নিট-ইউজি বাতিল: মেধার নিলামে যখন নটে গাছটি মুড়োল
মাসুদ আলম: ভারতে এখন সবচেয়ে অনিশ্চিত পেশার নাম ‘পরীক্ষার্থী’। বিশেষ করে আপনি যদি ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তবে আপনার স্টেথোস্কোপের চেয়েও বেশি প্রয়োজন একটি লিক-প্রুফ ভাগ্য। গত ৩রা মে ২০২৬-এ ২২ লক্ষ ছাত্রছাত্রী যখন পরীক্ষা দিতে বসলেন, তখন তাঁরা জানতেন না যে, তাঁদের ভবিষ্যৎ আসলে রাজস্থান বা হরিয়ানার কোনো অন্ধকার ঘরে বসে থাকা কিছু ‘জাদুকর’ নিয়ন্ত্রণ করছেন। ১২ই মে পরীক্ষা বাতিল হল। আর এই বাতিলের খবরটা যখন এল, তখন বোঝা গেল আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে একটা আইসিইউ-তে শুয়ে থাকা কঙ্কাল, যাকে হাই-টেক প্রযুক্তির অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার ভান করা হচ্ছে। প্রথমে একটু এনটিএ-র প্রযুক্তির বহরটা দেখা যাক। ৫-জি জ্যামার, জিপিএস ট্র্যাকড গাড়ি, এআই ক্যামেরা — মনে হচ্ছিল যেন নাসার কোনো রকেট উৎক্ষেপণ হতে যাচ্ছে। কিন্তু চোরেরা প্রমাণ করে দিল ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় চুরিটাও এখন অনেক বেশি স্মার্ট। তদন্তে জানা যাচ্ছে, ৪১০টি প্রশ্নের একটা ‘গেস্ট পেপার’ রাজস্থান পুলিশের এসওজি (SOG) উদ্ধার করেছে। এই প্রশ্নপত্রের উৎস নাকি কেরালা। সেখান থেকে হোয়াটসঅ্যাপ মারফত তা পৌঁছেছে রাজস্থানের শিখর-এ। ভাবুন একবার, কেরালা থেকে রাজস্থান — ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত মেধার এই যে ‘ডিজিটাল পাচার’, একে কী নাম দেব? একে কি ‘ফাস্ট ট্যাগ’ দুর্নীতি বলা যায় না? ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে কেমিস্ট্রি আর বায়োলজির ১২০টি প্রশ্ন হুবহু মিলে যাওয়া মানে হল, ৭২০ নম্বরের মধ্যে ৬০০ নম্বর আগে থেকেই কিছু মানুষের পকেটে। যারা দিনরাত এক করে এনসিইআরটি (NCERT) চিবিয়ে খেল, তাদের চেয়ে যারা ৫ লক্ষ টাকা দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ চিবালো — জয়ের পাল্লা তাদের দিকেই ভারী থাকল।
অনেকে হয়ত বলবেন, “কেন, ২০২৪-এও তো এমন ঝামেলা হয়েছিল!” হ্যাঁ, হয়েছিল। তখন ৬৭ জন টপার হওয়ার সেই অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটেছিল, ভোটের রেজাল্টের দিন ফল প্রকাশ করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এর মাহাত্ম্য হল — আমরা সেই ভুল থেকে কিছুই শিখিনি। ২০২৪ যদি ‘ট্রেলার’ হয়, ২০২৬ হল তার ‘ফুল লেংথ ব্লকবাস্টার মুভি’। এবারের তদন্তে সিবিআই যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁদের দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। ডা. শুভম খৈরনার বা ডা. যশ যাদব — এরা কেউ রাস্তার মোড়ের পকেটমার নন। এরা সমাজের তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ এবং ‘সম্মানিত’ ডাক্তার। যখন ডাক্তাররাই চুরির ডিলারশিপ নেন, তখন বুঝতে হবে ঘুণটা রক্তের ভেতরে ঢুকে গেছে। এদের জন্য নতুন ‘পাবলিক এক্সামিনেশন অ্যাক্ট-২০২৪’ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু আইন কি আর মানুষের লোভকে লকডাউন করতে পারে? খান স্যর থেকে অলখ পাণ্ডে — শিক্ষক মহলে এখন এনটিএ মানেই একটা কৌতুক। কেউ বলছেন, এর নাম বদলে ‘নেভার ট্রাস্টেবল এজেন্সি’ রাখা হোক, কেউ বলছেন ‘বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর’ চেয়ে ‘বিনা মেধার ডাক্তার’ অনেক বেশি বিপজ্জনক।
এনটিএ-র দাবি ছিল ‘ফুল সিকিউরিটি’। কিন্তু ৩রা মের পরীক্ষার ৪ দিন পর তারা যখন ‘মালপ্র্যাকটিস’-এর কথা কবুল করল, ততক্ষণে সেই ২২ লক্ষ ছেলে-মেয়ের বিশ্বাসের ওপর বুলডোজার চলে গেছে। সুপ্রিম কোর্টে এখন পিটিশন জমা পড়েছে, দাবি করা হচ্ছে, এনটিএ-কে পুরোপুরি ভেঙে ফেলে একটা হাই-পাওয়ারড কমিটির তত্ত্বাবধানে নতুন ব্যবস্থা চালু করার। দাবি উঠছে, পেন-পেপার পরীক্ষার বদলে কম্পিউটার বেসড টেস্ট (CBT) করার। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে হাত দিয়ে মাউস ক্লিক হবে, সেই হাত যদি ৫ লক্ষ টাকায় আগে থেকেই কেনা থাকে, তবে লোহা আর কাচের মেশিন কী করবে? এই যে ‘রি-নিট’ বা পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা হয়েছে, একে কি জাস্টিস বলব? এনটিএ বলছে, “আমরা আবার পরীক্ষা নিচ্ছি, তোমাদের তো আর পয়সা লাগছে না!” বাহ্, কী উদারতা, কী মহানুভবতা! কিন্তু ওই যে ছাত্রটি গত দু-বছর ধরে বাড়ির কোনো অনুষ্ঠানে যায়নি, যে মেয়েটি ডিপ্রেশন আর অ্যাঙ্জাইটি নিয়ে প্রতি রাতে পড়াশোনা করেছে — তাদের সময়ের দাম কি এনটিএ-র কোনো নোটিশে লেখা আছে?
মা-বাবারা ঘটি-বাটি বেচে, লোন নিয়ে কোচিংয়ে টাকা ঢালছেন। আর সেই কোচিং সেন্টারগুলো এখন মেধার কারখানা না হয়ে একটা ‘জ্যামিতিক গোলকধাঁধা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ডাক্তার হওয়াটা একটা বেঁচে থাকার লড়াই, আর সিস্টেমের কাছে সেটা একটা বার্ষিক ‘টেন্ডার’। এই অসম লড়াইয়ে হারছে শুধু সেই ছেলেটি, যার কাছে সততা ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই।
আমাদের দেশে এখন যেকোনো বড় বিপর্যয় মানেই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটা সুবর্ণ সুযোগ। রাহুল গান্ধী বলছেন, এটা বিজেপির ‘ক্রাইম’, আর সরকার পক্ষ বলছে, ‘আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি’। এই কাদা ছোড়াছুড়ির মাঝে আসল সত্যটা হল, কোনো দলই এই ‘কোচিং-মাফিয়া-পরীক্ষা’ নেক্সাসটাকে ভাঙতে আগ্রহী নয়। কারণ, এই নেক্সাসটা একটা বিশাল বড় ইকোনমি। শিক্ষাবিদ আনন্দ কুমার ঠিকই বলেছেন, সুপার ৩০-র মতো প্রোজেক্ট দিয়ে ক’টা মেধাকে বাঁচানো সম্ভব, যদি বাকি বাজারটাই পচা হয়? এই প্রশ্নে এনটিএ নীরব। এই নীরবতাটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।
নিট-ইউজি ২০২৬ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়। এটা একটা জাতির নৈতিক দেউলিয়া হওয়ার দলিল। আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা শিখছে যে শর্টকাটই হল আসল রাস্তা। ৫ লক্ষ টাকায় যদি মেডিকেল সিট পাওয়া যায়, তবে সেই ডাক্তার যখন আপনার অপারেশন করতে আসবে, তখন তিনি মেধা দিয়ে না, আপনার পকেট দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন। রি-টেস্ট হবে। আবার লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী লাইনে দাঁড়াবে। কিন্তু ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার যে বাইপাস সার্জারি প্রয়োজন, সেটা করার মতো সার্জন কি আমাদের কাছে আছে? নাকি সেই সার্জনও কোনোদিন ‘গেস্ট পেপার’ পড়ে পাস করে এসেছেন? নটে গাছটি মুড়োল, কিন্তু আমাদের এই দুর্নীতির গপ্পোটি বোধহয় আর কোনোদিন ফুরোবে না। জয় হোক সেই মেধাবীর, যে এত কিছুর পরেও এখনো বই খুলে বসে আছে কেবল এই আশায় যে, পরের বার অন্তত চোরেরা একটু বেশি ঘুমোবে!








