মুখ ঢেকে যায় প্রশ্নে
আমরা যদি মানুষ না হয়ে এক কোষি অ্যামিবা হতাম। ধরা যাক, আমাদের হাত পায়ে যদি আঙুল না থাকত। বা আঙুলগুলো যদি ভাঁজ না হয়ে লাঠির মতো সোজা হয়ে থাকত। পায়ে হাঁটু, গোড়ালি আর হাতে কনুই, কব্জি যদি না থাকত। মাথা বা ঘাড় যদি কোনদিকে না ঘুরত, ফিক্সড হয়ে থাকত।
শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা ফেটে গেলে যদি রক্ত বন্ধ না হতো, ফিনকি দিয়ে বেরতেই থাকত। প্রস্রাব পায়খানা যদি না পেত বা না হতো। কিংবা পেলে বা হলে যদি আর বন্ধ না হতো। চক্ষু যুগল যদি পায়ে কিংবা বুকে বসানো থাকত। মাথাটা যদি কোমরের ওপর লাগানো থাকত।
ঘুম নামক কোনো বিষয় যদি আমাদের রোজনামচায় না থাকত। জিভে যদি স্বাদকোরক না থাকত। দাঁত বলে যদি কিছু না থাকত। হাসি, খুশি, আনন্দ, বেদনা, রাগ, অনুরাগ, মান, অভিমান যদি কিছুই না থাকত। যদি এমন হত, তবে কেমন হত?
আচ্ছা যদি এমন হত, ধরা যাক কান দিয়ে খেতে হত বা শ্বাস নিতে হত। মুখ দিয়ে শুনতে হতো, নাক দিয়ে কথা বলতে হত। হাত দিয়ে হাঁটাচলা করতে হত। আর শ্রীচরণ যুগল যদি শীর্ষসন হয়ে থাকত এবং সেই পা দিয়ে হাতের কাজ করতে হত। তবে কেমন হত?
আচ্ছা এই সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কি নিজ নিজ ধর্ম পালন করছে না? যদি ব্যতিক্রম হত? এই সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কার নির্দেশে পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ? এগুলো কি আপনি আমি চালাচ্ছি ?
ভাবুন তো, দাঁত যদি কক্ষচ্যুত বা লক্ষ্যচ্যুত হত, তাহলে আমাদের স্বাদের জিভ কি আর আস্ত থাকত, নাকি কেটে কুচিকুচি হয়ে যেত? হার্ট, কিডনি, লাংস, লিভার, ইন্টেস্টাইন, পাঙ্ক্রিয়াস ইত্যাদি ভাইটাল অর্গানগুলো যদি আমাদের দেহের বাইরে যেমন পেটে, বুকে, কাঁধে, পিঠে অবস্থান করতো, তবে কেমন হত?
যারা ঈশ্বর আল্লাহ কিছুই মানেন না। বা যারা মানেন, কিন্তু ঐশ্বরিক বিধি নিষেধ মানেন না, যারা নিজেদের মর্জি মাফিক জীবন অতিবাহিত করতেই পছন্দ করেন। ভাবেন, আমি তো এত বছর ধরে নিজের মন মতো পথেই চলছি, কই আমার তো তেমন কোনো বড় ধরনের ক্ষতি বা বিপদ হয়নি। আমি তো দিব্যি আছি সর্বনাশে। কই ঈশ্বর আল্লাহ তো আমার প্রতি বিরূপ বা বিরাগভাজন হননি।
![]()
আসলে আমরা মনে করি কে ঈশ্বর আল্লাহ, কী তার পরিচয়, কোথায় তার ঠিকানা, কী তার ক্ষমতা, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কই বা কী — ইত্যাদি প্রভৃতি।
কবে মরণ হবে, তারপর স্বর্গ নরক বা জান্নাত জাহান্নাম বলে আদৌ কিছু আছে কিনা ? ওসব তখন দেখা যাবে। ঈশ্বর আল্লাহর সঙ্গে আমি বা আমরা যে যার মতো করে বোঝাপড়া করে নেব। তোমাকে অকারণ মাথা ঘামাতে হবে না।
কিন্তু একবার ভাবুন তো, আপনি আমি অন্ধ নই, হাবাববা নই, হাত আছে, পাও আছে, খোঁড়া নই, পঙ্গু নই, প্রতিবন্ধী নই। কিন্তু চোখ মেলে দেখুন কত মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে অভিশপ্ত জীবন কাটাচ্ছে। তাহলে আপনাকে আমাকে কে সেই মহান সত্তা পূর্ণাঙ্গ অবয়বে নিপুণ সৃজনপূর্ণ মানুষ করে ধরাধামে পাঠালেন? তিনি তো ইচ্ছে করলেই আমাদেরকেও নুলো, খোঁড়া, কানা, হাবা, বধির কিংবা পাগল করে পাঠাতে পারতেন। এসব থেকে আমাদের শিক্ষণীয় কিছুই কি নেই? ভাবনার কিছুই কি নেই?
আপনার আমার চেনা জানা অনেক দম্পতি আছেন, যারা নিঃসন্তান। আবার অনেকের বাচ্চা হয়েও কিছুদিন বা কয়েকমাস বা কয়েক বছর পর মারা গিয়েছে। কারও শিশু আবার ভ্রূণ অবস্থায় গর্ভেই মারা গেছে। আপনি আমি যদি ঐসব ক্ষণজন্মার তালিকায় থাকতাম।
এমনও দেখা যায় একটাই শরীরে দুই শিশু। কারও মাথা আকারে খুব বেশি বড়। কারও একটা বা দুটো চোখ নেই। কারও হাত নেই, কারওবা পা নেই। আরো কত কী না হতে পারতো বা হয়। আমরা যদি এরকম নেই রাজ্যের বাসিন্দা হতাম!! তবে কেমন হতো? আমরা কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এসবের কোনোটাই নয়। এ কী আপনা হতেই হয়ে গেল? এ সবের নেপথ্যে কারও সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা কাজ করছে না?
আসুন আমরা এসব নিয়ে একটু ভাবতে শুরু করি। ২৪ ঘন্টা রোজ কেটে যাচ্ছে। এই সময়ে কত কিছু দেখছি, শুনছি, বলছি, পড়ছি, জানছি, বুঝছি। এই সবের মধ্য দিয়ে বরফ কিংবা মোমবাতির মত গলে যাচ্ছে সময়। রোজ একটু একটু করে আমাদের জীবন থেকে মাইনাস হয়ে যাচ্ছে সময়।
আমরা স্বীকার করি বয়স বাড়ছে। কিন্তু না বন্ধু, আসলে বয়স কমছে। আমাদের জন্য বরাদ্দ সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও সময় আছে। ঘুম ভাঙলে সকাল, না ভাঙলে পরকাল। কাল হো না হো কেউ বলতে পারবে না। তাই আসুন ভাবনা চিন্তার অভিমুখ একটু বদলাই। আপনার জীবনবোধ বা জীবনদর্শন যাই হোক। সেটা আপনার স্বাধীনচেতা মনোভাবের পরিচয়। সেটাই আপনার স্বতন্ত্রতা। আমার চিন্তা ভাবনার সঙ্গে আপনি একমত নাই হতে পারেন। সবাইকে যে আমার মত করেই ভাবতে হবে, এমন দিব্যি কেউ দেয়নি। আপনি আপনার মতই ভাবুন। তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু নতুন কিছু ভাবুন।
![]()
মনে রাখতে হবে, নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। আর আমরা সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হয়ে কেন আমাদের ভাবনার পরিধিকে বাঁধা গতেই সীমাবদ্ধ রাখব? মস্তিষ্কের ল্যাবরেটরিতে জীবনটাকে এক্সপেরিমেন্ট করি আসুন। বেলা ফুরোবার আগে একটু ভিন্ন খাতে ভাবতে চেষ্টা করি আসুন। নইলে সামনে গভীর অন্ধকার। সুতরাং সাধু সাবধান। কিন্তু বিশ্রাম নিলে হবে না। চরৈবেতি।
আমরা যে হাত দিয়ে কাউকে চড় থাপ্পড় মেরে থাকি, সেই হাতটা নেই বলে কেউ হয়ত তার সন্তানকে আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছেনা! রাগের মাথায় আমরা যে পা দিয়ে কাউকে লাথি মারি, সেই পা দুখানা না থাকার কারণে হয়ত কেউ স্কুলে যেতে পারছে না! ভিক্ষা করছে! যে চোখ দিয়ে পর্ণগ্রাফি বা আশ্লীল হারাম জিনিস দেখা হয়, সেই চোখে দৃষ্টিশক্তি না থাকায় কেউ হয়ত তার জন্মদাতা মা-বাবাকে এবং রঙিন পৃথিবীটাকে কোনোদিন দেখতেই পায়নি। যে মস্তিষ্ক দিয়ে অন্যকে ঠকাবার বা কাউকে কষ্ট দেবার ছক কষা হয়, সেই ব্রেন-বুদ্ধির অভাবে অনেকেই খ্যাপা হয়ে ভবঘুরের মতো শত ছিন্ন কাপড় পরে অর্ধ উলংগ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিংবা পাগলা গারদে শিকল বন্দী জবন কাটাচ্ছে! যে মুখ দিয়ে মিথ্যা কথা বলি, পরনিন্দা পরচর্চা গীবত করি, কাউকে খিস্তি গালাগালি করা হয়, সেই জিভ না থাকায় অনেকে কথাই বলতে পারে না। গায়ের ফর্সা রং রূপ ও চেহারার জন্য যারা অহংকার করে, দম্ভ ঔদ্ধত্য দেখায়, তারা একবার ভেবে দেখে না যে, কুৎসিত খর্বাকার কত মানুষ হীনমন্যতায় ভোগে, কিংবা আপনার থেকে অনেক বেশি সুন্দর রূপ চেহারা নিয়ে অহংকারের কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে, অথবা কবরে আযাব পাচ্ছে।
আমরা কিন্তু ভেবে দেখি না যে, এই সবকিছুই আল্লাহর নিয়ামত। আমাদের শরীর, চেহারা, রং, রূপ, জ্ঞান, বুদ্ধি সবকিছুই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। আর এসব নিয়ামত সমগ্র দিয়ে আমাদেরকে আল্লাহ্ করেছেন এবং আমাদের কাছেই আমাদেরকে আমানত হিসেবে জমা রেখেছেন। মৃত্যুর পর এই সকল নিয়ামত ও আমানতের জন্য আমাদেরকে জওয়াব দিতে হবে।
এইসব নিয়ামত থেকে আমাদের মতো কত মানুষ বঞ্চিত হয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করছে। আমরা যদি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করি এবং আল্লাহর বিধি বিধান মেনে না চলি, তাহলে আল্লাহ যেকোনো দিন আমাদের শরীর থেকে যেকোনো নিয়ামত ছিনিয়ে নিতে পারেন। তখন কী হবে? আল্লাহর পক্ষে এটা করা কি অসম্ভব? দুনিয়ায় আমরা মুসাফির। আমাদের এই জীবন কচুপাতার ওপর একফোঁটা পানির মতো। জীবনের অস্তিত্ব যদি এমন নশ্বর হয়, তাহলে হাত, পা, চোখ, মাথার মত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কীভাবে চিরস্থায়ী হতে পারে? এসবের তো লয়, ক্ষয় আছে।
প্রতিদিন কত মানুষ পৃথিবীর গাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছে। কত লোক নিত্যদিন দুনিয়ার সফর শেষ করে আল্লাহর ডাকে লাব্বাইক বলে বিদায় নিচ্ছে। চেনা জানা পরিচিত আত্মীয় স্বজন সবাই চলে যাচ্ছে। আমরা কেবল ইন্না লিল্লাহে পড়েই চলেছি। কেউ ভাবছি না যে, একদিন যেকোনো দিন মসজিদের মাইক থেকে আমাদের নামও অ্যালান হবে। খাটিয়া চলে আসবে আমার বাড়ির সদর দরজায়। সেদিন আমি, আমার পরিচয়, আমার রূপের গর্ব, লেখাপড়া ও চাকরির অহংকার, জ্ঞানের অহমিকা কোথায় চলে যাবে!








