ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন সম্ভাবনা?
পাশারুল আলম
ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটি। বিগত এক শতাব্দী ধরে এই সংকটের সমাধানে একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তি, যুদ্ধবিরতি ও শান্তি পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে স্থায়ী শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধান আজও অধরা। ১৯১৬ সালের সাইকস–পিকট চুক্তি থেকে শুরু করে ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি এবং সম্প্রতি মিশরে শুরু হওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শান্তি আলোচনার উদ্যোগ — ইতিহাস এক ধরনের পুনরাবৃত্তির সাক্ষী।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: সাইকস-পিকট থেকে অসলো
ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্নের উৎপত্তি এক অর্থে ঔপনিবেশিক রাজনীতির পরিণতি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯১৬ সালে সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে অটোমান সাম্রাজ্যের আরব অঞ্চলগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। এই চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বা ভূখণ্ডগত অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল আরব বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার সূচনা বিন্দু।
কয়েক দশক পরে ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি শান্তির এক নতুন আশা জাগায়। ইসরাইল ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি স্বশাসনের পথ প্রশস্ত করা ও ইসরাইলি দখল হ্রাস করা। কিন্তু বাস্তবে জেরুজালেমের মর্যাদা, ইহুদি বসতি স্থাপন, শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও নিরাপত্তা ইস্যুতে মতপার্থক্যের কারণে চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। ইয়াসিন আরাফতের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগ: পুরনো চেহারায় নতুন মুখোশ?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় মিশরে শুরু হওয়া নতুন শান্তি আলোচনা অনেকের কাছে আবারও এক ধরনের শীর্ষ-নিম্নগামী প্রয়াস ও পুরনো চুক্তিগুলির মতন মনে হচ্ছে। এই আলোচনায় হামাস ও ইসরাইল সরাসরি উপস্থিত না থাকায় এটি মূলত বহিরাগত শক্তির দ্বারা পরিচালিত এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে সমস্ত মুসলিম বিশ্বকে যেমন যুক্ত করা হয়নি, তেমনি যেসব দেশ দুই বছরের যুদ্ধ বলুন বা জন-সংহার তাতে ইসরাইলকে সহায়তা করেছে, তাদের উপস্থিতি অনেকেই সন্দেহ করেছেন।
ট্রাম্পের পরিকল্পনার কয়েকটি মূল দিক:
১) গাজায় যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি, যার প্রথম পর্যায় শুরু হয়ে গেছে। কুড়িজন জীবিত জিম্মি মুক্তি পেয়েছে, অন্যদিকে বেশ কিছু আটক ফিলিস্তিনি মুক্তি পেয়েছে। পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল গঠনের কথা ঘোষণা হয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার, যার বৃহদাংশ মুসলিম দুনিয়ার। যদিও পশ্চিমা দেশের অর্থ থাকবে।
২) হামাসকে ভবিষ্যৎ শাসন থেকে বাদ দেওয়া সমস্যার সৃষ্টি করবে। গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতে রাখা অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। এর মধ্যে ভিতরের কোনো রহস্য জড়িয়ে আছে কিনা, সংশয় রয়েছে।
এই প্রস্তাবের মধ্যেই অতীতের চুক্তিগুলোর সঙ্গে মৌলিক সাদৃশ্য লুকিয়ে আছে। ফিলিস্তিনিদের সরাসরি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অভাব এবং শক্তির অমিলকে অক্ষত রাখা। যে ভাবে ইসরাইলের শক্তিকে বহাল রেখে এই চুক্তি করা হচ্ছে, তা ভবিষ্যত শান্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মৌলিক ইস্যুগুলো এখনো অমীমাংসিত:
ট্রাম্পের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, ফিলিস্তিন প্রশ্নের মূল রাজনৈতিক ও সার্বভৌম ইস্যুগুলোর স্পষ্ট সমাধানের অনুপস্থিতি। শুধুমাত্র সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে শান্তি স্থাপন করা কঠিন ব্যাপার হবে। জেরুজালেমের মর্যাদা এখনো ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্কের বিষয়। অথচ এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকা মূল বিবাদকে এড়িয়ে যাওয়ার সামিল। এছাড়া ইহুদি বসতি স্থাপন ও দখলদারিত্ব ইস্যুতে কোনো বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি নেই। একদিকে শান্তি চুক্তি, অন্যদিকে পশ্চিম তীরের চারশ সেটেলার বসতি বিষয়ে নীরব সমর্থন অশান্তির কারণ হিসাবে জিইয়ে রাখা হল।
শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের অধিকার প্রসঙ্গে পরিকল্পনাটি প্রায় নীরব। ১৯৪৮ সাল থেকে যেসব শরণার্থী ফিলিস্তিন ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের বিষয়ে কোনো ভূমিকা গ্রহণ না করা পুরনো সমস্যাকে বাঁচিয়ে রাখার নামান্তর। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে স্পষ্ট রূপরেখা অনুপস্থিত। আমেরিকা ও ছোট ছোট কয়েকটি দেশ ছাড়া প্রায় ১৬০টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে, অথচ চুক্তিতে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া আর যাই হোক, এটি স্থায়ী শান্তি আনতে পারবে বলে মনে হয় না। এই অবস্থায় আমেরিকার চাপে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলেও তা এক ‘দীর্ঘমেয়াদি অস্থির শান্তি’ তৈরি করবে, যা প্রকৃত ন্যায়ভিত্তিক শান্তি নয়।
শক্তির ভারসাম্যের অভাব:
১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই ফিলিস্তিনিরা সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে টরম অসাম্যের বাস্তবতায় বসবাস করছে। ইসরাইলের কাছে উন্নত সামরিক শক্তি, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং আঞ্চলিক প্রভাব রয়েছে; অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র পর্যন্ত নেই। ট্রাম্প পরিকল্পনায় ইসরাইলকে নিরাপত্তা রক্ষার নামে গাজার প্রায় অর্ধেক এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুমতি দেওয়া এই অসমতাকেই স্থায়ী করে তুলছে। যদিও আগামী দিনে বাফার জোনের ওপারে থাকবে — একথা বলা হলেও আগামীদিনে তা কোন দিকে যাবে বলা মুশকিল।
ভবিষ্যতের দিগন্ত: জটিল সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তা
এই পরিকল্পনার সফলতা বা ব্যর্থতা কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর নির্ভর করবে —
১) হামাসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা: হামাসকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে কোনো স্থায়ী শান্তি টেকসই হবে কি? এবিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। হামাস এবিষয়ে আগামী দিনে কী করবে, সে ব্যাপারেও সন্দেহ রয়েছে।
২) ফিলিস্তিনি জাতীয় ঐক্য: গাজা ও পশ্চিম তীরের রাজনৈতিক বিভক্তি দূর না হলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। শান্তি চুক্তি হচ্ছে, কিন্তু ফিলিস্তিনি জাতিসত্তাকে অস্বীকার করে চুক্তিতে অস্থায়ী শান্তি স্থাপন হলে স্থায়ী শান্তি সম্ভব কিনা, এবিষয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকে যায়।
৩) নিরাপত্তা বনাম স্বাধীনতা: ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার বা নিয়ন্ত্রণ হ্রাসের মাত্রা নির্ধারণেই আসল দ্বন্দ্ব নিহিত। বন্দী দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যে বিবাদ, সে ব্যাপারে কোনো পথ নির্দেশিকা নেই।
৪) আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা: বহিরাগত শক্তিগুলোর বাস্তবিক লক্ষ্য কি শান্তি, নাকি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার? এই চুক্তির মধ্যে কি ১৯১৬ সালের গোপন চুক্তির মতো কোনো গোপন পরিকল্পনা রয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন আধুরা থেকে যাবে। ফিলিস্তিন যদি ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আরো অশান্ত হয়ে উঠবে।
পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে — যখন ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ বহিরাগত শক্তি নির্ধারণ করে, তখনই সেই উদ্যোগ ব্যর্থতার পথে হাঁটে। সাইকস-পিকট চুক্তি এবং অসলো চুক্তির মতোই ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনাও ফিলিস্তিনি জনগণের পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত না করলে স্থায়ী শান্তি আনতে পারবে না।
এই অঞ্চলে প্রকৃত শান্তির একমাত্র ভিত্তি হতে পারে ইসরাইলি দখলদার নীতি বন্ধ করা। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার যে সমর্থন বিশ্ব দিয়েছে, তাকে যথার্থভাবে কার্যকর না করলে মূলে না গিয়ে ভুলের মধ্যে শান্তি খোঁজার আর একটি ব্যর্থ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। এর সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও সম্মানের ভিত্তিতে সহাবস্থানের জন্য একটি উপযুক্ত প্রস্তাব এই চুক্তির মধ্যে অন্যতম খামতি বলে মনে হয়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও তার সার্বভৌম অধিকার এবং ১৯৬৭ সালের রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব কার্যকর হলে শান্তির আশা করা যেতে পারে। আজকের এই শান্তি চুক্তিতে যা কোনো আলোচনার বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়নি। এতে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ আশা অপেক্ষা অধিক হতাশ হবেন। তবে সব কিছুর উপরে এই মুহূর্তে নর-সংহার বন্ধ হবে।








