মানুষত্ব, সম্মান ও ধর্মীয় আচার সাম্প্রতিক ঘটনা ও কিছু জরুরি প্রশ্ন
সামিউল গাজী
নতুন পয়গাম: কলকাতার ব্রিগেড ময়দান; শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিস্তৃত এক প্রান্তর-সহ শহরের নানা প্রান্তে যেখানে প্রতিদিন বহু সাধারণ মানুষ জীবিকার সন্ধানে আসেন। কেউ খাবারের স্টল নিয়ে বসেন, কেউ প্যাকেট-বিক্রেতা, কেউ পানিপুরি বা ছোটখাটো নাস্তার দোকান করেন। ওরা জানেন না ধর্মের ভিত্তিতে খাবার ভেদের কথা। বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে সেই ভিড়ই তাঁদের রোজগারের প্রধান সুযোগ হয়ে ওঠে। এই স্বাভাবিক চিত্রই বহু বছর ধরে অপরিবর্তিত।
কিন্তু সম্প্রতি ব্রিগেড মাঠে পাঁচ লক্ষ মানুষের গীতা পাঠ অনুষ্ঠানে এই পরিচিত দৃশ্যেই ধাক্কা লাগল। ধর্মীয় ভিড়ের সামনে এক পথ-বিক্রেতাকে অপমানিত করার এক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল সংবাদমাধ্যমে। তাদের দাবি, ওই ব্যক্তি চিকেনের তৈরি প্যাটিস বিক্রি করছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে যা সম্পূর্ণ বৈধ ও দৈনন্দিন অভ্যাস। তবু একটি বিশেষ সংগঠনের কয়েকজন কর্মী তাঁকে জোর করে কান ধরে উঠবস করাল, তাঁর খাবারের বাক্স ছুড়ে ফেলে দিল এবং জনসমক্ষে তাঁকে লাঞ্ছিত করল।এরপর সেই ভিডিওই মিডিয়া মুখ-সহ প্রচার করল, যেন অপমানটাই খবরের প্রধান উপাদান। ছি!
সংবিধানের আলোকে মর্যাদা কি কেবল মৃতের অধিকার?
ভারতীয় আইনে ধর্ষণ বা হত্যার মামলায় নিহত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ নিষিদ্ধ। কারণ, সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষার দায় রাষ্ট্রের। কিন্তু সংবিধানের ২১নং অনুচ্ছেদ আরও বড় কথা বলছে: Right to Life with Dignity — বেঁচে থাকার অধিকার মানে মর্যাদা-সহ বেঁচে থাকা। একজন জীবিত মানুষকে প্রকাশ্য রাস্তায় বা জনসম্মুখে হেনস্থা করা, তাঁর সম্মান বিনষ্ট করা, এবং তার মুখ দেখিয়ে সেই দৃশ্য প্রচার করা — এ সবই মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। আইনের চোখে এটি মানহানি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, জীবিকার অধিকারে আঘাত। এগুলো কেবল নৈতিকতা নয়, সাংবিধানিক বাস্তবতা।

অপরাধ কোথায়, মাংসে, নাকি মানসিকতায়?
ঘটনার মূল প্রশ্নটি একেবারেই সহজ, চিকেন খাওয়া বা বিক্রি করা কি কোনো অপরাধ? পশ্চিমবঙ্গে তো নয়ই। যেখানে ওই বিক্রেতা গরুর মাংস বিক্রি করেননি, কোনো অশান্তি সৃষ্টি করেননি, শুধু নিজের সংসারের জন্য অন্ন জোগাড় করতে গিয়েছিলেন। আপনি গীতা পড়তে যাচ্ছেন, সে তার সংসার চালাতে যাচ্ছেন। আপনার প্রার্থনা আছে, তার পেট আছে। তাহলে তাঁর অপরাধ কোথায়? স্পষ্ট – অপরাধ ছিল না, ছিল দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া। ধর্মীয় ভিড়, রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব, আর সংখ্যার দম্ভ — এই তিন মিলে তাঁকে “টার্গেট” বানানোই হয়ত সহজ ছিল।
গীতা পাঠের মূল শিক্ষা কোথায় হারাল?
গীতা পাঠ কোনো প্রদর্শনী নয়। গীতা মানুষের মন উন্নত করার শিক্ষা দেয়। গীতার ১৬ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ দূরদৃষ্টিতে বলেন অহিংসা, দয়া, ক্রোধশূন্যতা, সংযম, সত্য — এগুলো দেবোত্তম গুণ। আর দম্ভ, নিষ্ঠুরতা, অজ্ঞতা — এগুলো অসুরিক গুণ। তাহলে প্রশ্ন জাগে, এক নির্দোষ খেটে-খাওয়া মানুষকে প্রকাশ্যে অপমান করা কোন শিক্ষার প্রতিফলন? গীতা পড়া সহজ, কিন্তু গীতার মর্ম হৃদয়ে ধারণ করা কঠিন। সেই কঠিন শিক্ষাটাই অনুপস্থিত ছিল ময়দানের ঘটনায়। জীবিকার ওপর আঘাত, অর্থনৈতিক সহিংসতা। একজন দরিদ্র মানুষের দিনের আয়ই তাঁর একমাত্র পুঁজি। তাঁর মালপত্র রাস্তা জুড়ে ছুঁড়ে ফেলা মানে তাঁর রোজগার কেড়ে নেওয়া, তাঁর পরিবারের খাদ্য ছিনিয়ে নেওয়া, তাঁকে মানসিক আঘাত দেওয়া। এটি শুধুই অপমান নয়, এটি অর্থনৈতিক সহিংসতা। এই সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন ও মানবাধিকার কমিশনের তৎপর হওয়া উচিত। এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
মিডিয়ার ভূমিকা: দায়িত্ব, না প্রদর্শন?
মিডিয়ার কাজ তথ্য দেওয়া, প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মিডিয়া ঘটনা নয়, দৃশ্যকে বিক্রি করে। একজন পথ-বিক্রেতা কান ধরে উঠবস করছেন — এই দৃশ্যকে মুখ-সহ প্রচার করা কি সাংবাদিকতা? নাকি এটি TRP-এর জন্য মানুষের মর্যাদা বেচে দেওয়া? মিডিয়ার নৈতিক দায়িত্ব হল — দুর্বলকে রক্ষা করা, গোপনীয়তা বজায় রাখা, মানহানিকর ছবি ছড়িয়ে না দেওয়া। কিন্তু এই ঘটনায় তা দেখা যায়নি।
এ ঘটনা আমাদের কী শেখায়?
ধর্মের নামে হিংসা বা অপমান কখনো ন্যায়সঙ্গত হয় না। গীতা, কুরআন, বাইবেল কোনো ধর্মই দুর্বলকে অপমান শেখায় না। খেটেখাওয়া মানুষের জীবন ও সম্মান সমাজের রক্ষাকবচ পাওয়ার কথা। দর্শকের নীরবতাও অন্যায়কে বৈধতা দেয়। মিডিয়ার দায় সংবেদনশীলতা দেখানো, সেনসেশন তৈরি করা নয়।
শেষ কথা হল — ধর্ম নয়, মানুষত্বের পরীক্ষায় আমরা কোথায়? ব্রিগেড ময়দানের এই ঘটনা ধর্মের নয়, মানুষের পরীক্ষার মুহূর্ত। যে অনুষ্ঠানের মূলমন্ত্র গীতা, সেই অনুষ্ঠানের আশেপাশেই গীতার শিক্ষা লঙ্ঘিত হল প্রকাশ্যে। ধর্মীয় আচারের উদ্দেশ্য মানুষকে উন্নত করা, কিন্তু ধর্ম যখন মানুষকে অসম্মান করার যুক্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই ধর্মের চর্চা নয় — চর্চার নামে বিকৃতি বরং সামনে আসে। গীতার শিক্ষা হল সমদৃষ্টি, অহিংসা, সম্মান। এই শিক্ষা আচরণে না দেখা গেলে, কোনো মন্ত্রপাঠই আমাদের সমাজকে সুস্থ করতে পারবে না। সুতরাং আজ প্রয়োজন, ধর্মের আড়ালে নয়, মানুষত্বের ভিত্তিতে সমাজকে দাঁড় করানো। মানুষের সম্মান রক্ষা, এটাই মানবতার প্রথম ও প্রধান শর্ত।








