারের পাতা বলছে ডোমকল পৌরসভার নির্বাচিত বোর্ডের মেয়াদ ফুরিয়েছে ২০২২ সালের মে মাসে। কিন্তু তারপর দীর্ঘ ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে নির্বাচন অধরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার রাজনৈতিক টানাপড়েনে কার্যত থমকে গিয়েছে ডোমকলের উন্নয়ন। আর এই টালবাহানার চরম খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সামনেই বর্ষা, আর তার আগেই নিকাশি ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারা দেখে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন শহরবাসী। পৌরসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে ডোমকলের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সবই যেন এখন থমকে। অভিযোগ উঠছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসনের ওপর মানুষের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে ছোটখাটো সমস্যা নিয়েও দীর্ঘ সময় দপ্তরে চক্কর কাটতে হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভোট না হওয়ায় উন্নয়নের টাকা এলেও তা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন জীবনে।
ডোমকল বাজারের পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে শিয়ালমারী নদী। অথচ এই নদীকে কেন্দ্র করে উন্নত নিকাশি ব্যবস্থার যে স্বপ্ন দীর্ঘ এক দশক ধরে ডোমকলবাসীকে দেখানো হয়েছে, তা আজও শুধু প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ। অভিযোগ, কেবলমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই থমকে আছে ড্রেন ও নিকাশি সংস্কারের কাজ। বিগত দশ বছর ধরে পুরসভা থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন বারবার আশ্বাস দিয়েছে, বাজারের জমা জল এবং বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য শিয়ালমারী নদীকে যুক্ত করে আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেম তৈরি করা হবে। কিন্তু একের পর এক নির্বাচন পার হলেও বাস্তব চিত্রটা বদলায়নি। বর্ষা এলেই সামান্য বৃষ্টিতে ডোমকল বাজারের মূল রাস্তা থেকে অলিগলি — সর্বত্রই জল জমে নরককুণ্ডে পরিণত হয়।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের দাবি, শিয়ালমারী নদী হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও তাকে নিকাশির কাজে ব্যবহার করার কোনো সঠিক পরিকল্পনা বা সদিচ্ছা দেখা যায়নি। বড় বড় প্রকল্পের কথা বলা হলেও আদতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে নদীটি এখন বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এবং বাজারের নিকাশি সমস্যা ডোমকলের স্থায়ী যন্ত্রণায় রূপ নিয়েছে। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় শহরবাসী দেখেছেন, একটু বেশি বৃষ্টি হলেই নর্দমার নোংরা জল ঢুকে পড়ে মানুষের ড্রয়িং রুম থেকে রান্নাঘরে। শহরের এক প্রবীণ বাসিন্দার আক্ষেপ, “নির্বাচন হলে অন্তত অভাব-অভিযোগ জানানোর একটা জায়গা থাকে। এখন আমরা কার কাছে যাব? সামান্য বৃষ্টিতে পুরো এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে, জমা জল বেরনোর পথ নেই। ঘরে জল ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হয়, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়।”
বর্তমানে পৌরসভা প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে থাকলেও নিকাশি বা রাস্তা সংস্কারের মতো বড় কাজে কোনো গতি নেই বললেই চলে। স্থানীয়দের মতে, দ্রুত নির্বাচন করিয়ে পুরবোর্ড গঠন না করলে ডোমকলের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বর্ষার কালো মেঘ যত ঘনিয়ে আসছে, ডোমকলবাসীর কপালে চিন্তার ভাঁজ ততটাই স্পষ্ট হচ্ছে। এখন দেখার, প্রশাসন এই জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, নাকি নোংরা জলেই আরও একটি বছর কাটাতে হবে ডোমকলবাসীকে।








