কুরবানী: মনের পশুকে বিসর্জন দেওয়ার উৎসব
তৈমুর খান: আরবি ‘কুরবান’ শব্দ থেকে ‘কুরবানি’ শব্দটি এসেছে। ‘কুরবান’ আরবি শব্দ কুরবাতুন থেকে উৎপন্ন। কুরবান শব্দের আভিধানিক অর্থ উৎসর্গ। যে উৎসর্গের মধ্য দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য বা সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব। কুরবান শব্দটি কুরআনে তিনবার উল্লেখ আছে: সূরা আল ইমরান (১৮৩ নং আয়াত), সূরা আল মায়েদা (২৭ নং আয়াত) এবং সূরা আহক্বাফ (২৮ নং আয়াত)। একটি স্থানে পশুর কথা বলা হলেও অন্য দুটি স্থানে মানুষের ভাবনা বা মনের কাজকেই বোঝানো হয়েছে।
কিন্তু হাদিসে কুরবান বা কুরবানি বলে কোনো শব্দের উল্লেখ নেই। তার পরিবর্তে উজহিয়্যাহ এবং জাহিয়্যাহ প্রভৃতির উল্লেখ আছে। উজহিয়্যাহ জবেহের মাধ্যমে উৎসর্গ করা। এই শব্দটি ‘জোহা’ শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে। এর অর্থ পূর্বাহ্ন। উৎসর্গের ভাল সময় হল ১০ জিলহজ্জ্বের অর্থাৎ ঈদের দিনের পূর্ব সময়। একে জাহিয়্যাহও বলা হয়েছে, যার থেকে ‘আজহা’ শব্দটি এসেছে। ঈদের সঙ্গে তাকে জুড়ে দিয়ে ‘ঈদুল আজহা’ করা হয়েছে। ঈদুল আজহায় উট, গরু, দুম্বা, ভেড়া, ছাগল বা মোষ জবেহ করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পথে অগ্রসর হওয়া। জবেহ পশুর মাংস মোট তিন ভাগ করে দুই অংশ গরিব-মিসকিন ও আত্মীয়-স্বজনদের দান করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার বেশিও অথবা সমস্ত মাংসটাই বিলিয়ে দেওয়া হয়।
কুরবানির প্রচলন করেন নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)। আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নযোগে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কুরবানি করার নির্দেশ দেন। সেই ঐশী নির্দেশ পালন করতে গিয়ে তিনি প্রথমে ১০টি উট কুরবানি করেন। কিন্তু পুনরায় তাঁকে একই স্বপ্ন দেখালে এবার তিনি ১০০টি উট কুরবানি করেন। আবারও তিনি একই স্বপ্ন দেখেন। তখন তিনি ভাবতে থাকেন এই মুহূর্তে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ইসমাইল। এই প্রিয়পুত্রকে কুরবানি করার উদ্দেশ্যে আরাফাতের ময়দানে তাঁকে নিয়ে উপস্থিত হন। এ সময় শয়তান আল্লাহর আদেশ পালন করা থেকে বিরত করার জন্য ইব্রাহিম ও তাঁর পরিবারকে প্রলুব্ধ করেছিল, এবং ইব্রাহিম (আ.) তা বুঝতে পেরে শয়তানকে পাথর ছুড়ে মেরেছিলেন। শয়তানকে তাঁর প্রত্যাখ্যানের কথা স্মরণ করেই হজ্জের সময় শয়তানের অবস্থানের চিহ্ন স্বরূপ নির্মিত ৩টি স্তম্ভে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ করা হয়। পর্বতের উপরে পুত্রকে কুরবানি করার জন্য গলায় ছুরি চালনাও শুরু করেন। কিন্তু আশ্চর্য হন, ছুরিতে পুত্রের পরিবর্তে একটা দুম্বা কুরবানি হয়ে যায়। তাঁর পুত্রের কোনো ক্ষতি হয় না। ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশ পালন করার দ্বারা কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এটি ছিল ষষ্ঠ পরীক্ষা। এতে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে তাঁর খলিল (বন্ধু) হিসাবে গ্রহণ করেন।
কুরআনে সূরা ৩৭ (আস-সফফাত)-এর ১০০-১১২ নং আয়াতে আল্লাহ এই কুরবানির মহিমা বর্ণনা করেছেন। এর থেকে অংশবিশেষ এখানে উল্লেখ করা হল: ‘নিশ্চয়ই এটা সেই স্পষ্ট পরীক্ষা’ (১০৫ নং আয়াত)। ‘আমি তাঁকে বৃহৎবলি (শৃঙ্গযুক্ত পুং মেষ) বিনিময় দান করলাম’ (১০৬ নং আয়াত)। ‘এবং তাঁর সম্বন্ধে সৎ-প্রশংসা ভবিষ্যৎ-বংশীয়দের প্রতি রাখলাম’ (১০৭ নং আয়াত)। ‘ইব্রাহিমের প্রতি সালাম প্রদান হোক’ (১০৮ নং আয়াত)। ‘এই রূপে আমি হিতকারীদেরকে বিনিময় দান করি’ (১০৯ নং আয়াত)।
আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে এই ব্যবস্থা করেন। আল্লাহর জন্য তাঁর ত্যাগের মহিমা কুরবানির রূপ পায়। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই শুরু হয় কুরবানি। সারা বিশ্বের মুসলিমরা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতি বছর এই দিবসটি এভাবে উদযাপন করে। হিজরি বর্ষপঞ্জি হিসাবে জিলহজ্জ্ব মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত ৩ দিন ধরে ঈদুল আজহার কুরবানি চলে। হিজরি চান্দ্র বছরের গণনা অনুযায়ী ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার মাঝে ২ মাস ১০ দিন ব্যবধান থাকে। দিনের হিসেবে যা সর্বোচ্চ ৭০ দিন হতে পারে। কুরবানির তাৎপর্য মানব সমাজের কাছে এক বৃহৎ মানবিক ক্রিয়াকাণ্ডেরই দৃষ্টান্ত বলা চলে। আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে বিচার করলে পার্থিব কোনো প্রিয়বস্তুর প্রতি মোহ-মমতা ছিন্ন করার এবং মহান প্রভুর উদ্দেশ্যে তাঁকে নিবেদন করার মাধ্যমে নিজের মহানুভব দার্শনিক সত্তারই জাগরণ টের পাওয়া। আমরা জানি, পার্থিব মোহ-টানের আসক্তিই মানুষকে বেশি কষ্ট দেয়। তাই কুরবানি ত্যাগের মহিমায় মানুষকে উন্নীত করে। আবার বাস্তব দিকে ইসলামী বিধানে মানবিকতার চূড়ান্ত শিক্ষাও লাভ করা যায়।
কুরবানি দেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতিও দরকার হয়। আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ সহজ ব্যাপার নয়। এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ আছে: যে ব্যক্তি কুরবানি করেন, তাঁর নিজেই জবেহ করা সুন্নাহ্। তাঁর পক্ষে অন্য কেউ জবেহ করতে পারে। জবেহ করার সময় সাধারণত পড়া হয় পবিত্র কুরআনের দুটি আয়াত: সূরা আনআম-এর ৮০ এবং ১৬৩ নম্বর আয়াত। প্রথমটির অর্থ হল: ”আমি আমার মুখ তাঁর দিকেই করলাম, যিনি আকাশমণ্ডলী ও সমগ্র পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তাঁর প্রতি একনিষ্ঠভাবে আমার এই আত্মসমর্পণ এবং অবশ্যই আমি মুশরিক নই।” আর দ্বিতীয়টির অর্থ হল: ‘অবশ্যই আমার স্বলাত (নামায), আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ, সবই আল্লাহর জন্য, যিনি নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক, তাঁর কোনো শরীক নেই।” তারপর সাধারণত বলা হয়, ”হে আল্লাহ এ পশু তুমিই দিয়েছ এবং তোমারই জন্য কুরবানি করছি, সুতরাং তুমি এটা কবুল কর”… ইত্যাদি। তারপর ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর’ বলে জবেহ করা হয়। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে: এই কুরবানির রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, এর মাংসও পৌঁছায় না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় কেবল তোমাদের তাক্ওয়া। তাকওয়া কথাটির অর্থ হল ইচ্ছা, যে ইচ্ছাকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা হয়। আর একটু ব্যাখ্যা করে বলা যায়: সতর্কতা, সাবধানতা, আত্মরক্ষা। ষড়্রিপু তথা কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্য হল মানুষের মানবীয় গুণাবলির শত্রু। যেসব গুণ বা বৈশিষ্ট্য মানুষের জ্ঞানকে বাধাগ্রস্ত করে, তাদের বলা হয় রিপু বা শত্রু। এরা মূলত জ্ঞানের শত্রু। মানুষের মধ্যে এরূপ ছয়টি রিপু বা শত্রু রয়েছে। এগুলো মানব প্রবৃত্তিরই অংশ। এসবের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষকে সুসভ্য ও উন্নততর করে। এগুলোর যথেচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষকে পশুরও অধম করে দেয়। অধঃপতনের অতলে নিমজ্জিত করে। এসবের হাতছানিকে প্রতিহত করে কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা হয় এরই নাম তাকওয়া।
জাহেলিয়াতের যুগে প্রতিমার গায়ে বলির রক্ত-মাখানো হত এবং বলির মাংস প্রতিমার প্রসাদরূপে বিতরণ করা হত। ক্ষেত্রবিশেষে নরবলি দেওয়ারও প্রথা ছিল। কুরবানি নর-বলির বীভৎস প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত করে এবং বলি পশুর রক্ত-মাখানো ও মাংস প্রতিমার প্রসাদরূপে বিতরণের প্রথারও বিলোপ করে। একই সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, তাক্ওয়া অবলম্বন করে প্রয়োজন হলে একজন মোমিন তাঁর সবকিছু, এমনকী নিজের জীবনটিও, আল্লাহর নামে কুরবানি করতে সর্বদা প্রস্তুত। কারণ, আল্লাহ মোমিনের জান-মালের বদলে জান্নাত দান করেন। এ জন্যই কুরআন শরীফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: ”অনন্তর তোমার প্রতিপালক প্রভুর জন্য নামায আদায় করো এবং কুরবানি করো” (১০৮: ০২)। হাদিস শরীফেও এর সুস্পষ্ট বিধান বিদ্যমান। কুরবানি তাঁরাই দেয়, যাঁদের দেবার সামর্থ্য আছে। সারা বছর ধরে তাঁরা ভোগ সুখ ঐশ্বর্যে জীবন যাপন করলেও তার প্রতিবেশী গরিব-দুঃখীদের প্রতি থাকে উদাসীন। কিন্তু কুরবানির মাংস এইসব গরিব দুঃখীদেরই দান-খয়রাত করে দিতে হয়। ফলে তাদের উৎসর্গিত সুলক্ষণযুক্ত তরতাজা পশুর মাংস ভক্ষণ করার সুযোগ ঘটে এই উৎসবের মাধ্যমে। শুধু মাংস দানই নয়; সম্পদের একটা অংশ যাকাত হিসেবে দান এবং বস্ত্র দানও এই উৎসবের একটি অঙ্গ। কুরবানির পাশাপাশি অভাবী গরিব, দুঃখী, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে ঈদ আনন্দে শামিল করার জন্য বেশি বেশি আর্থিক দান — অনুদান, জামা-কাপড় প্রদান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ঈদসামগ্রী কিনে দেওয়ার মাধ্যমে আরও বেশি পুণ্য অর্জন করা যায়। যারা দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোটাতে পারে না, তাদের মাংস কিনে খাওয়ার সামর্থ্য হবে কোথা থেকে? এই উৎসব এই কারণেই তাদের কাছে আনন্দের। কুরবানি যেমন দানের সমৃদ্ধিতে উজ্জ্বল, তেমনি সাম্যবাদী চেতনাও মানুষের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়। ময়দানে ঈদুল আযহার নামায পড়তে গিয়ে সকলে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। ধনী-দরিদ্র, মূর্খ পণ্ডিত, উঁচু-নিচু, বালক-বৃদ্ধ সকলেই একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে সাম্য-ঐক্য-প্রেমের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। আন্তর্জাতিকভাবে মক্কায় হজ্জ্ব পালনের মাধ্যমেও কুরবানি করার রীতি প্রচলিত থাকায় সেখানেও বিশ্বভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সে দিক দিয়ে কুরবানি মহামিলনের উৎসব। মানুষ শত্রুতাও ভুলতে পারে। সবাইকে আপন করে নিতে পারে। সুতরাং কুরবানিতে যে পশুই উৎসর্গ করা হবে হোক, তা প্রতীক মাত্র। ইব্রাহিম-সত্তা, ইব্রাহিমী-চেতনা প্রত্যেকের মধ্যেই জেগে ওঠে, তখন প্রত্যেকেই লোভ, মোহ, হিংসা, স্বার্থপরতা, ভোগাকাঙ্ক্ষা ছিন্ন করার প্রয়াস লাভ করে। ইসমাইল-রূপ পুত্র-তুল্য মায়ামোহকেও অনায়াসে উৎসর্গ করার দীক্ষা লাভ করে। চেতনার সূক্ষ্ম ছুরি দিয়ে মনের পাশবিক শক্তিকে জবেহ করে শুদ্ধসত্ত্ব মানবিক ত্যাগ-তিতিক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করাই একমাত্র কাম্য বলে মনে করে। পার্থিব সম্পদের প্রতি নিরাসক্তির শিক্ষা নেয়। এই মহৎ উৎসবের মহিমাকে অনুধাবন করতে পারলে আমাদের ঐশ্বরিক সান্নিধ্যের আকাশ আরও বিস্তৃত হবে। আর শুধু যে মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যেই এই উৎসবের প্রচলন হয়নি, মনের পশুকে কুরবানি করারও মহিমা বিরাজ করছে, তা স্পষ্ট হবে।
কুরবানির আর একটি বাস্তব দিক খুবই উল্লেখযোগ্য। কুরবানির সময় বেশিরভাগই ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষরা বিভিন্ন পশু ক্রয় করে উৎসর্গ করার উদ্দেশ্যে। আর এই পশুগুলি বেশিরভাগই লালন-পালন করে নিম্নবিত্ত ও গরিব-দুঃখী মানুষেরা। কুরবানির সময় এইসব পশুর দাম-দর একটু বেশি পায় তারা। ফলে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে তাদের আয়েরও অভিমুখ লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ সারা বছর পথ চেয়ে থাকে এই উৎসবের। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবেশীকে দেখা এবং সাহায্য করা একটা অত্যাবশ্যকীয় কাজের মধ্যেই পড়ে। ঈদুল আযহায় এই প্রক্রিয়াটিকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। বছরের বেশিরভাগ সময়ই এই সাহায্যের অবসর হয়ত থাকে না, কিন্তু কুরবানি এলেই তা আবার মনে পড়ে যায়। অনেকেই কুরবানির পশু হত্যাকে অমানবিক এবং নিষ্ঠুর কর্ম বলে থাকেন। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে অসভ্য মানুষ পশু হত্যায় ভয়াবহ বর্বরতার পরিচয় দিত। এখনো বহু দেশের বহু সমাজে হত্যার এই ভয়াবহ রূপ দেখা যায়। অনেকেই বিনা কারণে পশু হত্যা করে। তা থেকে রক্ষা করার জন্যই কুরবানিকে একটা সুচারু সামাজিক ও মানবিক বিন্যাস দান করেন হযরত মুহাম্মদ (সা:)। সমস্ত পশুই মানুষের উপকারের জন্য। তা সে খাদ্য হিসেবেই হোক, দুগ্ধ প্রদানকারী হিসেবেই হোক, কিংবা চাষাবাদ অথবা বহনকারী হিসেবেই হোক। হাদিসে উল্লেখ আছে, বেশ কিছু বিষয়: ”আল্লাহর নিকট সবথেকে বড় পাপিষ্ট ব্যক্তির একজন হল সেই ব্যক্তি, যে বিনা কারণে পশুহত্যা করে” (দ্র: হাকিম, বায়হাকি, সহিহুল জামে / ১৫৬৭)। ইসলাম শুধু পশু পাখি নয়, একটা পিঁপড়ারও অধিকার সুনিশ্চিত করেছে।
সুতরাং কুরবানিকে পশু হত্যাকারী উৎসবও বলা যাবে না। কেননা, কুরবানির পশু মানুষের খাদ্য হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একে কেবল ‘অনাবশ্যক পশুহত্যা’ মনে না করে অসত্যের নিধন ও সত্যের উদ্বোধন মনে করাই ঠিক হবে। বাংলার বিদ্রোহী কবি তথা সারা বিশ্বের মানবিক অভেদ-সৌন্দর্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ-কারণেই বলেছেন, ‘ওরে, হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ, শক্তির উদ্বোধন’। ফলত শুদ্ধ চিত্তে যিনি কুরবানি দেন, তিনি শুধু অনাবশ্যক পশুহত্যা করেন না; বরং তিনি সত্যসন্ধানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আর এভাবেই তিনি তার আরাধ্য ও প্রার্থিত শুভশক্তির উদ্বোধন করেন। ভারতে কুরবানির পশু হিসেবে সিংহভাগেই থাকে গরু। রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি সত্যিই গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে খুব অল্প দিনেই পরিবেশ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। বেশ কয়েকটি রাজ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি গরু এবং গোশালার অবস্থা কেমন। কুরবানি পালনের মাধ্যমে গরুর মাংস যেমন খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তেমনি মৃত গরুর ফলে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণের হাত থেকেও পরিবেশকে রক্ষা করা যায়। গরুর হাড় এবং চামড়া শিল্পের কাজে ব্যবহৃত হয়। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে কুরবানির প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নাতীত। ধর্মীয় বাতাবরণের আড়ালে সামাজিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক সর্বোপরি মানবিক সমৃদ্ধির কথা ভুললে চলবে না। কুরবানির মাধ্যমে তাই মানবধর্ম যেমন রক্ষা করা সম্ভব, তেমনি পরিবেশ রক্ষা এবং সাম্যবাদী চেতনার বিকাশ ঘটানোও সম্ভব। আমরা মনের পাশবিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রকৃত জিহাদ জানাতে পারব।








