বিশ্বজুড়েই ইসরাইলের অশনি সংকেত
মুনশি মুহা. উবাইদুল্লাহ
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় নতুন এক অধ্যায় যোগ করল কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরাইলের হামলা। গত ৯ সেপ্টেম্বর দোহা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। লক্ষ্যবস্তু ছিল হামাসের শীর্ষ নেতারা, যারা আমেরিকার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। কিন্তু এই হামলা শুধু একটি রাজনৈতিক আলোচনা নস্যাৎ করেনি; বরং সমগ্র বিশ্বকে যেন প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় একতরফা ইসরাইলি যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৬৫ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। আন্তর্জাতিক মহল একে ‘পরিকল্পনা মাফিক গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তবে এরই মাঝে আচমকা কাতারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এবার এই হামলা দখলকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে নয়; বরং স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ কাতারে।
যুদ্ধবিরতি বনাম ইসরাইলের নীতি:
ইসরাইলের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতির ধারণা তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে খাপ খায় না। আমেরিকার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রও যখন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়, তখনও ইসরাইল তাতে কান দেয় না। কারণ, ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটা টিকে আছে জবরদখল, নিপীড়ন, আগ্রাসন এবং ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করতে পাশবিক, বর্বরোচিত ও নৃশংস হামলার ওপর। ফলে দোহায় হামলা শুধু কাতার নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এতদিন ইসরাইলকে ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ বলা হলেও এখন অনেকেই বুঝতে পারছে, এই অবৈধ রাষ্ট্র কূটনৈতিক শিষ্টাচার বা আন্তর্জাতিক আইন মানতে মোটেই বাধ্য নয়।
পশ্চিমাদের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া:
কাতারে হামলার পর প্রথম বারের মতো ব্রিটেন, ফ্রান্স এমনকি ভারতও প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছে। গাজা গণহত্যায় নীরব থাকা এই দেশগুলো হঠাৎই মুখ খুলল। প্রশ্ন জাগে, গাজায় হাজারো নারী-শিশুর মৃত্যুর চেয়ে কাতারে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তাদের কাছে নৈতিকভাবে বেশি ভয়াবহ, নাকি তারা এবার টের পাচ্ছে, ইসরাইলের আগ্রাসন তাদের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে? এখানেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভণ্ডামি প্রকট হয়ে ওঠে। গাজার অগণিত লাশ তাদের বিবেককে নাড়া দেয়নি; কিন্তু কাতারে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলাই তাদের কাছে ‘লাল দাগ’ হয়ে দাঁড়াল। অর্থাৎ বার্তাটা পরিষ্কার, ইসরাইল আর চাইলেই যত্রতত্র হামলা চালাতে পারবে না।
ওয়াশিংটনের দ্বিমুখী অবস্থান:
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট কাতারে ইসরাইলি হামলার নিন্দা জানালেও সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘হামাসকে নির্মূল করাই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।’ এতে পরিষ্কার বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের মূল কৌশলকে সমর্থন করে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাতারকে আশ্বস্ত করেছেন, এমন হামলা আর হবে না। কিন্তু বাস্তবে তিনি ইসরাইলের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণই রাখতে পারছেন না। অথবা ভিতরে ভিতরে ইসরাইলকে উসকাচ্ছেন, আর বাইরে থেকে ইসরাইলি হামলার শিকার দেশগুলোকে মিথ্যা আশ্বাস বা সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ইসরাইল এখন নিজস্ব কৌশলে শুধু প্রতিবেশী নয়, দূরবর্তী রাষ্ট্রেও হামলা চালাচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটনের আশ্বাস কাতারের জন্য কার্যত ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু নয়।
লম্বা হাত নীতি ও নেতানিয়াহুর হুমকি:
ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল ক্যাটজ প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘ইসরাইলের দীর্ঘ লম্বা হাত শত্রুদের যে কোনো জায়গায় আঘাত করবে।’ একই সুরে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কাতারকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘যেসব দেশ সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়, তারা যদি তাদের হস্তান্তর না করে, তবে ইসরাইল নিজেই ব্যবস্থা নেবে।’ অর্থাৎ ‘সন্ত্রাসী’ কাকে বলা হবে, তা নির্ধারণের অধিকারও ইসরাইল নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে তারা নিজস্ব সংজ্ঞায় সন্ত্রাস নির্মূলের অজুহাতে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে। অথচ নিজেরাই বিশ্বের সবথেকে বড় সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র।
ছয় দেশে হামলার নজির:
মাত্র ৭২ ঘণ্টায় ইসরাইল অন্তত আশপাশের ৬টি দেশে হামলা চালিয়েছে। ফিলিস্তিন ও কাতারের পাশাপাশি লেবানন, সিরিয়া, তিউনিসিয়া এবং ইয়েমেনকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। ফলে কার্যত পুরো মধ্যপ্রাচ্যই পরিণত হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে।
বিশ্বযুদ্ধের ছায়া:
কুখ্যাত ইসরাইলি গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’ আগে ইউরোপেও ফিলিস্তিনিদের টার্গেট করেছে। কিন্তু গাজায় পূর্ণাঙ্গ গণহত্যার পাশাপাশি বিদেশেও নতুন হামলার মাধ্যমে ইসরাইল এক ঢিলে দুই লক্ষ্য পূরণ করছে। প্রথমত- নিজেদের জনগণের কাছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত তৈরি এবং দ্বিতীয়ত- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধের দায় আড়াল করা। প্রশ্ন হল, ইসরাইলের এই ‘দীর্ঘ লম্বা হাত’ থেকে কেউ কি নিরাপদ? আর কতদিন তারা আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে একের পর এক আগ্রাসন চালিয়ে যাবে? দোহা হামলার মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, ইসরাইল কেবল ফিলিস্তিন নয়, গোটা বিশ্বকেই যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে। এটি যেন এতদিনের অঘোষিত সত্যকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। তাই যদি এখনই অবিলম্বে ইসরাইলকে লাগাম না দেওয়া হয়, তবে পরবর্তী লক্ষ্য কে হবে, তা কেউই বলতে পারবে না। হয়ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণও হতে পারে এই ইসরাইল।








