‘বিদ্রোহী’ নজরুল, ভাগ হয়ে গেছেন বিলকুল
জি.এম. আবুবকর: একটি মাত্র কবিতার জন্য শতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে বা স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হচ্ছে — এমন ঘটনা কখনও ঘটেছে কি না সন্দেহ আছে; আমার অন্তত জানা নেই। একশো বছর অতিক্রান্ত, আজও অম্লান কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জনপ্রিয়তা। একই সময়কালে আটটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল এই কবিতা। বিশ্বের শতাধিক ভাষায় কবিতাটির অনুবাদ হয়েছে। কেবল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করেই খ্যাতিমান হয়েছেন বহু আবৃত্তিকার তথা বাচিক শিল্পী। এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেয়েছিলেন কবি-পুত্র কাজী সব্যসাচী। তিনি যখন এই কবিতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করতেন, তখন মনে হত কাজী নজরুল বোধ হয় নিজের পুত্রের জন্য এই কবিতার জন্ম দিয়েছিলেন। সমগ্র কবিতাটি শোনার পর মনে হত, কর্ণকুহরে একটা শব্দমালার সুনামি ঘটে গেল। বাংলা ভাষার ভিসুভিয়াস থেকে যেন অগ্ন্যুৎপাত হল। আমার মনে আছে, অতীতে ক্যামাক স্ট্রিটের ‘ইন্দো-আমেরিকান সোসাইটি’র এক অনুষ্ঠানে আমি কবিতাটি পাঠ করেছিলাম। অনুষ্ঠানে অনেক দেশি-বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। আমার আবৃত্তি শেষ হবার পর কলকাতায় চেকোস্লোভাকিয়া কনসুলেটের ফার্স্ট সেক্রেটারি মিস্টার সেড্রোউস্কি বলেছিলেন, ‘ইজ ইট আ পোয়েট্রি অর এ সং? – সো বিউটিফুল অ্যান্ড সো সনোরিয়াস!’ সেদিন বুঝেছিলাম, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শব্দ-ঝংকার বাংলা না জানা বিদেশিকেও কীভাবে আকৃষ্ট করে।
আমি ছিলাম কাজী সব্যসাচীর একলব্যের মতো ভক্ত। আমার মতো নগণ্য আবৃত্তিকারও কলেজ জীবন থেকে কবিতাটি আজও আউড়ে যাই সুযোগ পেলে। আজও চেষ্টা করি ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু অনুবাদের আবৃত্তি করতে। এই কবিতার ভাব ভাষা, ছন্দ, শব্দ চয়ন, উপমা রূপক, অভিনব, আনোখা। ভারতীয় শাস্ত্র, পুরাণ, গ্রিক-পুরাণ, ইসলামী সংস্কৃতির ঐতিহ্য — সমস্ত কিছু থেকে অজস্র উপকরণ অবলীলাক্রমে চয়ন করে কবি খচিত করেছিলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সর্বাঙ্গে। এই কবিতায় নজরুল বাংলা ভাষার গণ্ডি অতিক্রম করেছিলেন। ‘মম প্রাণের পেয়ালা হরদম হ্যায় হরদম ভরপুর মদ’ – পঙক্তি রচনা করতে গিয়ে বাক্য প্রয়োগে হিন্দি বা উর্দুকে স্বচ্ছন্দে আলিঙ্গন করেছিলেন। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের কোনো এক রাত্রি। কবি তখন বাস করতেন মধ্য কলকাতার ৩/৪ সি, তালতলা লেনের একটি গৃহে। তাঁর সঙ্গী ছিলেন তাঁর সুহৃদ, অগ্রজসম, প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা মুজাফফর আহমদ। সে রাত্রে মুজাফফর সাহেব যখন নিদ্রামগ্ন, নজরুল তখন সৃষ্টির নেশায় মাতোয়ারা। তাঁর মনের মধ্যে ঝরনা ধারায় শব্দের হীরক খণ্ডগুলি ভিড় জমাচ্ছিল, এবং তা এত দ্রুতগতিতে যে তিনি মন্থর দোয়াত-কলম রেখে ওই দীর্ঘ কবিতাটি পেন্সিল দিয়ে লিখে ফেলেছিলেন।

তাঁর ভাবনার জগতে যেন উদয় হয়েছিল এক ক্রান্তিলগ্ন। পরবর্তী জীবনে তিনি বাঙালি জাতির কাছে চিহ্নিত হয়ে রইলেন, ‘বিদ্রোহী কবি’হিসেবে। এক অদ্ভুত সমাপতন লক্ষ্য করা যায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম কবি হিসেবে প্রচণ্ডভাবে আত্মপ্রকাশের কবিতা ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’-এর সঙ্গে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ সৃষ্টি হয়েছিল সাহেব কলকাতার ১০ নম্বর সদর স্ট্রিটের একটি অট্টালিকায়, যেখান থেকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সূতিকাগারের অবস্থান ছিল বড়জোর এক কিলোমিটার দূরে। কবিতা দুটি রচনাকালে দুই কবিরই বয়স ছিল প্রায় একই। ২০-২২ বছরের মধ্যে। আর কালের ব্যবধান ছিল মাত্র বছর চল্লিশেক। বাংলাদেশ সরকার কাজী নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’র সম্মান দিয়েছে। নজরুলের নামে অনেক স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে অন্যতম ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পঙক্তি খচিত একটি স্মারক ডাকটিকিট। আমাদের দেশ ভারতেও একটি স্মারক ডাকটিকিটের প্রকাশ ঘটেছে।
তবে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতার তুলনায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কলেবর তিন গুণ। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রায় একই বয়সের লেখা কবিতার তুলনা চলে না। কারণ, ‘বিদ্রোহী’-তে যে শব্দের সুনামি বা ভাষার ভিসুভিয়াস পাঠককে উথাল-পাথাল করে, রবীন্দ্র-কবিতা সেদিক থেকে তার সমকক্ষ নয়; বরং রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের কবিতা ‘পৃথিবী’তে আবেগের তুফান বা শব্দের ঝড় তুলনা রহিত। এই বাংলায় নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা উপলক্ষে অন্তত একটি সুউচ্চ মিনার নির্মাণ হোক। শেষ কথা, নজরুলের আজ জন্মদিন। কবির শেষ জীবনে আমরা তাঁকে এদেশে ধরে রাখিনি। এটা জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জা। এমনকি তাঁর প্রয়াণের পর আমরা তাঁর মরদেহে ফুল দিইনি, দিয়েছি তাঁর ছবিতে বা মূর্তিতে। দ্বিতীয়ত: আমরা নজরুলের আদর্শ গ্রহণ করিনি। দেশে সম্প্রদায়গত বিভাজন আজ চূড়ান্ত; অথচ কবি নজরুল ইসলাম দেশের কাণ্ডারীকে হুঁশিয়ার করে লিখেছিলেন — “হিন্দু না মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারি! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।”








