সমাজব্যবস্থার দুর্বলতা ও আমাদের করণীয়
এম নাজমুস সাহাদাত: সমাজ মানুষের বসবাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। মানুষ একা বাঁচতে পারে না বলেই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একটি সুস্থ সমাজ মানুষকে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, মূল্যবোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজব্যবস্থা নানা দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও মানুষের মনোজগতে অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফলে সামাজিক বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। বর্তমান সমাজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল, মানবিক মূল্যবোধের অভাব। আগে মানুষ প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াত, আত্মীয়তার সম্পর্ককে গুরুত্ব দিত এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব অনুভব করত।
এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। মানুষ নিজের স্বার্থ নিয়েই বেশি ব্যস্ত। অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা কমে যাচ্ছে। সামাজিক সম্পর্কগুলোও অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম হয়ে উঠছে। মুখে ভদ্রতা থাকলেও আন্তরিকতা কমে গেছে। ফলে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সমাজের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল পরিবার। কিন্তু বর্তমানে পারিবারিক বন্ধনও আগের মতো মজবুত নেই। অনেক পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ব্যস্ত জীবন, মোবাইল ফোন ও সমাজমাধ্যম পরিবারের সদস্যদের পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। একসঙ্গে বসে কথা বলা, গল্পগুজব করা, খোঁজ নেওয়া বা পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিষ্ঠাচার শেখানোর চর্চা কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে নতুন প্রজন্মের উপর। তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও অনেক সময় নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাও সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আজ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রেই কেবল চাকরি ও অর্থ উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। একজন মানুষকে সৎ, নীতিবান ও মানবিক হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব হারাচ্ছে। ফলে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও প্রকৃত মানুষ তৈরি হচ্ছে কম। সমাজে প্রতারণা, দুর্নীতি ও অন্যায়ের পেছনে এই নৈতিক শিক্ষার অভাব একটি বড় কারণ।
বর্তমান সমাজে আর্থিক বৈষম্যও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধনী ও গরিবের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। একদিকে কিছু মানুষ বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, অন্যদিকে অনেক মানুষ মৌলিক চাহিদাটুকু পূরণ করতে সংগ্রাম করছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অসাম্য সমাজে হতাশা তৈরি করছে। অনেক তরুণ সঠিক সুযোগের অভাবে হতাশ হয়ে পড়ছে, কেউ কেউ অপরাধেও জড়িয়ে যাচ্ছে। সমাজ যখন সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক বিভাজনও সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। মত-পথের ভিন্নতা গণতন্ত্রের অংশ হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক মতান্তর শত্রুতার রূপ নিচ্ছে। সাধারণ মানুষও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করছে। ফলে সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাজনীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ সুনিশ্চিত করা, কিন্তু যখন ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বার্থ প্রধান হয়ে ওঠে, তখন সমাজে অস্থিরতা বেড়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়া সমাজে বড় প্রভাব ফেলছে। এটি যেমন তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি ভুয়া খবর, অপপ্রচার ও নেতিবাচকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার করছে, ফলে সমাজে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। মানুষ বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে একাকীত্ব ও মানসিক চাপও বাড়ছে।
তবে এই দুর্বল সমাজব্যবস্থা থেকে উত্তরণের পথ রয়েছে। পরিবার থেকেই নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা শুরু করতে হবে। শিশুদের মধ্যে সততা, নৈতিকতা, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ শেখাতে হবে। নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়াতে হবে। কেবল পরীক্ষার ফলাফল নয়, একজন ভাল মানুষ তৈরি করাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এছাড়া সমাজে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক বা সামাজিক মতভেদ থাকলেও একে অপরকে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। সমাজ কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এটি মানুষের মূল্যবোধ, সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। যদি মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা হারিয়ে যায়, তবে সমাজ কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। তাই একটি সুন্দর ও স্থিতিশীল সমাজ গড়তে হলে আমাদের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ, সমাজের পরিবর্তন শুরু হয় ব্যক্তি থেকেই।








