গোলমরিচের কারণেই পরাধীন হয়েছিল ভারত!
নতুন পয়গাম: ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, যুদ্ধ হয় সাধারণত জমি, সোনা বা ক্ষমতার লোভে। কিন্তু ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। প্রায় ২০০ বছরের পরাধীনতার পেছনে ছিল রান্নাঘরের একটি সাধারণ মশলা, যার নাম গোলমরিচ। ইতিহাসবিদরা যাকে বলেন, ‘দ্য স্পাইস দ্যাট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড’। মধ্যযুগের ইউরোপে মাংস সংরক্ষণ ও খাবারের স্বাদ বাড়াতে গোলমরিচের জুড়ি ছিল না। এক পাউন্ড গোলমরিচের দাম তখন এক পাউন্ড সোনার সমান। এই বিপুল চাহিদা ইউরোপীয় নাবিকদের বাধ্য করেছিল ভারতের সমুদ্রপথ আবিষ্কার করতে। গোলমরিচই সেই ‘কালো হীরে’, যার পেছনে ছুটেছিল পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ব্রিটিশরা।
১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা যখন ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান, তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল গোলমরিচের বাণিজ্য। পরে এলেন ওলন্দাজ, ফরাসিরা। আর সবশেষে ব্রিটিশরা। তারা এসেছিলেন বণিক হয়ে, কিন্তু গোলমরিচের একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রাখতে গিয়ে তাঁরা জড়িয়ে পড়েন স্থানীয় রাজনীতিতে। ১৬০০ সালে ‘ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠনের সময় মূল লক্ষ্যই ছিল দক্ষিণ এশিয়া থেকে মশলা আমদানি। কোম্পানি বুঝতে পারে, কেবল ব্যবসা নয়; রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করলে মশলা কেনা বন্ধ করে সেগুলো কেড়ে নেওয়া সহজ। পলাশীর প্রান্তরে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পেছনেও এই গোলমরিচের বাণিজ্যিক স্বার্থই মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল।
ভারত দখলের পর ব্রিটিশরা এ দেশের কৃষকদের বাধ্য করত খাদ্যশস্যের বদলে গোলমরিচ ও নীল চাষ করতে। ভারতের মশলায় সমৃদ্ধ হয়েছে ইউরোপের অর্থনীতি। আর এই দেশ নিমজ্জিত হয়েছে দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যে। প্রয়াত ইতিহাসবিদ ড. তপন রায়চৌধুরী বলেছিলেন, ‘গোলমরিচের লোভ ইউরোপীয়দের জলপথে এদেশে টেনে আনে। পরে সেই বাণিজ্যিক স্বার্থই পরিণত হয় উপনিবেশবাদী শাসনে।’
এখন আমরা সহজেই গোলমরিচ ব্যবহার করি। ঝালে, ঝোলে, অম্বলে, স্যুপে সর্বত্র দেদার গোলমরিচ ছড়িয়ে দিই। কিন্তু এর প্রতিটি দানা যেন এক রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মারক। একটি সাধারণ মশলার স্বাদের জন্য ভারতবর্ষ যে মূল্য স্বাধীনতা দিয়ে চুকিয়েছিল, সেটা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। গোলমরিচের দানায় লুকিয়ে আছে ব্রিটিশদের অবাধ লুণ্ঠনের গল্প, ঔপনিবেশিক নিপীড়নের হাড়হিম করা কাহিনি।








