এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: শিক্ষার নতুন বন্ধু, নতুন সহযাত্রী
ড. রেয়াজ আহমদ ও সাদ্দাম হোসেন
বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা শুধু তথ্য আহরণের বিষয় নয়, বরং তা হল প্রবেশাধিকার, সমতা ও সুযোগের প্রশ্ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) আজ সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। আগে যেখানে উচ্চশিক্ষা মানেই ছিল শহরের বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যয়বহুল কোর্স বা প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি ব্যবস্থা, সেখানে এখন প্রযুক্তির সহায়তায় গ্রামের ছাত্রও একই কোর্সে যুক্ত হতে পারছে অনলাইন মাধ্যমে। যেভাবে ChatGPT, Google Gemini, বা Microsoft Copilot-এর মতো এআই-টুল আজ গবেষণায় সহায়তা দিচ্ছে, ঠিক সেভাবেই তারা উচ্চশিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রবেশযোগ্য ও মানবিক করে তুলছে।
১) উচ্চশিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির নতুন সংজ্ঞা:
ভারতের মতো দেশে উচ্চশিক্ষা এখনও অনেকের নাগালের বাইরে। সমাজে এখনও এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন, যারা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, কিংবা ভাষাগত দুর্বলতার কারণে পিছিয়ে পড়েন। কিন্তু আজ এআই সেই বাধা ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU), নেতাজি সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটি (NSOU) বা MIB MOOC-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এআই-চালিত লার্নিং সিস্টেম ব্যবহার করছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষার্থীর শেখার ধরন বিশ্লেষণ করে তার উপযোগী ভিডিও, কনটেন্ট ও কুইজ সাজিয়ে দেয়। ফলে শহর-গ্রাম, ধনী-দরিদ্রের শিক্ষার বিভাজন ক্রমেই কমে আসছে।
২) এআই-চালিত শেখার সরঞ্জাম:
ব্যক্তিকৃত লার্নিং: যে শিক্ষার্থী দ্রুত বোঝে, তার জন্য দ্রুত গতির পাঠ; আর যে ধীরে বোঝে, তার জন্য ধীরে ব্যাখ্যা — এটা এখন সম্ভব এআই-এর মাধ্যমে। Coursera, Khan Academy কিংবা NPTEL-এর মতো প্ল্যাটফর্মে এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে।
প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ (NLP):
শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য Otter.ai বা Microsoft Translator তাৎক্ষণিকভাবে ক্লাসের কথাগুলো ক্যাপশন আকারে দেখায়। আবার ডিসলেক্সিয়াগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা টেক্সট-টু-স্পিচ টুলে পাঠ্য শুনে বুঝতে পারছেন।
ভাষান্তর সুবিধা: যে শিক্ষার্থী ইংরেজিতে দুর্বল, সে এখন Google Translate বা ChatGPT-এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অনুবাদ পেয়ে নিজের ভাষায় ক্লাসের বিষয় বুঝতে পারছে। ফলে ভাষা আর শিক্ষার প্রতিবন্ধক নয়।
অভিযোজিত মূল্যায়ন: এআই-চালিত পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর উত্তরের ভিত্তিতে প্রশ্নের ধরণ ও জটিলতা পরিবর্তিত হয়, ফলে পরীক্ষাটা এখন এক ধরনের ‘লার্নিং অভিজ্ঞতা’।
৩) প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন আলো:
একজন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এখন স্ক্রিন রিডারের সাহায্যে ক্লাসের নোট, রিসার্চ পেপার বা এমনকি ই-বুকও শুনতে পারেন। চলাচলে অক্ষম শিক্ষার্থী ভয়েস কমান্ডে কম্পিউটার চালাতে পারেন। অটিজম বা ADHD-তে আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা এআই অ্যাপের সাহায্যে সময় মেনে পড়াশোনা, নোট সাজানো, এমনকি মনোযোগ ধরে রাখার ট্রেনিংও নিতে পারছেন। উদাহরণস্বরূপ, Seeing AI অ্যাপ দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের জন্য ছবি, টেক্সট, এমনকি আশপাশের বস্তুও বর্ণনা করে শোনায়। এটি সত্যিই Inclusive Education-এর এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছে।

৪) ভর্তি ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনায় এআই-এর ভূমিকা:
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ভর্তি প্রক্রিয়াতেও এআই ব্যবহার করছে। প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স-এর মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কোন শিক্ষার্থী আর্থিক বা মানসিক সহায়তা পেলে ভাল করবে। ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট (যেমন Chatbot) শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া, স্কলারশিপ বা নথি সংক্রান্ত প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দিচ্ছে। ফলে ‘প্রথম প্রজন্মের কলেজ শিক্ষার্থী’ বা প্রান্তিক শিক্ষার্থীরাও একাডেমিক ব্যবস্থার ভেতরে আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে।
৫) প্রযুক্তির সঙ্গে নৈতিকতার ভারসাম্য:
যদিও এআই শিক্ষার পরিধি বাড়াচ্ছে, কিন্তু এর ব্যবহারেও কিছু ঝুঁকি আছে।
ডেটা প্রাইভেসি: শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য যেন অপব্যবহার না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত: যদি এআই-এর প্রশিক্ষণ ডেটা পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে তার ফলাফলও বৈষম্যমূলক হতে পারে।
মানবিক যোগাযোগের ঘাটতি: অতি-নির্ভরতা মানবিক স্পর্শ কমিয়ে দিতে পারে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার আত্মা।
সুতরাং, প্রযুক্তি যেন মানুষের বিকল্প বা প্রতিযোগী নয়; বরং সহযোগী হয় — এটি নিশ্চিত করাই শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করণীয়:
শিক্ষকদের এআই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের উপযোগীভাবে টুল ব্যবহার করতে পারেন। টুল তৈরির সময় প্রতিবন্ধী বা প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের পরামর্শ নেওয়া। পরীক্ষামূলকভাবে শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করা। সবচেয়ে বড় কথা হল, ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ দূর করতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সুবিধা দেওয়া।
এআই (AI) কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি ভবিষ্যতের শিক্ষার দার্শনিক দিকও নির্ধারণ করছে। যদি আমরা সচেতনভাবে ও নৈতিকভাবে এটি ব্যবহার করি, তবে এআই-ই হতে পারে সেই সেতুবন্ধন, যা ‘অবাধ জ্ঞানপ্রাপ্তির অধিকার’কে বাস্তবে রূপ দেবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এখন একটাই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া উচিত — আমরা কি এআই ব্যবহার করে ব্যবধান কমাব, নাকি আরও বাড়াব? উত্তর নির্ভর করছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কারণ প্রযুক্তি নয়, মনুষ্যত্বই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে — শিক্ষা সত্যিই সবার জন্য হচ্ছে কি না।
(লেখকদ্বয়: ড. রেয়াজ আহমদ: অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, এইচইউসি, আজমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত
সাদ্দাম হোসেন: সহকারী অধ্যাপক, গণমাধ্যম বিভাগ, নেতাজি নগর কলেজ, কলকাতা)।








