আমি ইলম (জ্ঞান) বলছি
রফিকুল হাসান: আমি ইলম। হ্যাঁ, সেই ইলম — যার জন্য একসময় মানুষ ঘর ছেড়েছে, দেশ ছেড়েছে, রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়েছে। যার মর্যাদায় ফেরেশতারাও মাথা নত করেছিল আদম (আ.)-এর সামনে। যার আলোতে পৃথিবীর অন্ধকার যুগগুলো আলোকিত হয়েছিল। কিন্তু আজ আমি বড় অসহায়। আজ আমাকে সবাই চেনে, কিন্তু খুব কম মানুষ আমাকে সত্যিকার অর্থে বোঝে। আমার নাম উচ্চারণ হয় হাজারবার, অথচ আমার সম্মান রক্ষা করে খুব কম মানুষ। আজ আমি নিজের কষ্টের কথা বলতে এসেছি। একসময় মানুষ আমাকে অর্জন করার জন্য কাঁদত। রাতের পর রাত প্রদীপের নিচে বসে থাকত। ক্ষুধা সহ্য করত, ক্লান্তি সহ্য করত, কিন্তু আমাকে ছেড়ে দিত না। কারণ, তারা জানত — আমি শুধু কিছু তথ্য নই, আমি মানুষকে মানুষ বানাই। কিন্তু আজ? আজ আমাকে শুধু চাকরির সিঁড়ি বানানো হয়েছে। আজ আমাকে শুধু সার্টিফিকেটের ফ্রেমে বন্দি করা হয়েছে। আজ মানুষ আমাকে অর্জন করে না, ব্যবহার করে। আমি কষ্ট পাই যখন দেখি, একজন মানুষ বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করেছে, অথচ তার কথায় অহংকার ঝরে। সে অনেক কিছু জানে, কিন্তু কাউকে সম্মান করতে জানে না। সে প্রযুক্তিতে দক্ষ, কিন্তু নিজের পরিবারকে সময় দিতে ব্যর্থ। সে সমাজে শিক্ষিত বলে পরিচিত, অথচ তার চরিত্র অন্ধকারে ভরা। তখন আমি চুপচাপ দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমি তো এমন ছিলাম না। আমার কাজ ছিল মানুষের অন্তরকে নরম করা। আমি মানুষকে বিনয় শেখাতাম। মানুষকে সত্যের পথে ডাকতাম। মানুষকে বলতাম, “তুমি পৃথিবীতে শুধু নিজের জন্য আসোনি, অন্যের উপকার করার জন্যও এসেছ।” কিন্তু আজ আমাকে ব্যবহার করে মানুষ প্রতারণা করছে। আমাকে ব্যবহার করে মিথ্যাকে সত্য বানানো হচ্ছে। আমাকে ব্যবহার করে দুর্বল মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বাস করো, তখন আমি নিজেই নিজের পরিচয় দিতে লজ্জা পাই।
আজ আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাই সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে এসে। এক মিনিটের ভিডিও দেখে মানুষ নিজেকে জ্ঞানী ভাবে। দুটি উক্তি মুখস্থ করে নিজেকে গবেষক ভাবে। কিছু উপদেশমূলক কথা শিখে মানুষ অন্যদের ছোট করতে শুরু করে। কিন্তু তারা জানে না, আমি কখনো তাড়াহুড়োর মধ্যে জন্মাই না। আমি ধৈর্যের সন্তান। আমি রাত জাগার সঙ্গী। আমি চিন্তা, গবেষণা ও বিনয়ের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করি। আজ মানুষ পড়তে চায় না, গভীরে যেতে চায় না। সবাই শুধু দ্রুত বিখ্যাত হতে চায়। দ্রুত তর্কে জিততে চায়। দ্রুত বিখ্যাত হতে চায়। আর আমি নীরবে কাঁদি। একসময় আমাকে অর্জন করলে মানুষের চোখে ভয় থাকত — নিজের ভুলের ভয়, আল্লাহর ভয়, অন্যায়ের ভয়। আর আজ? আজ আমাকে অর্জন করার পর অনেকের ভেতরে অহংকার জন্মায়। মানুষ ভাবে, “আমি জানি, তাই আমি সবার চেয়ে বড়।” অথচ আমি তো মানুষকে বড় হতে শেখাইনি, আমি মানুষকে বিনয়ী হতে শিখিয়েছিলাম। আমি অবাক হয়ে দেখি — আজ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সবই বাড়ছে। ডিগ্রিধারীর সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু কেন যেন মানুষের ভেতর মানবতা কমে যাচ্ছে। আমি দেখি — একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত, কিন্তু সে বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। একজন মানুষ বড় কর্মকর্তা, কিন্তু সে ঘুষ ছাড়া কাজ করে না। একজন মানুষ ধর্ম সম্পর্কে অনেক জানে, কিন্তু তার কথায় মানুষ আহত হয়। তখন আমি নিজেকে প্রশ্ন করি — “তাহলে আমি কোথায় হারিয়ে গেলাম?” কারণ, প্রকৃত আমি তো এমন নই। আমি তো সেই ইলম বা জ্ঞান, যে মানুষকে অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখায়। মানুষকে সত্য কথা বলতে সাহস দেয়, মানুষকে ক্ষমা করতে শেখায়, মানুষকে নিজের নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে শেখায়। কিন্তু আজ আমাকে মুখস্থ করা হয়, হৃদয়ে ধারণ করা হয় না। আমাকে বক্তৃতায় ব্যবহার করা হয়, জীবনে বাস্তবায়ন করা হয় না। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আফসোস।
আজ আমি যুবকদের দিকে তাকাই, অনেক আশার সঙ্গে আবার ভয়ও অনুভব করি। আমি দেখি — তাদের হাতে অসীম সম্ভাবনা আছে। প্রযুক্তি আছে, সুযোগ আছে, শেখার হাজার দরজা খোলা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে বিভ্রান্তির দরজাও খোলা। তাই আমি আজ যুবকদের বলতে চাই, আমাকে শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য শিখো না। আমাকে শুধু তর্কে জেতার জন্য শিখো না। আমাকে এমনভাবে গ্রহণ করো, যাতে তোমার চরিত্র বদলে যায়। যদি আমার কারণে তোমার অন্তরে বিনয় না আসে, তাহলে জেনে রেখো, তুমি এখনো আমাকে পুরোপুরি চিনতে পারোনি। যদি আমার কারণে তোমার আচরণ সুন্দর না হয়, তাহলে বুঝে নাও, তুমি শুধু তথ্য সংগ্রহ করেছ, আমাকে অর্জন করোনি। আমি ইলম। আমি মানুষের মাথাকে বড় করার জন্য আসিনি, হৃদয়কে আলোকিত করার জন্য এসেছি। আমি মানুষকে বিখ্যাত করার জন্য আসিনি, মানুষকে সত্যিকার অর্থে মানুষ বানানোর জন্য এসেছি। আজও যদি মানুষ আমাকে সঠিকভাবে বুঝত, তাহলে সমাজে এত প্রতারণা থাকত না, এত হিংসা থাকত না, এত অহংকার থাকত না। মানুষ মানুষকে ঘৃণা না করে ভালবাসতে শিখত। কিন্তু আফসোস… আজ মানুষ আমাকে অর্জন করছে, অথচ হারিয়ে ফেলছে আমার আসল রূপ। তবুও আমি আশাহত নই। কারণ পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ আছে, যারা আমাকে শুধু বইয়ের পাতায় নয়, নিজেদের চরিত্রে ধারণ করে। যারা আমাকে দিয়ে মানুষকে ছোট করে না, মানুষকে আলোকিত করে। আমি তাদের মাঝেই বেঁচে আছি। আর যেদিন মানুষ আবার আমাকে সত্যিকার অর্থে চিনবে, সেদিন পৃথিবী আবার আলোয় ভরে উঠবে।








