সংবাদমাধ্যম কি সত্যিই নিরপেক্ষ, নাকি পক্ষপাতদুষ্ট?
রফিকুল হাসান: একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে সংবাদমাধ্যম শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি জনমত গঠনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। একটি সংবাদ, একটি ছবি, একটি শিরোনাম কিংবা একটি শব্দ কোটি কোটি মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সংবাদ মাধ্যমের নিরপেক্ষতা শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতাও। কিন্তু বাস্তবতা হল, বিশ্বের বহু মুসলিমের মনে আজ এ প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম কি সত্যিই নিরপেক্ষ, নাকি মুসলিমদের ক্ষেত্রে এক ধরনের আলাদা মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়? গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক সংবাদ পরিবেশনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটি এমনভাবে মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে, অনেক মানুষের অবচেতন মনেও ‘মুসলিম মানেই সম্ভাব্য সন্ত্রাসী’ — এমন একটি ধারণা গড়ে উঠেছে। এই ধারণা রাতারাতি তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট ভাষা, নির্দিষ্ট উপস্থাপনা এবং নির্বাচিত সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যখন কোনো হামলাকারীর নাম মুসলিম পরিচয়ের ইঙ্গিত দেয়, তখন সংবাদের শুরুতেই তার ধর্মীয় পরিচয় সামনে নিয়ে আসা হয়। ‘ইসলামিক জঙ্গি’, ‘মুসলিম উগ্রবাদী’, ‘জিহাদি হামলাকারী’ — এ ধরনের শব্দ দ্রুত শিরোনামে স্থান পায়। কিন্তু একই ধরনের হামলা যখন কোনো অমুসলিম ব্যক্তি করে, তখন প্রায়শই তার ধর্মীয় পরিচয় সংবাদ থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেখানে আলোচনার বিষয় হয় তার মানসিক অবস্থা, ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা সামাজিক পটভূমি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা যায় যখন পশ্চিমা কোনো শ্বেতাঙ্গ বা অমুসলিম ব্যক্তি বন্দুক হামলা চালিয়ে বহু নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তখন তাকে ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত না করে, প্রায়শই ‘লোন উলফ’ বা একাকী নেকড়ে হিসেবে বর্ণনা করে। এমনকি ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডে দুটি মসজিদে যখন এক শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৫০ জনেরও বেশি নামাযরত মুসলিমকে হত্যা করল, তখনো অনেক বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তার অপরাধের চেয়ে তার শৈশব, মানসিক অবসাদ এবং একাকী জীবনকে সংবাদের মূল বিষয়বস্তু করে তোলার চেষ্টা করেছিল।
প্রশ্ন হল, যদি অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় মুসলিম হলে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে অন্যদের ক্ষেত্রে কেন নয়? সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালা কি সবার জন্য সমান হওয়া উচিত নয়? আসলে সমস্যাটি শুধু সংবাদে ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের মনোজগতে। যখন বছরের পর বছর ধরে মুসলিমদের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি বারবার উচ্চারিত হয়, তখন একটি পুরো সম্প্রদায় সম্পর্কে ভয়, সন্দেহ, বিদ্বেষ এবং নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। একজন সাধারণ মুসলিম, যার সঙ্গে সহিংসতার কোনো সম্পর্ক নেই, তাকেও কখনো কখনো সেই নেতিবাচক ধারণার বোঝা বহন করতে হয়। বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ, বৈষম্য এবং সামাজিক বঞ্চনার পিছনে এই নেতিবাচক প্রচারণার প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ, মানুষ যা দেখে, যা শোনে এবং যা বারবার পড়ে, সেটাই ধীরে ধীরে তার বিশ্বাসে পরিণত হয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সংবাদমাধ্যমের নীরবতা। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন, দখলদারিত্ব, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও সব সময় তা সমান গুরুত্ব পায় না। কোথাও হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছে, কোথাও শিশুদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে, কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষ নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, কিন্তু অনেক সময় এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদপ্রবাহে সীমিত জায়গা পায়। অন্যদিকে, কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে টানা বিশেষ প্রচার চলে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়, যেন কিছু মানুষের জীবন অন্যদের তুলনায় বেশি মূল্যবান। অথচ মানবাধিকারের মৌলিক শিক্ষা হল, সব মানুষের জীবন সমান মর্যাদাসম্পন্ন।

সমস্যার আরেকটি দিক হল রাজনৈতিক প্রভাব। বড় বড় আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো প্রায়ই এমন দেশ বা অঞ্চলে কাজ করে, যেখানে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকে। ফলে অনেক সময় সংবাদ পরিবেশনের ভাষা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে সেই প্রভাব পরোক্ষভাবে কাজ করে। এর ফলাফল হিসেবে কিছু সংঘাতকে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলা হয়, আবার অন্য কিছু সংঘাতকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই ধরনের কর্মকাণ্ড ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় পায়, নির্ভর করে কারা তা করছে এবং কারা তার শিকার হচ্ছে। এখানে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সত্যের। কারণ, সংবাদ যখন সম্পূর্ণ বাস্তবতার পরিবর্তে নির্বাচিত বাস্তবতা তুলে ধরে, তখন মানুষ ঘটনাকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে পারে না। তারা একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ইসলাম পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। বিশ্বের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ এই ধর্মের অনুসারী। তাদের মধ্যে অধিকাংশই সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, গবেষক এবং সমাজের নানা স্তরের নাগরিক। তাদের জীবন, সংগ্রাম এবং অবদানকে উপেক্ষা করে যদি কয়েকজন অপরাধীর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো মুসলিম সমাজকে বিচার করা হয়, তবে তা শুধু অন্যায়ই নয়; বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও অসৎ অবস্থান।
একজন মুসলিমের অপরাধ ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করে না, যেমন একজন খ্রিস্টানের অপরাধ খ্রিস্টধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করে না, একজন হিন্দুর অপরাধ হিন্দুধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করে না, কিংবা একজন ইহুদির অপরাধ ইহুদি ধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করে না। সভ্য সমাজে ব্যক্তির অপরাধের দায় ব্যক্তির ওপরই বর্তায়। সংবাদমাধ্যম যদি সত্যিই মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে চায়, তবে তাদের উচিত সব ধরনের সহিংসতা, দখলদারিত্ব, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সমানভাবে কথা বলা। কোনো নিরপরাধ মানুষ নিহত হলে তার ধর্মীয় পরিচয় নয়; তার মানবিক পরিচয়ই হওয়া উচিত প্রধান বিষয়। আজকের পৃথিবীতে মুসলিমদের প্রয়োজন ন্যায়বিচার, বিশেষ সুবিধা নয়, প্রয়োজন সমান মানদণ্ড, পক্ষপাত নয়, প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠ সংবাদ, নির্বাচিত সংবাদ নয়। কারণ সত্যকে ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভাগ করা যায় না। যেদিন সংবাদমাধ্যম প্রত্যেক মানুষের অশ্রুকে সমান গুরুত্ব দেবে, প্রতিটা রক্তপাতকে সমানভাবে দেখবে এবং প্রতিটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একই সাহস নিয়ে কথা বলবে, সেদিনই তারা প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষতার দাবিদার হতে পারবে। তার আগে এ প্রশ্ন থেকেই যাবে — সংবাদমাধ্যম কি সত্যিই নিরপেক্ষ, নাকি কিছু ক্ষেত্রে তারা সচেতনভাবে এক পক্ষের ভাষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সত্যকে দীর্ঘদিন চেপে রাখা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। আর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা ক্ষমতার নয়, সত্যের পাশে দাঁড়ায়।








