পরিবার সুখের হয় ধমনীর গুণে
মুদাসসির নিয়াজ
নতুন পয়গাম: ব্যক্তির সমষ্টি হল পরিবার। আবার সমাজের ক্ষুদ্র সংস্করণ হল পরিবার। অর্থাৎ সমাজ গড়ে ওঠার প্রথম ও প্রধান উপাদান হল পরিবার। আর পরিবার তথা সমাজের প্রধান উপাদান হল মানুষ। তাই মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও স্নেহ ভালবাসার অটুট বন্ধনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে পারিবারিক কাঠামো। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবারকে বলা হয় সমাজ তথা রাষ্ট্রের আয়না। একটি আদর্শ পরিবারের অন্যতম ক্রাইটেরিয়া হল সকলে মিলেমিশে একত্রে বসবাস করা। যদিও বর্তমানে পারিবারিক পরম্পরা, সম্পর্ক তথা বন্ধন ক্ষয়িষ্ণু।
ফলে সামাজিক ক্ষেত্রে নানাবিধ উপসর্গ ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। তাই পরিবারে সবার সুখ, শান্তি ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতি সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে, তবেই পরিবার সুসংহত হবে, সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর সমাজ গড়ে উঠবে। পাশ্চাত্যের পারিবারিক গঠন, কাঠামো ও বুনিয়াদ খুবই নড়বড়ে। পশ্চিমারা নিজেদেরকে আধুনিক সভ্যতার সূতিকাগার বলে দাবি করলেও তাদের পারিবারিক কাঠামো ও বন্ধন ভঙ্গুর বা শিথিল। অভিভাবকরা সন্তানদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। কারণ, অধিকাংশ পিতা-মাতার নৈতিক চরিত্রের ঠিক-ঠিকানা নেই।
স্বাধীনতা ও অধিকারের নামে তারা যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াচ্ছে। পরিণতিতে পরিবারের ভিত্তি নড়বড়ে হচ্ছে, বিবাহ-বহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কের ফসল হিসেবে জারজ শিশুর জন্মহার লাগামছাড়া। লাওয়ারিশ-বেওয়ারিশে উজাড় হয়ে যাচ্ছে আমেরিকা-ইউরোপের দেশগুলো।
পরিবারের ভিত মজবুত করা, পরিবারকে ক্ষতিকারক সবকিছু থেকে হেফাজত করা এবং পারিবারিক বন্ধনকে মজবুত করার ওপর জোরালো তাগিদ দিয়েছে ইসলাম। একইসঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দিয়েছে।
ইসলাম নারীকে জননী, ভগিনী ও কন্যা হিসেবে পৃথক পৃথক মর্যাদা দিয়েছে। মা হিসেবে নারীকে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিয়ে বলা হয়েছে, আল্লাহ এবং নবী-রাসূলের পরই মায়ের অবস্থান। এমনকী বাবার থেকে মায়ের মর্যাদা তিনগুণ বেশি। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাত।
ইসলাম পিতা-মাতার ওপর সন্তান লালন-পালনের গুরুদায়িত্ব আরোপ করেছে। রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল; স্ত্রী তার স্বামীর সংসারের দায়িত্বশীল; এদের প্রত্যেককে কেয়ামতের ময়দানে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
ইসলাম পিতা-মাতাকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা-সম্মান করা, এহসান করা, তাদের সেবাযত্ন করা এবং মৃত্যু অবধি তাদের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন: আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে বিরক্ত হয়ে তাদেরকে ‘উহ’ পর্যন্ত বলো না, তাদেরকে ধমক দিও না। তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল।
ইসলাম পরিবারের ইজ্জত, সম্মান, পুতঃপবিত্রতা ও বংশধারা সুরক্ষিত করেছে। ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে বৈধ সম্পর্কের তাগিদ দিয়েছে। ইসলামে বৈরাগ্যবাদ বা সন্ন্যাস-জীবন বৈধ নয়। পাশাপাশি নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বিবাহ-বহির্ভূত সমস্ত রকম সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসলাম মোতাবেক, সমাজ গঠনের মৌলিক উপাদান হল পরিবার। পরিবার একটি জাতির মেরুদণ্ড। আগামীর আদর্শ মানুষ গড়ার পাঠশালা হল আদর্শ, সমুন্নত ও সুসংহত পরিবার। তাই পরিবার গঠনের প্রতি ইসলাম খুবই গুরুত্ব আরোপ করেছে। পরিবারের মাধ্যমে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে তৈরি হয় ভালবাসা ও হৃদ্যতার সম্পর্ক বা বন্ধন।
নিষ্কলুষ জীবনযাপন ও মানবিক চাহিদা পূরণের বৈধ পরিসর হল পরিবার। পরিবার এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র, যা পিতা-মাতা ও সন্তানকে সুশিক্ষিত করে তোলে। ভবিষ্যতে সেই সন্তান সুনাগরিক হয়ে ওঠে। সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা ও জ্ঞান দেওয়া আবশ্যক। তাদের আদব-কায়দা ও ইসলামী শিষ্টাচার, তাহজীব-তামদ্দুন, আখলাক গড়তে শিক্ষা দিতে হবে। বস্তুত ইসলামের সুমহান আদর্শ ও শিক্ষার মাধ্যমেই সবাই সুখে-শান্তিতে পরিবারের চৌহদ্দির মধ্যে বসবাস করতে পারবে।
মানব সমাজের ভিত্তি হল পরিবার, যা মূলত স্বামী-স্ত্রীকে আবর্তিত করেই শুরু হয়। পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হযরত আদম (আ.) এবং তার জীবনসঙ্গী হযরত হাওয়া (আঃ)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে সৃষ্টির ঊষালগ্নে প্রথম পরিবার গড়ে ওঠে। সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে আজও এই পরিবার প্রথা চালু আছে। পরিবারে শান্তি-শৃংখলা থাকলে জীবন সুখময় হয়, অন্যথায় দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এই পৃথিবী নামক গ্রহকে শিশুদের বাসযোগ্য করতে হলে সবার আগে দরকার আদর্শ পরিবার গঠন, যা হবে সুখ-শান্তির আকর ও আধার। আদর্শ পরিবার গড়ে উঠতে পারে একমাত্র ইসলামী নীতিমালা মেনেই। এর বাইরে গিয়ে অন্য কোনও সমাজ-সভ্যতা থেকে সংস্কৃতি আমদানি বা অনুসরণ-অনুকরণ, অনুশীলন ও অবলম্বন করলে, সেই পরিবার ক্যান্সারের মতো দূরারোগ্য ব্যাধির আকার নেবে, যার কোন প্রতিষেধক নেই।
যে পরিবারে মেয়েদের পর্দা বা শালীন পোশাকের প্রচলন নেই, ছেলেরা বেহিসাবি ও বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত, পরিবারে নামায-রোযার সিলসিলা নেই, কেউ হক কথা বলে না, হক পথে চলে না, কেউ কারো হক যথাযথ আদায় করে না, ইসলামের দিকনির্দেশনা মানে না – সেইসব পরিবার নরক গুলজার হতে বাধ্য।
পক্ষান্তরে ইসলামের শাশ্বত বিধান ও নীতিমালা মেনে পরিবার গঠনে সচেষ্ট হলে সেই পরিবার নিঃসন্দেহে মরুদ্যান হয়ে উঠবে। পারিবারিক জীবন ব্যতিরেকে মানব-সভ্যতা কল্পনা করা যায় না। মানুষের অস্তিত্বের জন্য পারিবারিক জীবন অপরিহার্য। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, উন্নতি-অগ্রগতি ইত্যাদি সুষ্ঠু পারিবারিক ব্যবস্থার উপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল। পারিবারিক কাঠামো বা বুনিয়াদ নড়বড়ে হলে, সেখানে ভাঙ্গন-বিপর্যয়-অবক্ষয় দেখা দিলে সমাজ জীবনে নানা অশান্তি, অচলাবস্থা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তাই ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পরিবারই হচ্ছে কল্যাণকর সমাজের ভিত্তি।
শিশুরা আদর্শবান হয়ে গড়ে ওঠে পরিবারের শিক্ষা থেকে। এজন্য সন্তানকে আল্লাহ-ভীতি, পরকালীন জবাবদিহিতা, মানবিক দায়িত্ব-কর্তব্য, আল্লাহর হক-বান্দার হক, পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতার পাঠ শেখাতে হবে। তার আগে নিজেদেরকে এগুলো মেনে চলতে হবে। তবেই শিশুরা আমাদেরকে অনুসরণ, অনুকরণ করবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে চিরচেনা পরিবার প্রথা একরকম বিলুপ্তির পথে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবার উঠে গিয়ে এখন হয়েছে অণু-পরিবার, ফ্ল্যাট কালচার। তার থেকেও খারাপ আকার নিয়েছে লিভ টুগেদার, সিঙ্গেল মাদার ইত্যাদি অভিশপ্ত কনসেপ্ট। একে মানবিক ও সামাজিক বিপর্যয় বললে অত্যুক্তি হবে না। নৈতিক অবক্ষয় ও বিপর্যয় রোধে ইসলামের নিদান-বিধানের বিকল্প নেই। এ পথেই রয়েছে সুষ্ঠু সমাধান। তাই ইসলাম সর্বাগ্রে ব্যক্তির ইসলাহ বা সংশোধনে গুরুত্ব আরোপ করেছে।
পরিবারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল একটা শিশুকে সামাজিক করে গড়ে তোলা এবং ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন, ঈমান, আমল, আখলাক শিক্ষা দেওয়া। পরিবারের ধারা ও রীতিনীতির উপর ভিত্তি করে শিশুর মনোজগত তৈরী হয় এবং পরিবারে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও ইতিবাচক জীবনবোধ ও জীবনদর্শন গড়ে ওঠে। সুতরাং শিশুদের সুষম শিক্ষা দিতে পরিবার বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই
বাবা-মা তথা পরিবার হল পৃথিবীর পাঠশালা।
পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও স্নেহ-মায়া-মমতার বন্ধনে আবদ্ধ একটি পরিবার বহু হৃদয়ের সমষ্টি, যেখানে আছে জীবনের প্রবাহ, আছে মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালবাসা, মিলেমিশে থাকার বাসনা, নিরাপত্তা, সহনশীলতা এবং পরস্পরকে গ্রহণ করার মানসিকতা, উন্মুক্ত চেতনা। পরিবারের মূল চাবিকাঠি থাকে পিতা-মাতা বা অভিভাবকের হাতে। আর অধিকাংশ অভিভাবকই চান তাদের সন্তান ভালো মনের ও ভাল মানের মানুষ হোক। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে সত্যিকার মানুষ হোক। তাই সর্বাঙ্গ-সুন্দর একটি পরিবার গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা বা গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পরিবারের সদস্যরা যখন আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন থাকবে, পরিবারে সবার মাঝে সুসম্পর্কের কারণে আল্লাহর রহমত, অনুগ্রহ-অনুকম্পা বর্ষিত হতে থাকবে। আর আল্লাহর রহমত, বরকত হলে সেই পরিবার হয়ে উঠবে যথার্থই আদর্শ। ইসলাম নির্দেশিত পারিবারিক জীবন হল আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিয়ামত বা অনুগ্রহ। মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত পারিবারিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হলে সমাজ থেকে যৌন হেনস্থা, শ্লীলতাহানি, পরকীয়া, লিভটুগেদার, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, ধর্ষণ-অপহরণ, সমকামিতা, অবাধ যৌনতা-সহ সকল প্রকার অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড নির্মূল হবে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই নিয়ে নীরবে অশ্রুপাতের মতো দুঃসহ বা অভিশপ্ত জীবনযন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলবে। তাই একটি সুন্দর ও আদর্শ পরিবার গঠনের লক্ষ্যে ইসলামের নির্দেশাত্মক নীতিমালা মেনে চলা মুসলমানের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।
পরিবার হল আত্মিক সম্পর্কের আঁতুড়ঘর। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গড়ে ওঠে স্নেহ মমতা, ভালবাসা, সৌহার্দ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন। অবশ্য সুপ্রাচীন কাল থেকে যে যৌথ পরিবারের অখণ্ড চিত্র আমাদের সামনে ছিল, এখন তা অনেকটাই ম্লান। শহরের মানচিত্র থেকে অনেক আগেই বিলীন হয়েছে যৌথ পরিবারের চলচিত্র। আগে গ্রামাঞ্চলে কিছু একান্নবর্তী পরিবার দেখা গেলেও এখন তা বিলুপ্ত প্রায়।
পরিবার মানে দাদা-দাদী, আব্বা-মা, চাচা-চাচি, ভাই-বোন, সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলা। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, আমরা যেন এই চিরাচরিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছি। যেন ক্রমেই স্বামী-স্ত্রী-সন্তান বা ‘হাম দো, হামারা এক’ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ বা গণ্ডীবদ্ধ করে ফেলছি পরিবারকে। সেখানে মা-বাবা কিংবা দাদা-দাদীর ঠাঁই হচ্ছে না। জন্মদাতা মা-বাবাকে হয়ত নিঃসঙ্গ-অসহায় জীবন কাটাতে হচ্ছে গ্রামের বাড়ি কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে।
সবশেষে বলি, সুস্থ ও পুষ্ট সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবারের বিকল্প নেই। গৃহ বা পরিবার থেকে মানুষ যে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ অর্জন করে, তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং একে পুরো জীবনের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহ তথা মানবজাতিকে সুন্দর, সুসংহত, সমুন্নত ও সুষম পরিবার গঠনের লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরে কুরআন-হাদিসের সুমহান আদর্শকে বাস্তবায়িত করার তাওফিক দান করুন, আমিন।








