কুরবানির রাজনীতি: যখন গরুকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে, আর আদর্শ হারিয়ে যায়
রফিক আনোয়ার: দক্ষিণ এশিয়ায় গরু কখনোই শুধুমাত্র একটি প্রাণী ছিল না; এটি অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আবেগ আর রাজনৈতিক পরিচয়ের এক জটিল প্রতীক। ফলে কুরবানির সময় গরুকে ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিতর্ক এমন মাত্রা পেয়েছে যে, কুরবানির মূল আত্মিক দর্শনই যেন আড়ালে চলে যাচ্ছে। ইসলামী ঐতিহ্যে কুরবানির কেন্দ্রবিন্দু ছিল না ‘গরু’। ছিল ত্যাগ। ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনার শক্তি নিহিত ছিল তাঁর আত্মসমর্পণে — নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটিও স্রষ্টার নির্দেশে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতিতে। সেখানে পশু ছিল প্রতীক; উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ভেতরের অহং, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে কাটছাঁট করা। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই প্রতীকই যেন উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। এখন কুরবানির আলোচনা শুরু হয় পশুর দাম দিয়ে, শেষ হয় পশুর আকারে। ‘কার গরু বড়’, ‘কত লাখ টাকা’, ‘কোন জাত’ — এসব প্রশ্ন সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। সমাজমাধ্যম সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। কুরবানি ক্রমশ স্পিরিচুয়াল অ্যাক্ট বা ধর্মীয় কাজ থেকে পাবলিক স্পেক্টাকল বা লোকদেখানো কাজে পরিণত হচ্ছে। অথচ ধর্মীয় ভাষ্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না পশুর মাংস বা রক্ত; পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া।
অন্যদিকে, গরুকে কেন্দ্র করে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ধর্মীয় অনুভূতির জায়গা থেকে নয়; বরং পরিচয়ের সংঘাতে গরুকে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। ফলে কুরবানি একটি ধর্মীয় আচার কম, ‘আমরা বনাম তারা’ জাতীয় শক্তির প্রদর্শন বেশি হয়ে উঠছে। এতে শুধু সামাজিক উত্তেজনাই বাড়ে না; ধর্মের নৈতিক সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে দায় একতরফা নয়। মুসলিম সমাজের ভেতরেও আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। কুরবানির আসল চেতনা যদি ত্যাগ হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে — আমরা কি কেবল রিচুয়াল বা লোকাচার পালন করছি, নাকি সত্যিই কিছু ত্যাগ করছি? যে সমাজে দুর্নীতি, বৈষম্য, অহংকার ও ভোগবাদ বাড়ছে, সেখানে শুধু পশু জবাই করলেই কি কুরবানির উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়?
কুরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সামাজিক ন্যায় ও বণ্টন। দরিদ্রের ঘরে মাংস পৌঁছানো, আত্মীয়তা ও প্রতিবেশী সম্পর্ক দৃঢ় করা — এসব ছিল এর সামাজিক তাৎপর্য। কিন্তু বর্তমান বিতর্কে সেই মানবিক দিক প্রায় গরহাজির। মিডিয়াও সাধারণত সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও নিষেধাজ্ঞাকেই শিরোনাম বানায়; নীরবে সম্পন্ন হওয়া লাখো মানবিক বণ্টনের গল্প সামনে আসে না। বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় অধিকার ও সামাজিক সংবেদনশীলতার মধ্যে টানাপড়েন থাকবেই। কিন্তু তা যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের বদলে রাজনৈতিক মেরুকরণে পরিণত হয়, তাহলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, তখন ধর্ম আর আত্মিক অনুশীলন থাকে না; তা পরিচয়ের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। কুরবানির মূল শিক্ষা সম্ভবত এখানেই নতুন করে স্মরণ করা দরকার। মানুষ শুধুমাত্র পশু জবাই করে না, নিজের ভেতরের নিষ্ঠুরতা, অহংকার ও লোভকেও জবাই করার চেষ্টা করে। গরুকে কেন্দ্র করে যদি ঘৃণা, প্রদর্শন বা ক্ষমতার প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়, তাহলে কুরবানির বাহ্যিক রূপ হয়ত থাকে, কিন্তু তার আদর্শ হারিয়ে যায়।








