বিদ্রোহী কবির ১২৭তম জন্মজয়ন্তী: নজরুল সাহিত্যে মৌলিকতা ও ধর্মীয় সাম্যতা
মোঃ হাসানুজ্জামান: ১৮৯৯ সালের ২৪ মে। বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রাম। পিতা ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা বিবির দরিদ্র-ক্লিষ্ট সংসারে আগমন ঘটল এক পুত্র সন্তানের। পরিবারের ষষ্ঠ সন্তান। পিতা মসজিদের ইমাম। কোনরকমে চলে যায় সংসার। নিত্যসঙ্গী দুঃখ ও দারিদ্রতা। তাই নতুন অতিথিকে ডাকা হল ‘দুখু মিয়া’ নামে। সেই সঙ্গে পারিবারিক পরম্পরা বজায় রেখে তাঁর নাম রাখা হল কাজী নজরুল ইসলাম। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতাকে হারান দুখু মিয়া। জীবনে যেটুকু আশার আলো ছিল, নিভে গেল। ডুব দিলেন দুঃখের সাগরে। এইটুকু বয়সে সংসারের সুখ সন্ধানে নামতে হল তাঁকে। একটি মক্তবে শিক্ষাকতার চাকরি নিলেন। পিতার ইমাম সাহেব হওয়ার কারণে এবং পূর্বেই কিছুদিন মক্তবে পড়াশোনা সূত্রে তাঁর আরবি শেখা এবং সেটাই এই মুহূর্তে কাজে এল। তারপর, একের পর এক বিভিন্ন কাজে যোগদান, আবার প্রয়োজনের তাগিদে তা পরিবর্তন। মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব সামলালেন। লেটোর দলে যোগ দিয়ে গান রচনা করতে লাগলেন। মাঝে রানীগঞ্জের সিয়ালশোল রাজ স্কুলে এবং মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হলেন। পড়াশোনা করলেন ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। আবার কাজে ফেরা। এবারে যোগদান করলেন বাসুদেবের কবি দলে। কিন্তু সেখানে তাঁর ন্যূনতম চাহিদা মিটল না। পরিশেষে যোগদান করলেন রুটির দোকানে; রুটি বানানোর কাজে। এভাবেই চলতে থাকে দুখু মিঞার দুঃখকে উত্তরণের প্রচেষ্টা।
এবার তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে ওঠার পালা। হয়ে ওঠার পালা কবি নজরুল, গীতিকার নজরুল। উপরওয়ালা তাঁকে দরিদ্র পরিবারে, গরিব পিতা-মাতার ঘরে পাঠালেও তাঁর মধ্যে রোপিত করে দিয়েছিলেন অসাধারণ মেধা। সেইসঙ্গে তীক্ষ্ণ জীবনী-শক্তি ও সকল প্রকার দুঃখকে জয় করার ক্ষমতা। তাইতো তিনি বলতে পেরেছিলেন, “হে দারিদ্র, তুমি মোরে করেছ মহান / তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।” অবসরে দোকানে বসে ছড়া, কবিতা রচনা করতে থাকলেন। নিয়মিত। বিষয়টি একদিন আসানসোলের দারোগাবাবু রাফিজউল্লাহ সাহেবের নজরে এল। সমাজহিতৈষী, রুচিশীল, সহৃদয় দারোগাবাবু তাঁর এমন প্রতিভায় অভিভূত হন। নিজ দায়িত্বে ছাড়িয়ে নেন রুটির দোকান থেকে। সন্তানসম স্নেহ ও ভালবাসায় তাঁকে বড় করার মনোবাসনা পোষণ করেন। ভর্তি করিয়ে দেন ময়মনসিংহের ত্রিশালের দারিরামপুর স্কুলে। সপ্তম শ্রেণীতে, ১৯১৪ সালে। এরপর ১৯১৫ সালে তিনি আবার ফিরে আসেন রানীগঞ্জের সিয়ারশোল রাজ স্কুলে। এখানেই চলতে থাকে পড়াশোনা। কিন্তু ১৯১৭ সালে মাধ্যমিকের প্রি-টেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে যোগদান করেন সেনাবাহিনীতে। হয়ে উঠলেন সৈনিক নজরুল। অবশ্য এই পরিচয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখলেন না তিনি। ধীরে ধীরে নিজেকে পরিচিত করলেন কবি নজরুল, সংগীতকার নজরুল হিসাবে।
পাকাপাকিভাবে তিনি সাহিত্যের আঙিনায় প্রবেশ করেন ২০-২১ বছর বয়সে, ১৯১৯-২০ সালে। থাকলেন ১৯৪০-৪১ সাল পর্যন্ত। তারপর সাহিত্যের মহাপ্রান্তর থেকে বিদায়। বেঁচে থাকলেন আরো অনেক বছর। অনুভূতিহীন জড়ের ন্যায়। ভাগ্যের কী নিদারুণ পরিহাস! অবশেষে তাঁর জীবনদীপ নিভে গেল ১৯৭৬ সালে। যাহোক, এই স্বল্প সময়ে তিনি যা দিয়ে গেলেন, তা আমাদের নিকট অমূল্য সম্পদ। কাব্য-কবিতা এবং সংগীত রচনা ছাড়াও সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও তিনি কম-বেশি কলম চালনা করলেন। প্রবর্তন করলেন নতুন এক সাহিত্য ধারারও — পত্র সাহিত্য। তবে একথা সত্য যে, তাঁকে আমরা চিনি মূলত কবিতা এবং সঙ্গীতের জন্য। তাঁর কাব্য-কবিতার মধ্যে প্রবেশ করে দেখতে পাই, তৎকালীন সাহিত্যের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাননি। যে অজস্র কবিতা ও গান তিনি রচনা করেছেন, তার ছত্রে ছত্রে পরিলক্ষিত হয় মৌলিকতা ও স্বকীয়তা। সেই সঙ্গে, তাঁর কবিতা ও গানে প্রতিফলিত হয়েছে ধর্মীয় সাম্যতা, যা বাংলা সাহিত্যে বিরল। নিপীড়িতের কবি তথা বাংলা কাব্যে মানব-প্রেমের রূপকার কাজী নজরুল ইসলামের রচনায় মৌলিকতা ও ধর্মীয় সাম্যতা আলোচনা কালে বাংলা সাহিত্যাকাশের ধ্রুবতারা ও প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গ এসেই যায়। তবে, সাহিত্য জগতের এই মহান স্রষ্টা, যাকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্য ভাবাই যায় না, সেই মহান পুরুষ রবীন্দ্রনাথের কাব্যে ফাঁক-ফোকর খুঁজে বার করার এবং আলোচনা-সমালোচনা করার দুঃসাহস ও দক্ষতা কোনটাই আমার নেই। রবীন্দ্র-বলয় ভেদ করে কাজী নজরুল বেরোতে পেরেছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যে স্বকীয়তার ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা অন্য অনেক কবি-লেখকই পারেননি। আর এখানেই নজরুল অনন্য।

কোন লেখক বা কবি যুগের দাবিকে অস্বীকার করতে পারেন না। সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর সাহিত্য-ভাবনায় রেখাপাত করেই। সেই ছবি ফুটে উঠতে থাকে সৃষ্টির পাতায় পাতায়। কেননা, সাহিত্য হল সমাজ ও সময়ের দর্পণ। নজরুলও এর ব্যতিক্রমী ছিলেন না। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে দেখি; সেটা ছিল ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক সংকটকাল। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক। এই সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন ও যুদ্ধের দামামা মানব সভ্যতার মসৃণ দেহে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। আর এ সবের মূলে ছিল ধুরন্ধর ইংরেজ, যাদের দুঃশাসনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়াই ছিল আপামর ভারতবাসীর একমাত্র লক্ষ্য। চারিদিকে নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ, বিশ্বব্যাপী বিশ্বযুদ্ধের আবহ, সুবিধাবাদী স্বদেশীদের আখের গোছানোর প্রচেষ্টা, দেশ মাতৃকার মুক্তি সাধনে স্বাধীনতাকামী বীর সন্তানদের আত্মত্যাগ… ইত্যাদি তাঁর কাব্য-কবিতায় স্বকীয়তা ও মৌলিকতা আনতে অনেকখানি সহায়ক হয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যের দিকপাল ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দিয়ে বাংলা কাব্যের একটি পংক্তিও হয়ত সম্পূর্ণ নয়। সেই সঙ্গে, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক বাংলা সাহিত্য ছিল ‘মধ্যাহ্ন রবি’র কিরণে জাজ্জ্বল্যমান। কাব্য ও সাহিত্য ধারার সকল বিষয়ে, শাখা- প্রশাখায় ও শ্রেণী-প্রকরণে তিনি প্রবেশ করেছেন। ফলে তৎকালীন এবং রবীন্দ্র পরবর্তী বেশিরভাগ কাব্য উপাসকগণ প্রখর রবি-ছটায় নিজেদেরকে সম্পূর্ণ বিকশিত করতে পারলেন না। তাঁদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব ছিল না রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত হওয়া। তাঁদের মনে হয়েছিল, রবি-কবি যেন ইতিমধ্যেই সমস্ত কিছুই লিখে ফেলেছেন। নতুনত্বের কিছু বাকি নেই। তাই দেখা যায়, এই সময়-কালের প্রখ্যাত কবিগণ — যতীন্দ্রমোহন বাগচী, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, কিরণধন মুখোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, প্রমুখ- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত যাঁদের কূলপ্রদীপ, প্রত্যেকেই প্রখর রবি বহ্নি-শিখায় আত্মাহুতি দিয়ে বসলেন। কেননা, তাঁদের পক্ষে অনিবার্য ছিল রবীন্দ্র অনুকরণ; আবার অসম্ভবও ছিল রবীন্দ্র অনুকরণ। অথবা বলা যায়, রবীন্দ্রনাথে না মজে কোন উপায় ছিল না। এই কারণেই, তাঁদের নিজস্ব কাব্য-প্রতিভার আদর্শিক বিকাশ ঘটেনি।
তবে, তৎকালীন সকল কবি একই দোষে দুষ্ট ছিলেন না। হাতেগোনা কয়েকজন ছিলেন, যাঁরা রবীন্দ্র অনুকরণ বা অনুসরণের পথে হাঁটেননি। আপন লেখনীতে স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্রতা আনয়নে তৎপর ছিলেন তাঁরা। চেয়েছিলেন রবীন্দ্র-বেড়াজাল ছিন্ন করে, প্রখর রবি-তাপ উপেক্ষা করে, রবি-মায়া ত্যাগ করে এবং রবীন্দ্র-বলয় ভেদ করে বাংলা কাব্য-কবিতায় নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটাতে। এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনিই প্রথম বাংলা কাব্য-সাহিত্যে মৌলিকতার সন্ধান দেন। তাইতো প্রখ্যাত কবি ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসু জানালেন, রবীন্দ্র পরবর্তী কবিদের মধ্যে প্রথম মৌলিক কবি হলেন কাজী নজরুল। প্রতিবাদী চরিত্রই ছিল তাঁর রচনার মূল উপজীব্য। সেই সঙ্গে তাঁকে অগ্রপথিক করে এগিয়ে এলেন আরো দুই কবি, একই চিন্তাধারাকে সামনে রেখে। তাঁরা হলেন মোহিতলাল মজুমদার ও যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। তবে, এই দুই কবির রচনায় মূলত ফুটে উঠেছিল যথাক্রমে দেহবাদী ও দুঃখবাদী মনোভাব। নজরুল সাহিত্যে মৌলিকতা এসেছে প্রধানত রবীন্দ্র-ভাব বিরোধিতাকে কেন্দ্র করেই। বিরোধিতা নয়; বরং বলা ভাল, সাহিত্যের সেই দিকগুলোকেই উন্মোচিত করেছেন নজরুল, যে দিকগুলোতে ‘রবির আলো’ প্রবেশ করেনি।
১) রবীন্দ্র কাব্যের যে বড় বৈশিষ্ট্য আস্তিক্য দর্শন; তাকে বিরোধিতা করে নাস্তিক্য দর্শনের প্রবর্তনা ঘটাতে নির্ভীক কণ্ঠে নজরুল ঘোষণা করলেন: “ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া / খোদার আসন আরশ ছেদিয়া / উঠিয়াছি চির- বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর।”
২) পার্থিব জীবন-সৌন্দর্যে মোহিত রবীন্দ্রনাথ। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা বঙ্গ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে তাঁর কলমে। জড়িয়ে পড়েছেন ভালবাসার বন্ধনে। এই সুন্দর পৃথিবীর সঙ্গে। তিনি লিখলেন: “মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে / মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই”।
নজরুল বলতে চাইলেন- না, এই পৃথিবীটা সবার কাছে সুন্দর নয়। তিনি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন: “দেখিনু সেদিন রেলে / কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে, / চোখ ফেটে এলো জল / এমনি করে কি জগৎজুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”
৩) সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেন বিশ্বকবি। অট্টালিকাসম গৃহে অবস্থান করে নববর্ষার আগমনে আনন্দে আত্মহারা তিনি: “হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে / ময়ূরের মত নাচেরে হৃদয় নাচেরে।”
আর দরিদ্র-লাঞ্ছিত নজরুল ভাঙা চালের নীচে বসে লিখলেন: “বদলায়ে মোর নিভিয়া গেছে বাতি, / তোমার ঘরে আজ উৎসবের রাতি”।
৪) বিদেশীদের স্বাগত জানিয়ে রবি কবির বাণী: “পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার, সেথা হতে সবে আনে উপহার / দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে।”
নজরুল তাঁর লেখায় অনুযোগের সুরে জানালেন: “মোদের উঠান ভরা শস্য ছিল, হাস্য ভরা দেশ / ওই বৈশ্য দেশের শত্রু এসে লাঞ্ছনার নাই শেষ।” এভাবেই নজরুল-সাহিত্যে ধ্বনিত হয়েছে প্রতিবাদ, বিদ্রোহী চেতনা ও নির্যাতিত মানুষের কান্না। তিনিই বাংলা সাহিত্যের একমাত্র কবি, যিনি ব্রিটিশ বিরোধী কবিতা রচনার কারণে জেল খেটেছেন। তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণার বাণী। এক প্রখ্যাত সমালোচকের মন্তব্যে এই বক্তব্যের যথার্থ সমর্থন পাওয়া যায়। “এই প্রথম রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে অভাববোধ জেগে উঠল। বন্ধ্যা প্রাচীনের সমালোচনার ক্ষেত্রে নয়; অর্বাচীনের সৃষ্টির ক্ষেত্রে। মনে হল, তাঁর কাব্যে বাস্তবের ঘনিষ্ঠতা নেই। সংরাগের তীব্রতা নেই। নেই জীবনের জ্বালা-যন্ত্রণার চিহ্ন। মনে হল তাঁর জীবন-দর্শনে মানুষের অনিবার্য শরীরটাকে তিনি অন্যায়ভাবে উপেক্ষা করেছেন।” তথাপি দেখি, নজরুল ইসলামের কণ্ঠে সুমধুর লয়ে বেজে উঠেছে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের গান। তাঁকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন তিনি। অপরপক্ষে, নজরুলকেও অপত্য স্নেহে ভরিয়ে দিয়েছিলেন রবি ঠাকুর। নির্দ্বিধায় স্বীকৃতি দিয়েছিলেন নজরুলের কবি প্রতিভাকে। বাংলা সাহিত্যে এই নবকবির ধূমকেতুর ন্যায় আবির্ভাবকে স্বাগত জানিয়ে বাংলা সাহিত্যাকাশে তাঁর চিরভাস্বর ও উজ্জ্বল উপস্থিতি কামনাও করেছিলেন তিনি।
নজরুলের অসংখ্য কবিতায় হিন্দু-মুসলমান বিভেদ দূরীকরণের আহ্বান শুনতে পাই। কবি চেয়েছিলেন, ভারতবর্ষের প্রধান এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ দলাদলি ভুলে, গলাগলি করে পাশাপাশি বসবাস করুক। ‘হিন্দু-মুসলমান’, ‘মোরা দুই সহোদর ভাই’, ‘সাম্যবাদী’ প্রকৃতি কবিতায় এ প্রমাণ মেলে। তাঁর এহেন ভাবনা শুধু কবিতার ক্ষেত্রে নয়; সংগীত রচনাতেও লক্ষ্য করা গেছে। ইসলামী সংগীত রচনার পাশাপাশি লিখেছেন অসংখ্য শ্যামাসঙ্গীতও। একজন মুসলিম কবি ইসলামী সংগীত, গজল, তারানা ইত্যাদি রচনা করতেই পারেন। তাই বলে তাঁর কলমে ফল্গুধারার ন্যায় ঝরে পড়বে শ্যামাসংগীত, হিন্দু দেব-দেবীর প্রশংসাসূচক বন্দনা গীতি! এযেন ভাবাই যায় না। এখানেও নজরুলের মৌলিকতা লক্ষ্যণীয়। তিনি যে মানের ইসলামী সংগীত রচনা করেছেন, তেমনটি আজ পর্যন্ত কোনো মুসলিম কবি বা দরবেশ মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন ও প্রিয়নবী (সাঃ) এর শানে রচনা করতে পারেননি। একইভাবে, নজরুলের ন্যায় এতটা উচ্চ পর্যায়ের শ্যামাসংগীত রচনা করতে পারেননি কোন হিন্দু কবি বা সাধক। তিনি শুধু শ্যামাসংগীত রচনা করেই ক্ষ্যান্ত হননি; তন্ত্র-সাধনার রহস্য উদঘাটনের জন্য শ্যামা বা দেবী কালিকার উপাসনাও করেছেন।
কাজী নজরুলের ইসলামী সংগীত ও শ্যামা সঙ্গীত এর তুলনামূলক কিছু দৃষ্টান্ত:
১) যে নজরুল আল্লাহর হাবিব, মানবতার মুক্তিদূত, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পবিত্র রওজা মোবারকে তাঁর সালাম পৌঁছে দেওয়ার আবেদন জানিয়ে লিখেছেন: “হাজীদের ওই যাত্রাপথে / দাঁড়িয়ে আছি সকাল হতে / কেঁদে বলি কেহ যদি মোর সালাম লয়ে যায়।”
সেই নজরুল লিখলেন: “গোঠের রাখাল বলে দেরে কোথায় বৃন্দাবন / কোথায় রাখাল রাজা গোপাল আমার খেলে অনুখন।”
২) আবার দেখি নজরুলের করুন আবেদন: “মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই / যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”।
সেই কাজী সাহেব গাইছেন: “বলরে জবা বল / কেমন করে পেলি রে তুই মায়ের চরণ তল।”
৩) নজরুল এবার প্রিয় নবীর (সাঃ) আগমন-বার্তা উচ্চচরে ঘোষণা করলেন: “ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এল রে দুনিয়ায় / আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।”
সেই নজরুল কণ্ঠে আবার গীত হল: “ওরে নীল যমুনার জল / আমার কৃষ্ণ কোথায় বল / আমার কৃষ্ণ কোথায় বল।”
তাই, নিঃসন্দেহে একথা বলা যায়, এমন ধর্মীয় সমন্বয়ের বার্তা শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়; সমগ্র বিশ্ব-সাহিত্যেও বিরল।
এখানেই শেষ নয়; এই ধর্মীয় সাম্যতা শুধুমাত্র কবির কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও এর বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন কুমিল্লার মেয়ে প্রমীলা সেনগুপ্তকে। কিন্তু তাঁকে ধর্মান্তরিত করেননি। হস্তক্ষেপ করেননি তাঁর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আচরণে। তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানদের নামও রেখেছিলেন হিন্দু-মুসলিম নামের সমন্বয়ে। তাঁর সন্তানদের নাম রাখা হয়েছিল যথাক্রমে কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অরিন্দম। এই পরম্পরা কবির পরবর্তী বংশধরগণের মধ্যেও প্রবাহিত হয়ে চলেছে। আজও তাঁরা মিশ্র সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।
আমাদের এই প্রাণের কবি আজ আমাদের মধ্যে নেই। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর সৃজনের মধ্যে। যতদিন পৃথিবী বেঁচে থাকবে, ততদিন মসজিদের মাইকের সুরে ও মিলাদ-মাহফিলের প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসবে তাঁর রচিত আল্লাহর প্রশংসাসূচক ‘হামদ’। ভেসে আসবে প্রিয় নবী (সাঃ) এর শানে রচিত ‘নাতে রাসূল’। পাশাপাশি, প্রতি সন্ধ্যায় মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির সাথে ধ্বনিত হবে তাঁর রচিত অনুপম শ্যামা সংগীত। আর কোন ভাবুক হিন্দু সন্তান বিস্ময়ে ভাবতে থাকবে; এটা সত্যিই কোন মুসলমান কবির রচনা! সেই সঙ্গে, সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁর কবিতায় সন্ধান করবে সম্প্রীতি ও মহামিলনের মন্ত্র। তাইতো, এ যুগের অন্যতম সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই বলেছেন: “ভুল হয়ে গেছে বিলকুল, আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে, ভাগ হয়নিকো নজরুল”। হ্যাঁ, নজরুল ভাগ হওয়ার নয়। তিনি আমাদের সবার। তিনি সকলের, সারা বিশ্বের।








