বাংলা দখল নয়; বাংলা গড়ার রাজনীতি চাই
-সাহাজাহান জমাদার : বাংলা শুধু একটি রাজ্য নয়, বাংলা এক ঐতিহাসিক ভূখণ্ড, এক সাংস্কৃতিক সভ্যতা, এক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বহুত্ববাদী সহাবস্থানের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য। এই বাংলাকে নিয়ন্ত্রণ করার আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। কখনও বিদেশি বণিকশক্তি বাংলাকে দখল করেছে সম্পদের জন্য, কখনও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলাকে ব্যবহার করেছে বৃহত্তর শাসনের সোপান হিসেবে, আর আজকের দিনে রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাকে দখল করতে চায় ভোটের সমীকরণ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্র দখলের উদ্দেশ্যে। ফলে “বাংলা দখল” কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজ এবং ক্ষমতার সম্পর্কের এক গভীর বাস্তবতা।
অষ্টাদশ শতকে বাংলা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উর্বরতা, নদীপথে বাণিজ্য, মসলিন ও সিল্ক শিল্প, কৃষি উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ, শিক্ষার ঐতিহ্য এবং নগর জীবনের বিকাশ বাংলাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। মুর্শিদাবাদ ছিল ঐশ্বর্যের প্রতীক, কলকাতা দ্রুত বাণিজ্যিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল, নবদ্বীপ ছিল জ্ঞানচর্চার স্থান, পূর্ব-বাংলা ছিল কৃষির প্রাণভূমি। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুব দ্রুত বুঝেছিল বাংলাকে দখল করা মানে শুধু একটি প্রদেশ জয় করা নয়; বরং গোটা ভারতকে নিয়ন্ত্রণের আর্থিক চাবিকাঠি হাতে পাওয়া। পলাশীর যুদ্ধ তাই কেবল একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি ছিল অভ্যন্তরীণ বিভাজন, বিশ্বাসঘাতকতা, বিদেশি কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক লোভের সম্মিলিত ফল। সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর বাংলার সম্পদ ধীরে ধীরে বিদেশে প্রবাহিত হয়, কৃষক নিঃস্ব হয়, কারিগর ধ্বংস হয়, দুর্ভিক্ষ বাংলাকে গ্রাস করে। ইতিহাস আমাদের শেখায়, যখন বাংলাকে “দখল” করা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয় বাংলার সাধারণ মানুষ।
স্বাধীনতার পরে আশা ছিল, বাংলা হবে বাংলার মানুষের। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি অন্য রূপে ফিরে আসে। একসময় কংগ্রেসের আধিপত্য, পরে দীর্ঘ বাম শাসন, তারপর তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান, এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপির প্রবল আগ্রাসন — সবই বাংলাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের নতুন অধ্যায়। এখন বাংলার গুরুত্ব শুধু রাজ্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; লোকসভায় উল্লেখযোগ্য আসন সংখ্যা, পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার, আন্তর্জাতিক সীমান্ত, সমুদ্রবন্দর, শিল্প সম্ভাবনা, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং জনসংখ্যাগত গুরুত্বের কারণে বাংলা জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। দিল্লির ক্ষমতার পথে বাংলার সমর্থন এখন এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই নতুন যুগের দখল-রাজনীতির প্রধান অস্ত্র হল পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন। মানুষের বাস্তব সমস্যা — চাকরি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মূল্যবৃদ্ধি, শিল্পহীনতা, দুর্নীতি — এসব প্রশ্নকে আড়াল করতে সামনে আনা হয় ধর্ম, জাতি, ভাষা, নাগরিকত্ব, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, উৎসবের প্রশ্ন। মানুষ যেন নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন না তোলে, বরং গোষ্ঠী হিসেবে আবেগপ্রবণ হয় — এই রাজনীতির সাফল্য সেখানেই। বাংলায় বিজেপির উত্থানকে বুঝতে হলে এই কৌশলটি দেখতে হয়। দীর্ঘদিন সংগঠন বিস্তার, বিরোধী ভোটের পুনর্গঠন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিনিয়োগ, বাম ও কংগ্রেসের দুর্বলতা — এসবের পাশাপাশি ধর্মীয় মেরুকরণ ছিল কার্যকর হাতিয়ার। “অনুপ্রবেশকারী”, “ঘুসপেটিয়া”, “CAA”, “NRC”, “তুষ্টিকরণ”, “জনসংখ্যা বৃদ্ধি”, “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ” — এই শব্দগুলি নির্বাচনী প্রচারে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলি শুধু স্লোগান নয়; এগুলি সামাজিক ধারণা গঠনের ভাষা।
যখন কোনো সম্প্রদায়কে বারবার সন্দেহের কেন্দ্রে রাখা হয়, তখন সংখ্যাগুরু সমাজের একাংশের মধ্যে অবিশ্বাস জন্মায়। মুসলিম নাগরিক, যিনি বহু প্রজন্ম ধরে বাংলায় বসবাস করছেন, হঠাৎ নিজেকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দেখতে পান। তিনি শিক্ষক, কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক, ডাক্তার, ব্যবসায়ী বা শিল্পী হতে পারেন; কিন্তু রাজনৈতিক ভাষায় তাকে প্রথমে মুসলিম, তারপর নাগরিক হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিক কাঠামো গণতান্ত্রিক সমতার জন্য বিপজ্জনক।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসও এই রাজনীতির বাইরে সম্পূর্ণ থাকতে পারেনি। বিজেপির মেরুকরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার বদলে বহুক্ষেত্রে তারাও পাল্টা পরিচয় রাজনীতি ব্যবহার করেছে। সংখ্যালঘু নিরাপত্তার ভাষা, প্রতীকী সহমর্মিতা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক উপস্থিতি, বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক দেখিয়ে নিজেদের একমাত্র রক্ষাকবচ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা — এসব রাজনৈতিক বাস্তবতা। ফলে একপক্ষ ভয় সৃষ্টি করে, অন্যপক্ষ সেই ভয়ের অভিভাবক সেজে ওঠে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই নাগরিকের স্বাধীন অবস্থান দুর্বল হয়।
বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একসময় মতাদর্শের বিতর্ক, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, সংগঠনভিত্তিক গণআন্দোলনের ঐতিহ্য ছিল। এখন বহুক্ষেত্রে সেই জায়গায় এসেছে ব্যক্তিগত আক্রমণ, উসকানিমূলক ভাষণ, সমাজমাধ্যমে ঘৃণা, বিদ্বেষ, হুমকি, কুৎসা এবং ক্রমাগত উত্তেজনা। নেতারা মঞ্চে ভাষণ দেন, টেলিভিশনে বিতর্ক করেন, সমাজমাধ্যমে প্রচার চালান; কিন্তু তার সামাজিক অভিঘাত নেমে আসে গ্রাম, মহল্লা, বাজার, কলেজ, পাড়ায়। প্রতিবেশী সহ-নাগরিকের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়, বন্ধুদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে, সাধারণ ঘটনাও সাম্প্রদায়িক রং পায়।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় বলি বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়। মুসলিম সমাজকে একদিকে “সন্দেহভাজন”, “অনুপ্রবেশকারী”, “জনসংখ্যাগত হুমকি” হিসেবে তুলে ধরা হয়; অন্যদিকে “নিশ্চিত ভোটব্যাঙ্ক” হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। একপক্ষ তাদের ভয় দেখায়, অন্যপক্ষ তাদের ভোটের সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে ধারাবাহিক নীতি প্রাধান্য পায় না। বাংলার মুসলিম সমাজ একক নয়। শহুরে মধ্যবিত্ত, গ্রামীণ দরিদ্র, ক্ষুদ্র কৃষক, দিনমজুর, কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রী, নারী, তরুণ, পেশাজীবী — বহুমাত্রিক এক সমাজ। কিন্তু রাজনৈতিক বয়ানে তাদের একরৈখিকভাবে দেখা হয়। এই সরলীকরণই বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বহু মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে মানসম্মত বিদ্যালয়, বিজ্ঞান শিক্ষা, ইংরেজি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, গ্রন্থাগার, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত। পরিবারে আর্থিক চাপ থাকায় বহু ছাত্রছাত্রী অল্প বয়সে পড়াশোনা ছাড়ে। বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপদ যাতায়াত, আর্থিক সমস্যা, সামাজিক সংকোচ, হস্টেলের অভাব, উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান দূরে থাকা — এসব কারণে উচ্চশিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্য আরও প্রকট। সরকারি চাকরিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘদিন প্রশ্নের বিষয়। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোচিং, ডিজিটাল রিসোর্স, তথ্য, ভাষাগত দক্ষতা, আর্থিক সহায়তা — এসবের অভাব বড় বাধা। বেসরকারি ক্ষেত্রে অনেকে অনিশ্চিত শ্রমে যুক্ত — নির্মাণশ্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন, হস্তশিল্প, চুক্তিভিত্তিক কাজ, অস্থায়ী পরিষেবা। নিয়মিত বেতন, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা, শ্রমিক সুরক্ষা থেকে বহু পরিবার বঞ্চিত। গ্রামীণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ কৃষিনির্ভর। ক্ষুদ্র জমি, ভাগচাষ, সেচের সীমাবদ্ধতা, বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, ঋণের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য — এসব কারণে উন্নয়নের পথ কঠিন হয়। বহু যুবক কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে চলে যায়। এতে পরিবার ভেঙে যায়, নারী ও বৃদ্ধদের উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়ে, সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়। মুসলিম নারীদের বঞ্চনা দ্বিগুণ। তারা অর্থনৈতিক পিছিয়েপড়া সমাজের অংশ, আবার লিঙ্গ বৈষম্যেরও শিকার। বহু নারী সেলাই, গৃহভিত্তিক উৎপাদন, ক্ষুদ্র বাণিজ্য, অনিয়মিত শ্রমে যুক্ত থাকলেও তাদের কাজের সামাজিক স্বীকৃতি কম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, ব্যাংক ঋণ, ডিজিটাল দক্ষতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ — এসব ক্ষেত্রে পরিকল্পিত সহায়তা অপরিহার্য। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও মুসলিম অধ্যুষিত বহু অঞ্চলে পরিকাঠামো দুর্বল। হাসপাতাল দূরে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা কম, মাতৃসেবা সীমিত, শিশুস্বাস্থ্য দুর্বল, পুষ্টির সমস্যা প্রকট। অসুস্থতা মানে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, বহু দরিদ্র পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
মিডিয়ার ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। অনেক সময় মুসলিম সমাজকে নিয়ে সংবাদ হয় সংঘর্ষ, অপরাধ, উত্তেজনা বা ভোটের প্রসঙ্গে। কিন্তু সফল শিক্ষক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, শিল্পী, নারী নেতৃত্ব, সামাজিক উদ্যোগ, শিক্ষায় অগ্রগতি — এসব ইতিবাচক গল্প কম সামনে আসে। ফলে জনমানসে একপাক্ষিক ছবি তৈরি হয়, যা পক্ষপাত বাড়ায়।
CAA, NRC, SIR, ভোটার তালিকা যাচাই, জনগণনা — এসব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বাংলায় রাজনৈতিক আবেগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বহু দরিদ্র মানুষের জন্মসনদ নেই, পুরনো নথি নেই, বানান ভুল আছে, ঠিকানা পরিবর্তিত হয়েছে, জমির দলিল নেই। ফলে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্ন তাদের কাছে আইনি নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন। তারা জানতে চায় — “আমাদের কি আবার প্রমাণ দিতে হবে যে, আমরা এই দেশের মানুষ?” এই ভয় গণতান্ত্রিক আস্থাকে দুর্বল করে।
গণতন্ত্রে বিচারব্যবস্থা শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু যদি মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠে — বিচার কি সবার জন্য সমান? বিরোধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত, ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রে ধীরতা, প্রশাসনের পক্ষপাত, তদন্তে বাছাই — এই ধারণাগুলি বাস্তব হোক বা অতিরঞ্জিত, জনবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিচারব্যবস্থার শক্তি শুধু রায়ে নয়, বিশ্বাসে। মানুষ যদি আদালতকে নিরপেক্ষ মনে না করে, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি কেঁপে ওঠে।
বাংলায় ভোট গণতন্ত্রের উৎসব হওয়ার কথা। কিন্তু বহু সময় ভোট মানে উত্তেজনা, বাহিনী মোতায়েন, সংঘর্ষের আশঙ্কা, বুথ দখলের অভিযোগ, ভয় দেখানো, পাল্টা অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারযুদ্ধ। ২৩ হোক বা ২৯ এপ্রিলের ভোট — তারিখ বদলায়, কিন্তু ভোটকে ঘিরে উৎকণ্ঠা অনেক সময় একই থাকে। সাধারণ ভোটার চান শান্তিতে ভোট দিতে, তারপর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তিগুলি ভোটকে অস্তিত্বের যুদ্ধে পরিণত করে।
তবু বাস্তবতা হল, বাংলার মানুষ মূলত খুব সাধারণ কিছু জিনিস চান। যুবক চান চাকরি। কৃষক চান ফসলের ন্যায্য দাম। শ্রমিক চান নিয়মিত আয়। মা চান সন্তানের জন্য ভাল স্কুল। রোগী চান চিকিৎসা। ব্যবসায়ী চান স্থিতিশীল বাজার। নারী চান নিরাপত্তা। বৃদ্ধ চান সম্মান। হিন্দু-মুসলিম-আদিবাসী-দলিত — সবাই চান মর্যাদার জীবন। কেউ প্রতিবেশীর সঙ্গে ধর্ম নিয়ে লড়াই করতে চায় না। কেউ নাগরিকত্ব প্রমাণের আতঙ্কে বাঁচতে চান না। কেউ নেতার উসকানিতে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চান না। বাংলার ঐতিহ্যও বিভাজনের নয়। এই মাটি চৈতন্যের প্রেমের বাণী জানে, লালনের মানবধর্ম জানে, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা জানে, নজরুলের সাম্য জানে, বিদ্যাসাগরের সংস্কার জানে, নেতাজির আত্মত্যাগ জানে। বাংলার আত্মা বহুত্ববাদী। এখানে মিলনের ধারাই প্রকৃত শক্তি।
সমাধান কী? প্রথমত: পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। দ্বিতীয়ত: শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে নির্বাচনের মূল ইস্যু করতে হবে। তৃতীয়ত: মুসলিম ও অন্যান্য প্রান্তিক সম্প্রদায়ের উন্নয়নকে প্রতীকী নয়, তথ্যভিত্তিক বাস্তব নীতিতে আনতে হবে। চতুর্থত: বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও পুলিশকে দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পঞ্চমত: রাজনৈতিক উসকানির বিরুদ্ধে কঠোর ও সমান ব্যবস্থা নিতে হবে। ষষ্ঠত: নাগরিকত্ব ও নথি সংক্রান্ত নীতিতে মানবিকতা, স্বচ্ছতা ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তমত: মিডিয়াকে উত্তেজনার ব্যবসা ছেড়ে জনজীবনের প্রশ্নে ফিরতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রশ্নকে আলাদা করে নয়, গণতান্ত্রিক সমতার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে। যখন বাংলার মুসলিম সমাজ পিছিয়ে থাকে, তখন বাংলাও পিছিয়ে থাকে। যখন কোনো নাগরিক সন্দেহের চোখে বাঁচে, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়। যখন কোনো সম্প্রদায়কে কেবল ভোটের সময় মনে পড়ে, তখন রাষ্ট্রনৈতিক সততা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাংলার মুসলিম সমাজ দয়া চায় না, তোষণ চায় না, বিশেষ অনুগ্রহও চায় না। তারা চায় সমান অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কাজের সুযোগ এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচার পরিবেশ। এই দাবি কোনো সম্প্রদায়ের নয়, এটি সংবিধানের দাবি। বাংলার ভবিষ্যৎ তখনই উজ্জ্বল হবে, যখন বাংলার মুসলিম নাগরিক নিজেকে প্রান্তিক নয়, পূর্ণ অংশীদার বলে অনুভব করবেন।
বাংলা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। বাংলা দিল্লির পরীক্ষাগার নয়, কলকাতার দুর্গও নয়। বাংলা তাদের, যারা এখানে ঘাম ঝরায়, কর দেয়, সন্তান মানুষ করে, স্বপ্ন দেখে। বাংলার হিন্দু নাগরিক যেমন পূর্ণ অংশীদার, তেমনি মুসলিম নাগরিকও; আদিবাসী যেমন বাংলার আত্মা, তেমনি দলিতও; নারী, যুবক, কৃষক, শ্রমিক — সবাই বাংলার মালিক। যতদিন “বাংলা দখল”-এর রাজনীতি চলবে, ততদিন বাংলার মানুষ হারবে। যেদিন মানুষ ধর্মের আগে অধিকার, পরিচয়ের আগে উন্নয়ন, ভয়ের আগে মর্যাদা, বিভাজনের আগে মানবিকতা বেছে নেবে — সেদিনই বাংলা সত্যিকার অর্থে মুক্ত হবে। ”বাংলা দখল নয় — বাংলা গড়ার রাজনীতি চাই।”
হাইলাইট
বাংলার ঐতিহ্য মেরুকরণ, বিভাজনের নয়। এই মাটি চৈতন্যের প্রেমের বাণী জানে, লালনের মানবধর্ম জানে, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা জানে, নজরুলের সাম্য জানে, বিদ্যাসাগরের সংস্কার জানে, নেতাজির আত্মত্যাগ জানে। বাংলার আত্মা বহুত্ববাদী। এখানে মিলনের ধারাই প্রকৃত শক্তি। বাংলা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। বাংলা দিল্লির পরীক্ষাগার নয়, কলকাতার দুর্গও নয়। বাংলা তাদের, যারা এখানে ঘাম ঝরায়, কর দেয়, সন্তান মানুষ করে, স্বপ্ন দেখে।








