শরৎকুমারী চৌধুরানী: সাহিত্যচর্চায় কৃতী বঙ্গনারী
লেখক: রাজু পারাল – কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শরৎকুমারীকে ডাকতেন ‘লাহোরিনী’ বলে। কেন ঐ নামে ডাকতেন? কারণ, ব্যারাকপুরের চানকের মাতুলালয়ে জন্ম হলেও শরৎকুমারী দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন লাহোরে। তাই রবীন্দ্রনাথের ঐরকম নামকরণ। আসলে তাঁর পিতা শশীভূষণ বসুর কর্মস্থল ছিল লাহোর। সেখানেই তিন বছর বয়সে স্থানীয় বঙ্গবিদ্যালয়ে ভর্তি হন শরৎকুমারী। ছয় বছর বয়সে লাহোর ইউরোপিয়ান বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করেন। ছাত্রী হিসেবে ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের ১২ ই মার্চ দশ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন হাওড়ার আন্দুলের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারের অ্যাটর্নি অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই ছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। অক্ষয়চন্দ্র নিজেও যুক্ত ছিলেন লেখালিখির সঙ্গে। লেখক হিসেবে খুব বেশি পরিচিতি না পেলেও ‘উদাসিনী’, ‘ভারত গাথা’ এবং ‘সাগর সংগমে’ নামক বেশ কয়েকটি বই লিখেছিলেন তিনি। তবে রবীন্দ্রনাথকে তিনি লেখার ব্যাপারে খুব উৎসাহিত করতেন। স্বামী অক্ষয়চন্দ্রের কাছ থেকে শরৎকুমারীও প্রেরণা পেতেন যথেষ্ট।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎকুমারী উভয়েই ছিলেন সমবয়সী। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে নিয়মিত বসত সাহিত্য ও আলোচনাসভা। তাতে যেমন অংশ নিতেন শরৎকুমারী, তেমন অংশ নিতেন সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও। তৎকালীন সময়ে এই বাড়ি থেকেই প্রকাশিত হত বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা। সম্পাদনার দায়িত্বে থাকতেন ঠাকুরবাড়ির সদস্য-সদস্যারাই। সে সময়ে ঠাকুরবাড়ি থেকে উল্লেখযোগ্য পত্রিকা ‘ভারতী’ প্রকাশিত হত। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম সংখ্যা থেকেই এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নিয়মিত প্রকাশ পেত তাঁর লেখা। পরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তিনি সামলেছেন। পাশাপাশি ‘ভারতী’ সম্পাদকীয় গোষ্ঠীর উৎসাহী সভ্যদের মধ্যে ছিলেন শরৎকুমারী। পত্রিকার দায়িত্ব সামলানোর সাথে সাথে নিজেও লিখে গেছেন বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে। তাঁর লেখায় ফুটে উঠত নারী জীবনের মনস্তাত্ত্বিক দিক এবং বাস্তব চিত্র। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির আসর মাতিয়ে রাখতে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল।
মাতৃভাষার পরম অনুরাগী শরৎকুমারী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় লিখেছেন। যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল — ভারতী, সাধনা, ভান্ডার, বঙ্গদর্শন, ধ্রুব, সবুজপত্র, মানসী ও মর্মবাণী, বিশ্বভারতী ইত্যাদি। চমৎকার হাতের লেখার কারণে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিশেষ পছন্দ করতেন। রবীন্দ্রনাথ গল্পের প্লট বলে দিয়ে সহায়তা করতেন শরৎকুমারীকে। সেই প্লট ধরে গল্প লিখতেন লেখিকা শরৎকুমারী। লেখার শেষে গুটি গুটি পায়ে দাঁড়াতেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। লেখা ভালো হলে প্রশংসায় ভরিয়ে দিতেন রবীন্দ্রনাথ। উৎসাহিত হয়ে আরও বেশি করে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করতেন শরৎকুমারী চৌধুরানী। শরৎকুমারীর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘শুভবিবাহ’ সেকালে উচ্চপ্রশংসিত হয়েছিল। তবে একমাত্র ‘শুভবিবাহ’ (১৯০৬) ছাড়া কোন রচনাই পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়নি শরৎকুমারীর। এই রচনাটি সম্পর্কে ‘বঙ্গদর্শনে’ রবীন্দ্রনাথ একটি বিস্তৃত সমালোচনা করে লিখেছিলেন “…রোমান্টিক উপন্যাস বাংলা-সাহিত্যে আছে, কিন্তু বাস্তব চিত্রের অত্যন্ত অভাব, এজন্য এই গ্রন্থকে আমরা সাহিত্যের একটি বিশেষ লাভ বলিয়া গণ্য করিলাম।’
পরবর্তী সময়ে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাসের যৌথ সম্পাদনায় ‘শরৎকুমারী চৌধুরাণী রচনাবলী’ প্রকাশিত হয়। এই সম্পাদিত গ্রন্থ থেকে তাঁর রচনা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। ১৯২০ সালের ১১ এপ্রিল জীবনদীপ নিভে যায় এই বঙ্গনারীর। অস্বীকার করার উপায় নেই, সমকালে নিজেকে উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন সাহিত্য প্রতিভায় ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপে।
শরৎকুমারী চৌধুরাণীর জন্ম ১৫ জুলাই ১৮৬১ এবং প্রয়াণ ১২ এপ্রিল ১৯২০। তিনি ছিলেন ঠাকুরবাড়ির বিশেষ ঘনিষ্ঠ ও ভারতীয় সম্পাদকীয় গোষ্ঠীর অন্তর্গত বাঙালি লেখিকা। ৫৮ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন।








