মুসলমানদের নেতা কে?
ডা. সেখ বাসির আলি
নতুন পয়গাম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলা তথা দেশীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলমানদের নেতা কে? এ বিতর্ক আজকের নয়। ভোট এলেই বিষয়টি প্রাইম টাইমে চলে আসে। শুধু মুসলমানদের মধ্যে এই হীনতা কেন যে, তাদের নেতা কে? কেন এই প্রশ্ন ওঠে বারবার? হিন্দুদের মধ্যে তো এ বিতর্ক দেখা যায় না। দেখা যায় না খ্রীষ্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন-সহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যেও।
অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে যখন নেতা নিয়ে এমন চরম বিভ্রান্তি বিভেদ নেই, সেখানে মুসলমানদের মধ্যে রয়েছে কেন? যা বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। এই কেন-র কেঁচো খুঁড়তে গেলে কেউটে বেরিয়ে পড়বে। এই কেউটের সংখ্যা এতই বেশি যে (মুখ খুললে) ছোবল খেতেই হবে। তবুও কিছুটা রাখঢাক করেই বলছি। একটা জাতি অথবা সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্বের সঙ্কট তৈরি হয় মূলত দুটি কারণে। জাতিগতভাবে Demoralised হলে এবং নিজ নিজ Sect বা দল বা জামাতকে সর্বাগ্রে প্রধান্য দিলে। তাই কেউ এগিয়ে এলেই অন্যান্য দল বা জামাতের লোকেরা চেঁচিয়ে ওঠেন, উনি কি মুসলমানদের নেতা? আসলেই মুসলমানদের নেতা হতে গেলে কী কী Criteria লাগে, তা একজনও বলতে পারবেন না।
পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠী ৩০ শতাংশের আশপাশে হবে। নওশাদ, সিদ্দিকুল্লা, ঈশা খান, আব্বাস, সেলিম, ফিরহাদ, সওগাত, কামরুজ্জামান, হুমায়ূন, কাসেম, তায়েদুল, সারওয়ার, ইমতিয়াজ, ইমরানের মতো আরও অনেকেই অনেক সময় টাইম লাইনে এসেছেন, আবার ফিকে হয়ে গেছেন। কারণ একটাই, এরা কি সত্যিকার অর্থে মুসলমানদের নেতা? আসাদউদ্দিন ওয়েসি কি মুসলমানদের নেতা? উত্তর, এককথায় ‘না’। এনাদের কেউই মুসলমানদের নেতা নন।
তাহলে মুসলমানদের নেতা কে? আসলেই অধিকাংশ মুসলমানের মধ্যে নেতৃত্ব সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা নেই বললেই চলে। ফলে তাঁরা সহজেই অন্যের ফাঁদে পা দেন, অন্যের বুলি আওড়ান তোতা পাখির মতো। উপরে যাঁদের নাম উল্লেখ করেছি, তাঁদের কেউই নিজেকে মুসলমানদের নেতা বলে দাবি করেননি। মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই এদের কাউকেই নেতা বলে স্বীকৃতি দেননি। এরপরও নেতার প্রয়োজন পড়ছে কেন? মুসলমানরা বলতে পারবেন? পারবেন!
বাংলার নেতৃত্ব-শূন্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে এমন নির্বুদ্ধিতা ও বিভাজন কাম্য তো নয়ই; বরং আশ্চর্যের। সিদ্দিকুল্লাহ, কাসেম, ফিরহাদ, সওগাত, ইমরান, হুমায়ুন — এনারা তৃণমূলের নেতা বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মী। এরা কোন দিন নিজেদেরকে মুসলমানদের নেতা বলে দাবি করেননি। যদিও সিদ্দিকুল্লাহ হলেন জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ নামক দেওবন্দী ভাবধারার মুসলমানদের উলেমা সংগঠনের রাজ্য সভাপতি। তারপরও তিনি নিজেকে মুসলমানদের নেতা বলে দাবি করেননি। বরং তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
ঈশা খাঁন চৌধুরী কংগ্রেসের নেতা বা রাহুল গান্ধীর কর্মী। মুহাম্মদ সেলিম সিপিএম নেতা বা দলের কর্মী। এভাবে নওশাদ, আব্বাস, তায়েদুল, কামরুজ্জামান, ইমতিয়াজ, সারওয়ার প্রমুখ নিজ নিজ দল বা সংগঠনের নেতা বা কর্মী। তাহলে মুসলমানদের নেতার প্রয়োজন পড়ছে কেন? মুসলমানদের নেতা কোথায় পাওয়া যাবে?
অথচ মাত্র ৩ শতাংশ উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে নেতৃত্বের সঙ্কট নেই। তারা কোনদিন প্রশ্ন তোলেননি মমতা, শুভেন্দু, অধীর, শতরূপ, দিলীপ, অভিষেক, শমীকরা কি হিন্দুদের নেতা? বরং এরা সবাই তাদের নেতা। কাদের নেতা? সবার নেতা। কেউ মানল, আর না মানল, তাতে তাঁদের যায় আসে না। হিন্দুদের যখন হিন্দু নেতার প্রয়োজন পড়ছে না, মুসলমানদের তখন মুসলিম নেতার প্রয়োজন পড়ছে কেন?
আসলেই ফিরকাবাজির ধাঁধা, নেতাকেও তাদের ফিরকার মধ্য হতে হবে। এ এক চরম গোলক ধাঁধা। বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে এই রাজনৈতিক সঙ্কট যতটা না রাজনৈতিক কারণে, তার শত সহস্র গুণ ধর্মীয় Sects এর কারণে। তারা Sect বাঁচাতে জাতিকে কুরবানী করতে রাজি। বাংলায় ধর্মীয় জালসা, ইজতেমা, মহফিলে হাজার হাজার, কখনও বা লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে পরকালীন সফলতা অর্জনের আশায়। ইহকালীন কল্যাণের কোন agenda সেখানে স্থান পায় না, বা পেলেও রাজনৈতিক গুরুত্ব পায় না। ফিরকার মহিমা প্রচারই এখানে মুখ্য।
তাই নওশাদ, আব্বাস, তায়েদুল, কামরুজ্জামান, ইমতিয়াজ, সারওয়ার প্রমুখ মুসলমানদের জন্য যতই আওয়াজ তুলুন না কেন, এরা কেউই মুসলমানদের নেতা নন।
প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু প্রয়াত মুসলিম লীগ এমএলএ হাসানুজ্জামান সাহেবকে বলেছিলেন, মুসলমানরা তোমার সঙ্গে নয়, আমার সঙ্গে আছেন। মমতাও জ্যোতি বসুর কথার পুনরাবৃত্তি যদি করেন, ভুল হবে কি? এই মুহূর্তে বাংলায় একমাত্র মমতাই এমন নেত্রী, যিনি এক ডাকে কলকাতার বুকে পাঁচ-দশ লাখ মুসলমানকে জড়ো করতে পারেন। এ Capacity এখন আর কারো নেই।
সিদ্দিকুল্লাহ জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দের নেতা হলেও তার দলনেত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সরল সমীকরণ মুসলমানদের মেনে নিতে হবে। অযথা ‘মুসলমানদের নেতা’ বলে গলা ফাটালে চলবে না। রাজনীতিটা বুঝতে হবে। রাজনীতির আফিম গিললে হবে না। Sect যেমন ইসলাম নয়, দলও তেমন রাজনীতি নয়। গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, Sect গুলোর মধ্য হতে প্রতিনিধি হতে পারেন, নেতা হতে পারেন না। নেতার ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য হতে পারে না। নেতা মানুষের জন্য। নেতা কোন ধর্মের হন না। নেতা হন সর্বজনীন, এটাই ইসলামের শিক্ষা।
ইডেন সিটি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা








