ইতিহাসের নির্মম পরিহাস ইন্দিরা যাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, সেই মতুয়ারাই আজ বিজেপির ভক্ত
ঝুমুর রায়
দেশের স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের নাম না জানা হাজার হাজার নির্যাতিত নিম্নবর্ণ হিন্দু, বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায় ভারতে আশ্রয়ের জন্য পাড়ি জমায়। এই আশ্রয়দানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর। তিনি রাজনৈতিক মানবিকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ নীতির ভিত্তিতে তাঁদের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হল, আজ সেই মতুয়া সমাজের একটি বড় অংশ বিজেপির শক্তিশালী ভোটব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছে; এমনকি অনেক মতুয়া নেতা আজ বিজেপির প্রার্থী বা সাংসদ। প্রশ্ন জাগে, যে দল তাঁদের আশ্রয় দিয়েছিল, তাঁদের সন্তানরা কেন আজ সেই দলের বিরোধী এক মতাদর্শের দিকে ঝুঁকছে?
মতুয়া আন্দোলনের পটভূমি:
মতুয়া ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২–১৮৭৮) ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যা মূলত ছিল নিম্নবর্ণ হিন্দুদের আত্মমর্যাদার লড়াই। তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত চেতনায় রূপ দেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের (পূর্ব পাকিস্তান) মতুয়ারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় তীব্র নিপীড়নের শিকার হন। তখন তাঁদের বৃহৎ অংশ ভারতে চলে আসেন। বিশেষত নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, বসিরহাট, বনগাঁ, রানাঘাট প্রভৃতি অঞ্চলে।
ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা:
১৯৬০ ও ৭০–এর দশকে মতুয়াদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। আশ্রয়শিবির, খাদ্যের অভাব, নাগরিকত্বহীনতা — সব মিলিয়ে এক ভয়ানক বাস্তবতা। এই সময়েই ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাঁদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। তৎকালীন নাগরিকত্ব আইন (১৯৫৫)–এর আওতায় একাধিক প্রবিধান পরিবর্তন করে উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব প্রদানের পথ সহজ করেন ইন্দিরা। তাদের চাষের জমি, আবাসন, রেশন কার্ড, ভোটার আইডি ইত্যাদি সব কিছুই ধীরে ধীরে নিশ্চিত করা হয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে তৎকালীন রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন স্কিম চালু হয়, যার সর্বাধিক সুবিধাভোগী ছিলেন মতুয়ারা। এই মানবিক সহানুভূতির কারণে তখন মতুয়ারা কংগ্রেসের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাও কংগ্রেসপন্থী ছিল।
২০১১ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা:
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মতুয়া রাজনীতিতে নতুন মোড় আসে।
তৃণমূল সরকার মতুয়াদের ঠাকুরনগরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে, হরিচাঁদ–গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন এবং মতুয়া উৎসবগুলিতে সরকারি অনুদান চালু করেন। কিন্তু একই সময়ে বিজেপি ‘নাগরিকত্ব ও ধর্মীয় পরিচয়’ইস্যুতে এই সম্প্রদায়কে নিজেদের দিকে টানতে শুরু করে।
বিজেপির কৌশল, নাগরিকত্বের রাজনীতি:
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাঁরা মতুয়া ভোটকে লক্ষ্য করে সিএএ বা সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের প্রচার করে। এই আইনটি মূলত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিষ্টান শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদান করবে বলে ঘোষণা দেয়। বিজেপি দাবি করে, ইন্দিরা গান্ধী আপনাদের থাকতে দিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা আপনাদের নাগরিকত্ব দেব। এই বাগ্মিতায় অনেক মতুয়া ভাবতে শুরু করেন, তাঁদের প্রকৃত নাগরিকত্ব কেবল বিজেপিই দিতে পারে। যদিও বাস্তবে সিএএ এখনো পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি, তবুও এই প্রতিশ্রুতি মতুয়াদের মধ্যে এক মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা তৈরি করেছে।
মতুয়ারা কেন বিজেপির দিকে গেলেন?
নিরাপত্তা ও পরিচয়ের রাজনীতি: সিএএ–এর মাধ্যমে বিজেপি তাদের মনে “আমরা হিন্দু, তাই আমাদের জায়গা আছে”এই বোধ তৈরি করে দেয়। ধর্মীয় পরিচয়ের এই রাজনীতি অনেক মতুয়ার মনে আত্মরক্ষার তাগিদ জাগায়।
ঠাকুরবাড়ির বিভাজন: ঠাকুরবাড়ির দুই শাখা—শান্তনু ঠাকুর ও মমতা বালা ঠাকুর রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েন। শান্তনু ঠাকুর বিজেপিতে যোগ দেন এবং এখন তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। ফলে ঠাকুরবাড়ির একটি প্রভাবশালী অংশ বিজেপির পক্ষে সক্রিয় হয়।
কংগ্রেস ও তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা: মতুয়াদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন বা তৃণমূল স্তরে ধারাবাহিক যোগাযোগের অভাব কংগ্রেস ও তৃণমূলের ক্ষতি করেছে। কিন্তু বিজেপি সেখানে সংগঠিতভাবে কাজ করেছে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রতিদানবোধ: অনেক মতুয়া মনে করেন, তাঁরা কংগ্রেসকে অনেক দিয়েছিলেন, কিন্তু কংগ্রেস তাঁদের ‘ভোটব্যাঙ্ক’ছাড়া কিছুই ভাবেনি। বিজেপি অন্তত তাঁদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের কথা বলছে।
ইতিহাসের বিপরীত গতি:
বাস্তবে বিজেপির মতাদর্শ এবং মতুয়া দর্শন একেবারেই ভিন্ন। মতুয়া ধর্মের মূল কথা ছিল মানবধর্ম, বর্ণবৈষম্য বিরোধিতা এবং সমতা। অথচ বিজেপির মূল মতাদর্শ মনুস্মৃতি-নির্ভর হিন্দুত্ববাদ, যা আসলে বর্ণবৈষম্যকে টিকিয়ে রাখে। অতএব, আজ মতুয়ারা যে দলের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, সেটিই একসময় তাঁদের মতো নিম্নবর্ণ হিন্দুদের ‘অশুদ্ধ’বলে দূরে ঠেলে রেখেছিল, এ এক ইতিহাসের নির্মম রসিকতা।
ইন্দিরা গান্ধী একসময় যাদের মানবতার ভিত্তিতে আশ্রয় দিয়েছিলেন, আজ তাঁদের উত্তরসুরীরা এক ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফাঁদে পড়েছেন। কংগ্রেসের ভুল ছিল তাঁদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ না রাখা, আর বিজেপির সাফল্য হল পরিচয়ের রাজনীতিকে আবেগে রূপান্তরিত করা।
কিন্তু মতুয়া সমাজ যদি নিজেদের ইতিহাস মনে রাখে, তবে তারা বুঝবে, তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি কোনো দলীয় ধর্মনীতি নয়, বরং মানবিক সহাবস্থান ও সমতার আদর্শ। যে আদর্শের সূচনা হয়েছিল হরিচাঁদ ঠাকুরের কণ্ঠে — “সব মানুষ এক, কেউ বড় কেউ ছোট নয়।”








