নজরুলের জন্মদিন: আর কতকাল সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবে বাঙালি?
আব্বাস উদ্দিন শেখ: হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির যদি একটি তালিকা তৈরি করা যায়, তাহলে তার প্রথম দিকে থাকবে রবীন্দ্র-নজরুলের নাম। রবীন্দ্রনাথের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এবং সমান শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের নাম। বাণীর বরপুত্র বৈচিত্রের লীলাদূত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও ছিলেন যৌবনের জয়গীতির নকিব। অজস্র গান, কবিতা, শ্যামাসংগীত ও বাংলা গজলের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি সম্ভার দিয়েই তিনি বাংলার সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল — দুই কবির বয়সের ব্যবধান ছিল অনেকটাই। তথাপি দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধার, বন্ধুত্বের, স্নেহের, প্রশ্রয়ের এবং নির্ভরতার। কবিগুরুর প্রশ্রয়কে নজরুল আশীর্বাদ মনে করতেন। আবার কবি নজরুলের জীবনের যে কোন সমস্যায় কবিগুরু পরম আত্মীয়ের মতো উদ্বিগ্ন হতেন। নজরুল ইসলাম জেলে থাকাকালীন সময়ে অনশন শুরু করলে কবিগুরু উদ্বিগ্ন হয়েছেন, টেলিগ্রাম লিখেছেন,“Give up hunger strike, our literature claims you.” অর্থাৎ “অনশন ত্যাগ করো, আমাদের সাহিত্য তোমাকে দাবি করে।”রবীন্দ্রনাথের এই বার্তা নজরুলের প্রতি গভীর স্নেহ ও উদ্বেগের প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরিবারের বাইরে প্রথম নিজের কোন গ্রন্থকে তিনি নজরুলের নামে উৎসর্গ করেছেন। নজরুল প্রীত হয়েছেন, আনন্দিত হয়েছেন, ধন্য হয়েছেন। আবার তিনিও পরম শ্রদ্ধায় গুরুদেবকে উৎসর্গ করেছেন নিজের গ্রন্থ। এহেন ব্যক্তিত্বের জন্মদিন নিয়ে আজও একবিংশের এই প্রযুক্তি নির্ভরতার যুগেও কেন আমরা বাঙালিরা বহুধাবিভক্ত? কেউ বলেন ২৪শে মে, কেউ বলেন ২৫শে মে, আবার কেউ বলেন ১১ই জ্যৈষ্ঠে জন্মেছিলেন কবি। কিন্তু আমরা একটু লক্ষ্য করলে দেখব, কবিগুরুর জন্মতারিখ ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ এবং সেই হিসাবে ইংরাজি ৭মে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ এবং প্রয়াণ দিবস ২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ, ইংরাজি হিসাবে ৭ই আগস্ট ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ। বাংলা এবং ইংরেজি সন-তারিখ অনুযায়ী দুটি করে তারিখ আমাদের সম্মুখে আসে; তথাপি আমরা কবিগুরুর জন্ম-মৃত্যু তারিখ হিসেবে ২৫শে বৈশাখ এবং ২২শে শ্রাবণকেই মনের মনিকোঠায় ধারণ করে আসছি।

এই দুটি দিন, এই দুটি তারিখই আমাদের ভাবনার সমুদ্রে লীন হয়ে গেছে। আমরা আলাদাভাবেই ২৫শে বৈশাখ বা ২২শে শ্রাবণ বলতে আর কিছু বুঝি না। এই দুটি তারিখ এলে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের জন্ম-মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৭ই মে বা ৭ই আগস্ট — কোন বিতর্কে না গিয়ে চোখ বন্ধ করে জন্মদিনের ক্ষেত্রে ২৫শে বৈশাখ এবং প্রয়াণ দিবসের ক্ষেত্রে ২২শে শ্রাবণকে আমরা পালন করি। গর্ববোধ করি। কিন্তু নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে আমার কনফিউস হয়ে যাই ১১ই জ্যৈষ্ঠ, নাকি ২৪শে মে! আমরা কি আর কোন দিন ঠিক করে উঠতে পারব, নজরুল ইসলামের জন্মদিন হিসাবে পালনের দিন কোনটি? ২৪শে মে, না কি ১১ই জ্যৈষ্ঠ। আমরা কেন এটুকু সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি না, ২৫শে বৈশাখ কবিগুরুর আবির্ভাব হলে ১১ই জ্যৈষ্ঠ বিদ্রোহী কবি নজরুলের জন্মতিথি। প্রতিবার কেন ভুলে যাই, প্রতিবারই দ্বিধাগ্রস্ত হই, ঠিক-ভুলের প্রশ্ন নয়; বাংলার এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের জন্ম, একজন বিদগ্ধ বাঙালি মনীষার আবির্ভাব-তিথি আমরা কি বাংলা বর্ষের হিসাবে পালন করতে পারি না? অসুবিধা কোথায়? ২৪শে পালন করার সুবিধা কী? আর ১১ই জ্যৈষ্ঠ পালনের অসুবিধাই বা কোথায়?
নজরুলের চেতনা হোক আমাদের প্রেরণা। তাঁর ভাবনার পথ হোক আমাদের অদৃষ্ট। আজ ১১ই জ্যৈষ্ঠ। আজই কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। তিনি বাঙালির কবি, বাংলার কবি, বাংলা ভাষার কবি। তাই বাংলা তারিখেই পালিত হোক তার জন্ম দিবস।








