হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধ নাক্স ভোমিকা এবার হতে পারে দুরন্ত জৈব কীটনাশক
এস রোজলিন, নতুন পয়গাম, কলকাতা: পেট ব্যথা থেকে স্পাইনাল কর্ডের সমস্যার জন্য তীব্র পেইন বা যন্ত্রণা নিরাময়ে জনপ্রিয় হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধ নাক্স ভোমিকার ব্যবহার বহুমুখী। কিন্তু কে জানত, শুধুমাত্র মানবদেহের বিভিন্ন অসুখ বিসুখেই নয়, নাক্স ব্যবহার হতে পারে জৈব কীটনাশক হিসেবেও! কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি বিজ্ঞানী-গবেষক দল ও রাজ্যের এক হোমিয়োপ্যাথিক কলেজের অধ্যাপক-পড়ুয়ারা মিলে ‘আবিষ্কার’ করলেন নাক্স ভোমিকার এই আশ্চর্য গুণ। যেখানে নাক্স তুলো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ঢ্যাঁড়শ প্রভৃতি গাছের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর কীট কটন লিফ রোলার মথকে (হেরিটালোডাস ডেরোগাটা) নিকেশ করে ফেলতে পারে।
হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধের এই নতুন ‘গুণ’ প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পত্রিকা ‘ট্রেন্ডস ইন অ্যাডভান্সড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’তে। ২০২৩-২৪ সাল জুড়ে করা এই গবেষণায় অংশ নেন বিশিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানী তথা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এমেরিটাস অধ্যাপক ডঃ অনিসুর রহমান খুদাবক্স, সেখানকার জুলজির সহকারী অধ্যাপক ডাঃ অস্মিতা সমাদ্দার, হোমিয়োপ্যাথির অধ্যাপক ডাঃ দেবর্ষি দাস, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়য়ের জীববিদ্যার গবেষক অর্ণব চক্রবর্তী ও বনানী ভট্টাচার্য এবং বিএইচএমএস পড়ুয়া অভিদীপ্ত হাজরা প্রমুখ। গবেষকরা জানিয়েছেন, সারা পৃথিবী এখন খুঁজে বেড়াচ্ছে উপযুক্ত নিরাপদ জৈব কীটনাশক। সেক্ষেত্রে এই গবেষণা উল্লেখযোগ্য দিশা দেখাতে পারবে। আর নাক্স ভোমিকার দাম যৎসামান্য। ফলে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করার উপযোগী করে তুললে খরচও পড়বে খুব অল্প। তাঁরা জানিয়েছেন, নাক্স গাছ থেকে তৈরি নাক্সে রয়েছে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড, স্ট্রিকনিন, ভমিসিন, ব্রুসিন প্রভৃতি পদার্থ। এগুলির মধ্যে কয়েকটি একবারে বিষ! সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডোজে মানবদেহে দেওয়া হয় বলে রোগ নিরাময় করে। উলটে মানুষকে বিপদে ফেলে না।
এই গবেষণায় বিশেষভাবে প্রস্তুত নাক্স ভোমিকা স্প্রে করা হয় তুলো, ঢ্যাঁড়শ প্রভৃতি গাছের পাতায় থাকা কটন রোলার মথের গায়ে। যাতে ভালো কাজ করে, সেজন্য ব্যবহার করা হয় অ্যালকোহলের দ্রবণ। দেখা যায় মথটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। কীভাবে নাক্স ভোমিকা পোকাটি মরছে, সেদিকেও লক্ষ্য করেন গবেষক-বিজ্ঞানীরা। গবেষক দলের সদস্য অর্ণব বলেন, আমরা দেখেছি ফসলের পক্ষে ক্ষতিকর এই কীটের লার্ভার ডিএনএ-কে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে নাক্স। পোকাটির অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে মৃত্যু হচ্ছে পোকার লার্ভার।
তুল্যমূল্য বিচার করতে সমপরিমাণ ইথানল ও জল নিয়েও গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায়, ওই কীটের কোনও পরিবর্তনই হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মেট্রোপলিটন হোমিয়োপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগের সংযোগে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। গবেষক দলের অন্যতম সদস্য কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলজির সহকারী অধ্যাপক ডঃ সমাদ্দার জানান, স্বল্প মূল্যের হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধকে যে বিকল্প জৈব কীটনাশক রূপেও ব্যবহার করা যেতে পারে, এই গবেষণা তারই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ। এআই মডেলে গবেষণা করেও আমরা এর সার্থকতা বুঝেছি।








