বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: অহংকারের পতন, ঔদ্ধত্যের পরাজয়
আবু হায়াত বিশ্বাস: মার্চ মাস। সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্ব তখন সবে শুরু হয়েছে। দিল্লির সংবিধান সদনে দলীয় অফিসে বসে তৃণমূল কংগ্রেসের এক প্রভাবশালী নেতা সাংবাদিকদের সামনে বুক ঠুকে দাবি করেছিলেন, বাংলায় তৃণমূলের জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। ২০০-র বেশি আসন নিশ্চিত। বিজেপিকে রুখতে কারও প্রয়োজন নেই। ‘একাই যথেষ্ট মমতাদি’ — এই ভাষাতেই তিনি বিরোধীদের কার্যত উপহাস করেছিলেন। কংগ্রেসকে তুচ্ছ করে, সিপিএমকে রাজনৈতিকভাবে মৃত ঘোষণা করে তিনি এমন এক আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছিলেন, যেন নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতা, ফল আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছে। সেই সময় অনেকেই বিষয়টিকে রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু আজ পরিষ্কার, সেটি আত্মবিশ্বাস ছিল না, ছিল সীমাহীন ঔদ্ধত্য।
গত ৪ মে বাংলার মানুষ সেই ঔদ্ধত্যের জবাব দিয়েছে। তৃণমূল শুধু ক্ষমতা হারায়নি, ভেঙে পড়েছে তাদের ‘অজেয়’ ভাবমূর্তিও। দীর্ঘ ১৫ বছর শাসনের পর বাংলার মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে, গণতন্ত্রে কোনও দলই চিরস্থায়ী নয়। মানুষ যখন চুপ থাকে, তখন ক্ষমতাসীনরা প্রায়ই ভুল করে মনে করে নেয়, জনগণ সব মেনে নিচ্ছে। কিন্তু ভোটবাক্সে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হলে সবচেয়ে শক্তিশালী বলয়ও ভেঙে পড়ে। বাংলার নির্বাচন সেই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, তৃণমূল এই পরাজয় মেনে নিতেও পারেনি। ভোট চলাকালীন যাদের মুখে কোনও অভিযোগ ছিল না, ফল বেরোতে এখন তারাই বলতে শুরু করল ‘ভোট লুঠ হয়েছে’। অথচ গোটা নির্বাচন পর্বে বড় কোনও হিংসা, বুথ দখল বা ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ কার্যত সামনে আসেনি। বরং বহু বছর পর সাধারণ মানুষ অবাধে ভোট দিতে পেরেছে বলেই প্রকৃত জনমত প্রকাশ্যে এসেছে। এতদিন গ্রাম থেকে শহর — সর্বত্র শাসকদলের প্রভাব, ভয় এবং সংগঠিত দাদাগিরির অভিযোগ ছিল। মানুষ মনে করত, ভোট দেওয়া মানেই যেন এক অদৃশ্য চাপের মুখোমুখি হওয়া। এবার নির্বাচন কমিশনের কড়াকড়ি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে সেই ভয় অনেকটাই কেটেছিল। মানুষ নিজের মতো ভোট দিয়েছে। আর সেই স্বাধীন ভোটই তৃণমূলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে।
মমতা ব্যানার্জি নিজেও রাজনৈতিক পরাজয়ের পর ন্যূনতম আত্মসমালোচনার পথে হাঁটেননি। বরং জনরায়ের মধ্যেও অজুহাত খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। এই মানসিকতা আসলে ক্ষমতার অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে অনেক সময় শাসকদল বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তৃণমূলের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, সরকার মানেই দল, আর দল মানেই সরকার। সেই কারণেই বিরোধী কণ্ঠস্বরকে উপহাস করা হয়েছে, সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র বলা হয়েছে, আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই নির্বাচনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর ছিল দুর্নীতি। গত কয়েক বছরে একের পর এক কেলেঙ্কারিতে রাজ্যের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন কেলেঙ্কারি, কয়লা পাচার, গরুপাচার, বালি মাফিয়া — অভিযোগের তালিকা এত দীর্ঘ যে, সাধারণ মানুষের মনে একটা ধারণা স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল, দুর্নীতিই যেন প্রশাসনের স্বাভাবিক সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল চাকরি দুর্নীতি নিয়ে। হাজার হাজার যোগ্য চাকরিপ্রার্থী বছরের পর বছর আন্দোলন করেছেন। রাস্তায় বসে থেকেছেন। আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। অথচ সরকার তাদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার বদলে প্রায়শই উদাসীন থেকেছে। শিক্ষিত যুবকদের মনে এই ক্ষোভ গভীরভাবে জমেছিল। তার প্রতিফলন এবার ভোটে স্পষ্ট হয়েছে।
তৃণমূল সরকার উন্নয়নের বদলে অনুদানের রাজনীতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিল। লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবসাথী, স্বাস্থ্যসাথী, সবুজসাথী, শ্মশানসাথী, রূপশ্রী, কন্যাশ্রী, শ্রমশ্রী ইত্যাদি বিভিন্ন অনুদান — এগুলি সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে পারে না। বাংলার যুবসমাজ চাকরি চেয়েছিল, শিল্প চেয়েছিল, স্থায়ী কর্মসংস্থান চেয়েছিল। কিন্তু গত এক দশকে রাজ্যে বড় শিল্প আসেনি বললেই চলে। সিঙ্গুরের পর শিল্পায়নে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা আর পূরণ হয়নি। ফলে একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ ভিনরাজ্যে কাজ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। এই হতাশা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। তৃণমূলের আর এক বড় ব্যর্থতা ছিল, প্রশাসনের দলীয়করণ। পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা সর্বত্র ‘সিন্ডিকেট রাজ’, কাটমানি, তোলাবাজির অভিযোগ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছিল। অনেকেই মনে করতেন, সরকারি সুবিধা পেতেও দলীয় আনুগত্য জরুরি। সাধারণ মানুষ যখন প্রশাসনের উপর আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন সরকারের ভিত দুর্বল হতে বাধ্য। তৃণমূল সেই সংকেত বুঝতেই পারেনি। দেওয়াল লিখন পড়তে পারেনি।
এই নির্বাচনে বাংলার সামাজিক সমীকরণেও বড় পরিবর্তন ঘটেছে। এতদিন যে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে তৃণমূল নিজের স্থায়ী সম্পদ বলে ধরে নিয়েছিল, সেখানে এবার ফাটল দেখা গিয়েছে। মুসলিম ভোট বিভিন্ন এলাকায় বিভক্ত হয়েছে। অন্যদিকে হিন্দু ভোটের বড় অংশ একজোট হয়েছে বিজেপির পক্ষে। বাংলার রাজনীতিতে এমন মেরুকরণ আগে এত তীব্রভাবে দেখা যায়নি। এর জন্য অনেকাংশে দায়ী তৃণমূলের রাজনীতি। একদিকে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ, অন্যদিকে আবার জগন্নাথ মন্দির বা মহাকাল মন্দিরের মতো প্রতীকী হিন্দুত্ব — এই দ্বৈত রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বরং বিজেপিকে ‘হিন্দু স্বার্থের রক্ষক’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে। ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর একসময় তৃণমূলকে সতর্ক করেছিলেন — ধর্ম নয়, উন্নয়নকে সামনে রাখতে। কিন্তু সেই পরামর্শ উপেক্ষা করেই তৃণমূল ধর্মীয় প্রতীকের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ফল হয়েছে উল্টো। বিজেপি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তৃণমূলকে ‘হিন্দু বিরোধী’ এবং ‘মুসলিম তোষণকারী’ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছে। সেই ভাবমূর্তি থেকে আর বেরোতে পারেনি তৃণমূল।
এবারের ভোটে আর একটি বড় ফ্যাক্টর ছিল, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর প্রত্যাশা। কেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের রাজনীতি করতে গিয়ে বাংলার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে — এই ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়ে সংঘাত, কেন্দ্র বিরোধিতাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, এবং প্রতিটি বিষয়ে সংঘর্ষের রাজনীতি একাংশ মানুষের মধ্যে বিরক্তি তৈরি করেছিল। বিজেপি সেই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়েছে। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, ভোটে হারের পর তৃণমূলের ভিতর থেকেই ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছে। এতদিন যারা বিজেপিকে আক্রমণ করতেন, তাঁরাই এখন গেরুয়া শিবিরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন। যারা এতদিন মমতা ব্যানার্জির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, তারাই আজ বলছেন, ‘দল দুর্নীতির আখড়া হয়ে গিয়েছিল’। প্রশ্ন হচ্ছে, এতদিন তাঁরা চুপ ছিলেন কেন? ক্ষমতার সুবিধা নেওয়ার সময় কি দুর্নীতি চোখে পড়েনি? আসলে ক্ষমতা চলে গেলে অনেকের বিবেক জেগে ওঠে।
এই নির্বাচন আরও একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। আঞ্চলিক দলগুলির সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট। তৃণমূল, আপ, বিজেডি, এনসিপি, শিবসেনা একের পর এক আঞ্চলিক শক্তি দুর্বল হয়েছে। জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকেই কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে মেনে নিতে হচ্ছে। অথচ গত কয়েক বছরে মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর দল কংগ্রেসকে দুর্বল করতে, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বকে খাটো করতে কোনও সুযোগ ছাড়েনি। বিরোধী জোটের বৈঠকে অনুপস্থিত থাকা, গুরুত্বহীন প্রতিনিধি পাঠানো, ব্ল্যাকমেলের রাজনীতি সবই করেছে। আজ ক্ষমতা হারিয়ে আবার সেই কংগ্রেসের দিকেই তাকাতে হচ্ছে। আসলে রাজনৈতিক ক্ষমতা অনেক সময় বাস্তববোধ কেড়ে নেয়। তৃণমূলও সেই ভুল করেছে। তারা ভেবেছিল, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, খয়রাতির রাজনীতি, সংগঠনের দাপট, আর ভয় দেখিয়ে চিরকাল ক্ষমতায় থাকা যায়। কিন্তু গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে মানুষ। বাংলার মানুষ এবার সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। এই নির্বাচন তাই শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি রাজনৈতিক দম্ভ, দুর্নীতি ও ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে মানুষের ঐতিহাসিক রায়।








