খারেজী মাদ্রাসার বর্তমান অবস্থা, সমস্যা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার
ওবাইদুল্লাহ নূরী: মাদ্রাসা, ধর্মীয় এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি অবৈতনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে সাধারণত মুসলিম সমাজের দুস্থ পরিবারের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করে থাকে।
মাদ্রাসার নামকরণ: আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলোকে দুই নামে স্মরণ করা হয়। যথা, (এক) নিযামিয়্যাহ: উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা লক্ষৌ শহরের প্রখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ নিযামুদ্দিন সাহালভী’র প্রণীত সিলেবাসকে অনুসরণ করা হয়, তাই এই মাদ্রাসাগুলোকে ‘নিযামিয়্যাহ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। (দুই) খারেজী: ‘খারিজ’ আরবি শব্দ। এর অর্থ ‘বহির্ভূত’। যে সকল মাদ্রাসা সরকারি বোর্ডের, তথা অনুদান বা তত্ত্বাবধান বহির্ভূত; সেই সকল মাদ্রাসাকে খারেজী মাদ্রাসা বলা হয়।

xr:d:DAFjck5jq10:2,j:5091472413,t:23052010
খারেজী মাদ্রাসার সিলেবাস: খারেজী মাদ্রাসা মূলত একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষারও সমন্বয় করা হয়। মাদ্রাসার সিলেবাসে ইসলামী বিষয়সমূহের সঙ্গে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, কম্পিউটার ইত্যাদি শিক্ষা এবং প্রয়োজনে কারিগরি শিক্ষাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। অনেক খারেজী মাদ্রাসায় এমনভাবে পাঠ্যক্রম সাজানো হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করে পরবর্তীতে West Bengal Madrasah Education Board-এর কামিল (স্নাতক) বা অন্যান্য স্বীকৃত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেতে পারে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে খারেজী মাদ্রাসায় আরবি, উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রাজ্যের স্থানীয় ভাষাও পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকে। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ খারেজী মাদ্রাসায় নিয়মিত বাংলা ভাষা পড়ানো হয়।
মাদ্রাসার সিলেবাসে বিভিন্ন ধরনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং চরিত্র গঠনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই সিলেবাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেভাবে উপকৃত হয়: কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও আরবি ভাষা-সহ ইসলামী জ্ঞানে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জনের সুযোগ পায়। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার স্বীকৃত স্নাতক (B.A. সমমান) বা অন্যান্য উচ্চশিক্ষার পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ লাভ করে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। আরবি, উর্দু, ইংরেজি এবং মাতৃভাষা-সহ একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

আবেদন: উল্লেখিত সিলেবাসের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের সব খারেজী মাদ্রাসায় সমানভাবে সম্ভব হয়নি। পরিকাঠামো, শিক্ষক, আর্থিক সামর্থ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন মাদ্রাসার মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেলে সকল মাদ্রাসায় সিলেবাসের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মান আরও সমতাভিত্তিক করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।
খারেজী মাদ্রাসার বিভাগসমূহ: সাধারণত খারেজী মাদ্রাসার তিনটি বিভাগ আছে। (১) মক্তব বিভাগ: এটা মাদ্রাসার প্রথম ধাপ। যে কেউ মাদ্রাসায় পড়তে চাইলে প্রথমে তাকে এই বিভাগেই ভর্তি হতে হয়। সময়সীমা প্রায় দুই থেকে তিন বছর। এই বিভাগের পড়াশোনার ব্যবস্থা সাধারণত গ্রামের মসজিদেই করা হয়। এই বিভাগকে সাজানো-গোছানো এবং উন্নত করার জন্য “শিশু মাদ্রাসা” নামে আলাদা প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। শিশু মাদ্রাসায় ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ে ছাত্র-ছাত্রীরা যেকোনো সরকারি স্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হয়। আর যারা মাদ্রাসায় পড়তে চায়, তারা সরাসরি খারেজী মাদ্রাসার দার্স বিভাগে ভর্তি হয়। (২) হিফয বিভাগ: যারা আল কুরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করতে চায়, তারাই মূলত এই বিভাগে ভর্তি হয়। এই বিভাগের সময়সীমা প্রায় পাঁচ বছর। ৩০ পারা কুরআন মুখস্থ সমাপ্ত করে কেউ কেউ সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়। আর যারা মাওলানা তথা ইসলামী শিক্ষায় পণ্ডিত হতে চায়, তারা খারেজী মাদ্রাসার দার্স বিভাগে ভর্তি হয়। ৩০ পারা কুরআন মুখস্থ করা ছাত্রদেরকে হাফিয বলা হয়। (৩) দার্স বিভাগ: এই বিভাগ হল ইসলামী শিক্ষার মূল পরিকাঠামো। মাওলানা ডিগ্রী বা ইসলামী শিক্ষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হলে এই বিভাগে সম্পূর্ণভাবে পড়তে হবে। এই বিভাগের সময়সীমা ৮ থেকে ১০ বছর। বিভাগটি কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। এই স্তরগুলি সম্পূর্ণ করতে পারলে ওই ছাত্রকে মাওলানা বা আরবিতে স্নাতক বলা যায়।
অন্যান্য বিভাগসমূহ: তিনটি বিশেষ বিভাগ ছাড়া আরো কিছু বিভাগ আছে। যেখানে বিভিন্ন বিষয়কে বিশেষভাবে পড়ানো হয়। এগুলি মূলত অনার্স কোর্স । যেমন- (ক) ইফতা: ইসলামী আইনের উপরে গবেষণামূলক পড়াশোনা। (খ) তাখাসসুস ফিল হাদীস: হাদীসের উপরে বিশেষ পড়াশোনা। (গ) কিরআত: শুদ্ধ পদ্ধতিতে কুরআন পড়ার বিশেষ কোর্স। অবশ্য পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে সকল মাদ্রাসায় উক্ত কোর্সগুলি করানো হয় না।
আবেদন: মাদ্রাসাগুলি নিজেদের সাধ্যমতো গঠনমূলক শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আজকাল সকল মাদ্রাসায় ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আধুনিক শিক্ষাও প্রদান করা হয়। বিশেষভাবে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হয়। খারেজী মাদ্রাসাগুলির আধুনিকীকরণের জন্য যেসব সময়োপযোগী সংস্কার প্রয়োজন: ক) প্রত্যেক মাদ্রাসাকে UDISE+ কোড প্রদান এবং পোর্টালে আনার ব্যবস্থা করা। খ) অন্যান্য রাজ্যের মতো এ রাজ্যেও ফারাগাতের বর্ষকে গ্র্যাজুয়েশনের মান দেওয়া। গ) মাদ্রাসার শিক্ষক মন্ডলীকে Teachers Training এর ব্যবস্থা করা। (চলবে)








