জীবনানন্দ : মুদ্রাগুণে একা একজন কবি
পাভেল আখতার
‘বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি’–লিখেছিলেন ভারতচন্দ্র । আমরা কবিদেরও ‘ভালবেসে’ বিভিন্ন বিশেষণে ভূষিত করে থাকি । যেমন, জীবনানন্দ দাশকে আমরা নস্টালজিয়ার কবি, প্রকৃতিচেতনা ও মৃতুচেতনার কবি ইত্যাদি বলে থাকি । সবই ঠিক কথা, তবুও বলতে হয়–সত্যিই কি কবির জন্যে কোনও বিশেষণের প্রয়োজন হয় ? কোনও কবির জন্যেই ? আজ অনেক কবিকেই দেখি গর্বভরে একটি কথা উচ্চারণ করতে যে, তাঁরা নাকি ‘কবিতার মধ্যেই বাস’ করেন ! আহা ! যদি কথাটির মধ্যে কিছুমাত্র সারবত্তা থেকে থাকে তাহলে তা অবলীলায় অন্তত একজনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করাই যায় । তিনি জীবনানন্দ দাশ।

একথা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, কবিতা লেখার এমন একটি শৈলী তিনি কীভাবে সেই সময়ে ‘আবিষ্কার ও অনুশীলন’ করেছিলেন, যা সকলের চেয়ে আলাদা ; একেবারে স্বতন্ত্র এবং বিস্ময়কর ! ‘সকল লোকের মাঝে বসে’ তিনি সত্যিই ‘একা’ হয়েছিলেন ‘আলাদা’ ; আর সেটাই হয়তো ‘অবুঝ’ সজনীকান্ত দাসদের দ্বারা তাঁর ‘বিদ্ধ’ হওয়ার কারণ । ‘নিজের মুদ্রাদোষে’ নয়, আসলে ‘নিজের মুদ্রাগুণে’ যদি ‘ওইভাবে’ না লিখতেন তাহলে তিনি যে ‘জীবনানন্দ’ তা প্রতিষ্ঠিত হ’ত না ! স্থূল ইন্দ্রিয়ময়তায় নয়, গভীর ইন্দ্রিয়াতীত বোধ ও চেতনার শরণাপন্ন হতে না পারলে তাঁকে ‘আত্মস্থ’ করা সহজ নয় !
‘ভিড়’ শব্দটাকে আমরা ‘আপন’ করে নিয়েছি । কলরব মুখরিত জনারণ্যেই আমরা বহতা, প্রাচীন শ্বাস খুঁজে পাই । অন্যদিকে সব কবি নয়, তবে জীবনানন্দ অবশ্যই পছন্দ করতেন নির্জনতা । বহুল কথিত ‘কবিমাত্রেই নির্জনতাপ্রিয়’–এমন সারল্যে না-মজলেই ভাল । ভিড় চঞ্চল আনন্দের, নির্জনতা বা একলা থাকা আরামের ; হিরণ্ময় এক প্রশান্তি আছে তাতে । ‘আনন্দ’ জিনিসটা হেলাফেলার নয়, তবে ‘আরাম’-এর কদর আরেকটু বেশি, একলা বসে আপনমনে কতকটা যেন জীবনের শুশ্রূষা হয় । এবং, একা থাকার এই নন্দিত আরামটুকুও কম আনন্দের নয় ।
কবি ‘নির্জনতা’ ভালবাসেন মানেই তিনি সমাজ থেকে, মানুষ থেকে তফাতে থাকতে চাইছেন এমনটা ভাবা নেহাতই সরলতা । ঈপ্সিত নির্জনতা, নৈঃশব্দ্য কবিকে ‘আত্মমগ্ন’ হতে সাহায্য করে । আর, ‘আত্মমগ্নতা’ ছাড়া কোনও বীক্ষণ ও অনুভূতিই স্বচ্ছ, গভীর ও শুদ্ধ হয় না । জীবনানন্দকে কিছু ‘সুনির্দিষ্ট গণ্ডিতে’ আবদ্ধ করা হয়েছে । নস্টালজিয়া, অতীন্দ্রিয়বাদ, মৃত্যুচেতনা ইত্যাদি ‘গণ্ডি’ । এসব মিথ্যে নয়, কিন্তু এই সত্যগুলো থেকে কবিকে ‘সমাজবিমুখ’ কিংবা ‘জীবনবিবিক্ত’ ভাবার কোনও অবকাশ নেই ।

অপরদিকে নজরুল নির্জনতাচারী কবি ছিলেন না। সেই পরিসরই তাঁর জীবনে ছিল না । অথবা, ইচ্ছেও । সমাজ বদলের স্বপ্ন তাঁকে অস্থির করে রেখেছিল । ‘আধমরাদের ঘা মেরে’ বাঁচানোর যে সংকল্প ও প্রচেষ্টা তিনি কাব্যে দেখিয়েছিলেন, মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করার যে ব্রত তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত ছিল, তাতে তিনি নির্জনে বসে জীবনানন্দীয় মগ্নতায় শান্ত, স্থিত কাব্যচর্চা করতে পারতেন না। একেকজন কবি একেক রকম । কারও সঙ্গে কারও তুলনা হয় না ।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ”চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে !” এর পরের কথাটি হ’ল এই : ”অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে !” এই প্রশ্ন সঙ্গত যে, যাদের ‘চোখে আলো’ নেই, তারা কি সত্যিই ‘অন্ধ’ ? নাকি, তারাও দেখতে পায় ? হ্যাঁ, তারাও দেখতে পায় ! তারা ‘দেখে’ স্পর্শ দিয়ে, ঘ্রাণ দিয়ে ! তাদের সেই ‘দেখা’ চর্মচক্ষুর দেখা থেকে অনেক বেশি গহন ও শুদ্ধ ! সেই ‘দেখা’র মধ্যে থাকা ‘আলোর ভুবন’ সংবেদনশীল, সূক্ষ্ম, নির্মল ! ‘দেখা’ শব্দটাই গহন ও অশেষ মর্মদীপ্ত ! সুবোধ ঘোষ-এর ছোটগল্প ‘অপরাজিতা’য় অন্ধের আশ্চর্য দর্শন ও ঘ্রাণক্ষমতা বর্ণিত হয়েছে । নায়কের মানসী কোন্ দিন কোন্ রঙের শাড়ি পরেছে কেবল স্মৃতির সুরভিবাহিত ঘ্রাণ ও ইন্দ্রিয়াতীত দেখার দ্বৈত ক্রিয়ায় গল্পে বলে দিচ্ছিল অন্ধ মানুষটি !

ঘ্রাণ ও গন্ধ দুটি শব্দ একই দ্যোতনা বয়ে আনে কি না সেই তর্ক অনুক্ত থাক । পার্থক্য থাকলেও সেটা সূক্ষ্ম । রবীন্দ্রনাথ আরেকটি গানে লিখছেন : ”…ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে, ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে !” এসব নিতান্ত ইন্দ্রিয়দীপিত ব্যাপার । কিন্তু, ইন্দ্রিয়াতীত ব্যাপারও কি নেই ? আছে । “লাল লাল বটের ফলের ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা” অনুভব করছেন জীবনানন্দ দাশ । তিনি বনলতা সেনের চুলে “কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা”র ঘ্রাণও পাচ্ছেন । বস্তুত, আমাদের সমস্ত চেতনা, মনন, অনুভূতি জুড়েই আছে পরিব্যাপ্ত দৃশ্য-অদৃশ্যের আলোছায়া । অনেকটা নাট্যমঞ্চের পর্দার বাইরে ও ভেতরের মতো । না-দেখাও যে ভীষণ রকম দেখা সে তো এক অকাট্য সত্য ! বস্তুত, ইন্দ্রিয়াতীত দেখা ও ঘ্রাণের অনুরণন জীবনানন্দের সমূহ কাব্য জুড়েই রয়েছে !
২২ অক্টোবর ১৯৫৪ । কবির মূল্য না বোঝা একটি ঘাতক ট্রাম জীবনানন্দের জীবনদীপ নির্বাপিত করে দিলেও “তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও, আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব”–এই অপরূপ ও শুদ্ধ প্রত্যয়ের ধ্বনি কান পাতলেই শোনা যাবে বাংলার ঘাসে, সাতটি তারার তিমিরে, রূপশালী ধানে, হিজল-অশ্বত্থ গাছে, কৃষ্ণা দ্বাদশীর চাঁদে, ভোরের কাকের অনন্য অমরত্বে ও আবহমানতায়, যে বৃত্তের একক নির্মাতা তিনিই !








