হজ ২০২৬: সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের ইতিহাস ও মর্যাদা
মো. আবদুল মজিদ মোল্লা: হজ ও উমরাহর অপরিহার্য বিধান সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করা। মক্কায় অবস্থিত ছোট এই পাহাড় দুটির রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস ও অনন্য মর্যাদা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাহাড় দুটিকে তাঁর নিদর্শন আখ্যা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে: ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি কাবাঘরের হজ বা উমরাহ সম্পন্ন করে এই দুটির মধ্যে সা’য়ী করল, তার কোনো পাপ নেই। আর কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করলে আল্লাহ পুরস্কারদাতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা বাকারা: ১৫৮)।
নাম ও পরিচয়: আল্লামা ইবনে আশুর (রহ.) লেখেন, ‘সাফা ও মারওয়া পরস্পর মুখোমুখি দুটি ছোট পাহাড়। সাফা হল, আবু কুবাইস পাহাড়ের চূড়া এবং মারওয়া হল কুআইকিয়ান পাহাড়ের প্রান্ত। সাফা নামকরণের কারণ হল সেটা সাফা পাথর দ্বারা গঠিত, আর তা হল মসৃণ ও কঠিন পাথর। মারওয়া নামকরণ করার কারণ হল, তা মারভ দ্বারা গঠিত, তা হল এমন সাদা নরম পাথর, যা আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির: ২/৬০)। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেছেন, ‘আদম মোস্তফা (আ.) সাফা পাহাড়ের ওপর অবস্থান নিয়েছিলেন। ফলে এর নাম সাফা হয়েছে। আর হাওয়া (আ.) মারওয়া পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাই মারয়াহ বা নারীর নামে তার নামকরণ করা হয়েছে। (তাফসিরে কুরতুবি: ২/৪৬৯)।
সাফা মারওয়ার ইতিহাস: সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয় পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদুল হারাম সংলগ্ন। তাই মক্কা নগরী ও মসজিদুল হারামের মতোই এর ইতিহাস সুপ্রাচীন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের দাবি, আদম ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমন করার পর পবিত্র এই পাহাড়দ্বয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যেমন- ইমাম কুরতুবি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, ঐতিহাসিক এই দুই পাহাড়ের সঙ্গে ইবরাহিম (আ.) ও বিবি হাজেরা (রা.)-এর স্মৃতির বিবরণ বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত একাধিক হাদিসে পাওয়া যায়। দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, ইবরাহিম (আ.) শিশুপুত্র ইসমাইল ও তাঁর মা হাজেরা (রা.)-কে মক্কায় রেখে যান। তাদের কাছে সামান্য পানি ও খাবার ছিল, যা অল্প দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। তখন ইসমাইল (আ.)-এর মা হাজেরা বললেন, আমি যদি গিয়ে এদিক-সেদিক তাকাতাম, তাহলে হয়ত কোনো মানুষ দেখতে পেতাম।

অতঃপর তিনি সাফা পাহাড়ে চড়লেন আর এদিকে-ওদিকে তাকালেন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন দ্রুতবেগে মারওয়া পাহাড়ে গেলেন এবং এভাবে তিনি কয়েক চক্কর দিলেন। পুনরায় তিনি বললেন, যদি গিয়ে দেখতাম যে শিশুটি কী করছে। অতঃপর তিনি গেলেন এবং দেখতে পেলেন, সে তার অবস্থায়ই আছে। সে যেন মরণাপন্ন হয়ে গেছে। এতে তাঁর মন স্বস্তি পাচ্ছিল না। তখন তিনি আবারও মানুষের সন্ধানে পাহাড়দ্বয়ে আরোহণ করতে থাকলেন। এভাবে তিনি সাতবার চক্কর পূর্ণ করলেন। অতঃপর আল্লাহ জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে ইসমাইল (আ.)-এর পায়ের কাছে জমজম কূপ সৃষ্টি করলেন। (সহিহ বুখারি: ৩৩৬৬)। আল্লাহ তাআলা বিবি হাজেরা (আ.)-এর ত্যাগ, আকুতি ও আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার ইতিহাসকে অমর করলেন এবং পাহাড় দুটিকে হজের বিধানের অন্তর্ভুক্ত করলেন। ইবরাহিম (আ.)-এর যুগ থেকেই সাফা-মারওয়ার সা’য়ী হজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইসলামপূর্ব আরবের লোকেরা সাফা ও মারওয়ায় মানাত, ইসফা ও নায়েলা নামক মূর্তি স্থাপন করে তাদের তাওয়াফ করত। ইসলাম সা’য়ীর বিধান বহাল রাখলেও মূর্তি অপসারণ করে।
দুই পাহাড়ের অনন্য মর্যাদা: কুরআন ও হাদিস দ্বারা সাফা ও মারওয়ার মর্যাদা প্রমাণিত। যেমন-(১) আল্লাহর নিদর্শন: পবিত্র পাহাড় দুটি আল্লাহর নিদর্শন। আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। (সূরা বাকারা: ১৫৮)। (২) ইবাদতের অংশ: হানাফি মাযহাব অনুসারে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করা ওয়াজিব। যেমনটি আয়াতে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং যে ব্যক্তি কাবাঘরের হজ বা উমরাহ সম্পন্ন করে এই দুটির (সাফা ও মারওয়া) মধ্যে সা’য়ী করল, তার কোনো পাপ নেই। (সূরা বাকারা: ১৫৮)। (৩) নবী-রাসূলদের স্মৃতির ধারক: পবিত্র এই পাহাড়দ্বয় আদম, হাওয়া, ইবরাহিম, ইসমাইল ও হাজেরা (আ.)-এর স্মৃতি বিজড়িত। (সহীহ বুখারি: ৩৩৬৬ / তাফসিরে কুরতুবি: ২/৪৬৯)। (৪) দোয়া কবুলের স্থান: একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, মহানবী (সা.) সা’য়ী করার সময় সাফা পর্বতে দাঁড়িয়ে কাবাঘরের দিকে ফিরে দোয়া করেছিলেন। তাই বোঝা যায় এখানে দোয়া কবুল হয়। (সুনানে নাসায়ী: ২৯৮৫)।








