হাসির কৈফিয়ত
হাসলে তো আর মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। গাছে তো ফলে না হাসি, হাসি কখনো হয় না বাসি।
গোমড়া মুখ নিপাত যাক, ইসমাইল পিলিজ জিন্দাবাদ। আজকাল পায়ে পা দিয়ে হাসানোর লোক কোথায়? পশু পাখি জন্তু জানোয়ারেরা কিন্তু সচরাচর হাসে না। হাসি কেবল আমাদেরই সহজাত অধিকার। যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে বংশ পরম্পরায় পেয়েছি। হাসিতে আমাদের নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম মৌরসিপাট্টা। হাসি ভ্যাট বা জিএসটি-ফ্রী হলেও ঠাট্টা, তামাশা, মস্করা, ইয়ার্কি সবারই দুর্ভিক্ষ চলছে।
তাই সরকার বাহাদুর যদি আইন করে “এক দেশ এক হাসি” চালু করে তাহলে নিদেনপক্ষে হাসি কখনো ডোডো পাখি হতে পারবে না। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে দৈনিক অন্তত আধ ঘন্টা হাসতে হবে — এই আইন লাগু হলে তবেই তো সবকা সাথ সাবকা বিকাশ হবে। গোটা দেশ কাতুকুতু বুড়োয় ছেয়ে যাবে। তবেই তো আচ্ছে দিন আসবে।
কুড়ের অমাবস্যা ভেতো বাঙালির সম্বল কেবল হিংসা আর ঈর্ষা। হাসি গজাবে কোত্থেকে। ফুরফুরে মেজাজে থাকলে তবে না হাসির উৎপত্তি হবে। বদ মেজাজী বা খিটখিটে হলে বড়জোর ঘুঁটে পুড়লে গোবর হাসবে। এখন যা দিনকাল পড়েছে, কাউকে হাসানোর জন্য আবদার করলে সে এমন ভাব করে যেন, “মরণ দশা ! এত কিছু থাকতে হাসতে যাব কোন দুঃখে!” সত্যিই তো হাসি না পেলে কি আর করা যাবে। কেউ আপনার ঘাড় কিংবা আঙ্গুল মটকে দেবে না। কেউ গলা টিপে ধরে হাসাবে না। কেউ বুকে পা তুলে দেবে না।
যাক এসব নিয়ে কেউ যেন ৫ কান করবেন না। দেওয়ালেরও কান আছে। তাই হাসতে যাদের মানা, তারা লক্ষীছানা। তাদের মাপা হাসি চাপা কান্না। তবে হাসি, হিসু আর পায়খানা
যদি বেদম পেয়ে যায়, কারো বাপের সাধ্য নেই চেপে রাখবে।
আগে হাসির কতরকম প্রকারভেদ ছিল। ফিচেল হাসি, অট্টহাসি, উলুটি পালুটি খাওয়া হাসি, দম ফাটা হাসি, দম বন্ধ করা হাসি, পেটে খিল ধরানো হাসি, লুটিয়ে পড়া হাসি ইত্যাদি প্রভৃতি। এখন তো হাসির ঐসব প্রজাতির বেশিরভাগই বিলুপ্ত প্রায়। অস্তিত্বের সংগ্রাম করে না মরে কোনো রকমে টিকে আছে মুচকি হাসি, গোঁফের আড়ালে হাসি আর হাইটেক ছেলফি হা…..সি।
এখন নেহাত প্রয়োজন না হলে কিংবা ভীমরতি না ধরলে কেউ হাসে না। তাও আবার পরিমিতি বোধ এবং কারণ ও ব্যাকরণ মেনে। ভিড়ের মাঝে বেমক্কা হেসে ফেলে কেউ লোক হাসাতে রাজি নয়। সব জায়গায় স্ট্যাটাস মেনটেন করতে হয়।
আগে উৎসব অনুষ্ঠান হলে রাশি রাশি হাসি হত। এখন অত হাসার সময় কার আছে? সিরিয়াস না থাকলে আনস্মার্ট দেখায়। কেউ দাম দেবে না, গুরুত্ব দেবে না, পাত্তা দেবে না। তাই নেমন্তন্ন রক্ষে করতে চটপট সাজুগুজু করে গটমট করে যায়, কটমট করে তাকায়। খাবার জন্য ছটফট করে। ভিড়ের মাঝেও একা হয়ে ঝটপট বেরিয়ে যায়। বাই উঠলে হয়ত কটক যাওয়া যায়, কিন্তু যত্রতত্র হাসা যায় না। স্থান, কাল, পাত্র, পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রেক্ষিত, প্রেক্ষাপট ইত্যাদি অনেককিছু বিবেচনায় রাখতে হয়। মা হওয়া যেমন মুখের কথা নয়, হাসিও তেমনি চাট্টিখানি কথা নয়। হাসতে হলে এলেম লাগে।
আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হয়। কখন হাসব, কার সামনে হাসব, কতখানি হাসব, কীভাবে হাসব, দর্শক শ্রোতা কারা, তারা কীভাবে নেবে, লোকে কী ভাববে, আমার বাড়ির লোক বরদাস্ত করবে কিনা, কত ডেসিবেলে কতখানি হাসলে কত ক্যালরি খরচ হবে, এরকম অযুত নিযুত খুঁটিনাটি বিষয় বিবেচনা করে হাসতে হয়। তার ওপর মূল কথা হল, কার অনুপ্রেরণায় হাসছি, জনে জনে সেই কৈফিয়ত দিতে হবে। এত ঝক্কি পোহানোর থেকে বরং তুপতাপ থাকাই বেটার দ্যান দা বেস্ট। বোবার শত্রু নেই। কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে না। কেউ শুধাবে না, হাসলে কেন জবাব দাও, জবাব তোমায় দিতেই হবে, নইলে পৃথিবীর গাড়ি থেকে নেমে যেতে হবে। তাছাড়া মরব তো একবারই, অত ভয় কীসের। হাসতে হাসতে মৃত্যু তো সবাই কামনা করে।








