মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি জাতীয় কংগ্রেসে ফিরতে চান…
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিচ্ছেদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন। অনেক নেতা দল ছেড়েছেন। আবার অনেকেই সময়ের প্রয়োজনে পুরনো রাজনৈতিক আশ্রয়ে ফিরে গিয়েছেন। সেই কারণেই মাঝে মাঝে একটি প্রশ্ন জনপরিসরে ফিরে আসে। যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও কংগ্রেসে ফিরতে চান, তাহলে কংগ্রেস কি তাঁকে গ্রহণ করবে? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভারতীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তিত চরিত্র। লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক দলের বিবর্তনের ইতিহাস। লুকিয়ে আছে ক্ষমতা ও আদর্শের জটিল সম্পর্ক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের শুরু কংগ্রেসে। দীর্ঘ সময় তিনি কংগ্রেসের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে তিনি নতুন দল গঠন করেন। সেই দল পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। আজ তৃণমূল কংগ্রেস শুধু একটি আঞ্চলিক দল নয়; এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নকে শুধু ব্যক্তি মমতার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এখানে একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। কারণ, তিনি আর কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যাওয়া কোনও সাধারণ নেতা নন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রধান মুখ। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দল পশ্চিমবঙ্গে টানা দেড় দশক ক্ষমতায় ছিল। ফলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দলীয় ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণও বিবেচনায় নিতে হবে।

ভারতের রাজনীতিতে কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ জন্মগত অধিকার নয়। আবার কোনও রাজনৈতিক দলও কাউকে গ্রহণ করতে বাধ্য নয়। রাজনৈতিক দল একটি সংগঠন। তার নিজস্ব কাঠামো রয়েছে। নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইলে কংগ্রেসে তাঁকে নিতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে কংগ্রেস কখনও তাঁকে নেবে না — এমন দাবিও বাস্তবসম্মত নয়। সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর। এখানে কংগ্রেসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ছিল প্রধান শক্তি। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই অবস্থান অনেকখানি দুর্বল হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়। এক সময়ের শক্তিশালী কংগ্রেস আজ রাজ্যে সীমিত প্রভাব নিয়ে রাজনীতি করছে। ফলে কোনও সম্ভাব্য পুনর্মিলনের প্রশ্নে দলকে ভাবতে হবে তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্বার্থের কথা। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। রাজ্যের বহু কংগ্রেস নেতা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম করে এসেছেন। বহু নির্বাচনে দুই দল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মীদের স্মৃতিতে সেই সংঘাত এখনও জীবন্ত। ফলে হঠাৎ কোনও বড় ধরনের সমঝোতা বা সংযুক্তির পরিবেশ পরিস্থিতি দেখা দিলে তা সংগঠনের ভেতরে নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে কর্মীদের মনোভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। আজ দেশের রাজনীতিতে দুটি প্রবণতা একসঙ্গে দেখা যায়। একদিকে জাতীয় দলগুলির প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা। অন্যদিকে, আঞ্চলিক দলগুলির শক্তিশালী উপস্থিতি। বহু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বা জাতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে জোট রাজনীতির প্রয়োজনীয়তাও ক্রমশ বেড়েছে। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন আর কেবল শত্রুতা কিংবা বন্ধুত্বের সরল সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়।
এই প্রেক্ষাপটে বিরোধী রাজনীতির কথাও আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন বিরোধী দল বহুবার এক মঞ্চে আসার চেষ্টা করেছে। গণতন্ত্রে এটি স্বাভাবিক। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের আদর্শ বজায় রেখেও নির্দিষ্ট ইস্যুতে সহযোগিতা করতে পারে। সংসদীয় ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল এই নমনীয়তা। তাই কোনও নেতা বা দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা মানেই আদর্শিক আত্মসমর্পণ নয়। আবার সমঝোতা না হওয়াও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। তবে রাজনৈতিক দলগুলির সামনে একটি বড় প্রশ্ন থাকে। সেটি হল আদর্শ ও বাস্তবতার ভারসাম্য। ভোটের অঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনও সিদ্ধান্ত যদি স্বল্পমেয়াদে লাভজনক হয়; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দলের পরিচিতি ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে তা দলের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই রাজনৈতিক দলগুলি সাধারণত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বহু দিক বিবেচনা করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা এবং সাংগঠনিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আজ বহু মানুষের কাছে এক স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। ফলে তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে ব্যক্তিগত ইচ্ছার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং সাংগঠনিক বাস্তবতা ও বাধ্যবাধকতা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই পরিবর্তনের সাক্ষী। একসময় কংগ্রেস ছিল প্রধান শক্তি। পরে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। এই পরিবর্তন দেখায়, রাজনীতিতে কোনও অবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। পুরনো সমীকরণ ভেঙেও যায়। তাই রাজনীতিকে বলা হয়, সম্ভাবনাময় শিল্প। অতএব, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক নয়।

তবে গণতন্ত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যক্তি নয়; প্রতিষ্ঠান। কোনও নেতা যত জনপ্রিয়ই হোন না কেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়। দলীয় কাঠামো এবং সাংগঠনিক ঐকমত্য গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল শক্তি। সেই কারণে কোনও সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার আলোকে দেখা উচিত। আজকের ভারতে রাজনীতির সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, কৃষি সংকট, সামাজিক সম্প্রীতি। এই প্রশ্নগুলি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে রাজনৈতিক দলগুলির কাছে মানুষ মূলত সমাধান চায়। তারা চায় উন্নত শাসন, চায় জবাবদিহি, চায় স্বচ্ছতা। দলবদল কিংবা জোটের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কখনও জনজীবনের মৌলিক সমস্যার বিকল্প হতে পারে না। এই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নকে রাজনৈতিক কৌতূহলের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। এটি আসলে ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তনশীল চরিত্র নিয়ে আলোচনার একটি উপলক্ষ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রে কোনও সম্পর্ক স্থায়ী নয়, কোনও দূরত্বও স্থায়ী নয়। পরিবর্তনই রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, প্রশ্নটি আজ বাস্তবের চেয়ে বেশি তাত্ত্বিক। কারণ, এমন কোনও পরিস্থিতি বর্তমানে দৃশ্যমান নয়, যেখানে এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে সামনে আসতে পারে। তবু প্রশ্নটির গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, এর মাধ্যমে আমরা রাজনৈতিক দলগুলির চরিত্র বুঝতে পারি। বুঝতে পারি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যপ্রণালী। বুঝতে পারি ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক। আর সেই বোঝাপড়াই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে মূল্যবান দলিল হয়ে থাকে।








