আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
স্বপন সেন ও দেবব্রত মন্ডল
নতুন পয়গাম, ২২ অক্টোবর ২০২৫
আলিমুদ্দিন স্ট্রিট এর নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই! মধ্য কলকাতার একটি রাস্তার নাম। এখানেই রয়েছে সিপিএম-এর রাজ্য কার্যালয়। কিন্তু কে ছিলেন এই আলিমুদ্দিন সাহেব? স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন বহু মানুষের অবদান রয়েছে, যারা এই আন্দোলনের নেপথ্যে থেকেও অনবদ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁরা যদি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এভাবে সহযোগিতা না করতেন তবে ভারতবর্ষ স্বাধীন হতে হয়ত আরো অনেক বছর পিছিয়ে যেত। সেইসব নেপথ্যচারী বাঙলার মানুষদের নিয়ে আমার নিবেদন।
১৯১০ সালের এক অমাবস্যার রাত। বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে ঢাকার ওপারে জিঞ্জিরা গঞ্জের ঘাটে নিঃশব্দে এসে ভিড়লো দুটি ছিপ নৌকা। জনা দশেক যুবক নেমে এলো, তারপর কিছুক্ষণ হেঁটে পৌঁছাল শুভাড্যা গ্রামে এক ধনী মহাজনের বাড়ির সামনে। এদের মধ্যে দু’জনকে চেনেন আপনারা। একজনকে দেখেছেন সারপেন্টাইন লেনে ইন্সপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জীকে গুলি করে হত্যা করতে। আর অন্যজনকে ডালহৌসি পাড়ায় রডা কোম্পানির পিস্তল বোঝাই গরুর গাড়ির পাশে হাঁটতে… শ্রীষচন্দ্র পাল ও হরিদাস দত্ত।
চারদিকে তাকিয়ে পাঁচিল টপকে ভেতরে নেমে গেলেন শ্রীষবাবু। আর একটু পরেই খুলে দিলেন সদর দরজা। দলপতির নির্দেশে এবার বাকিরা বন্দুক উঁচিয়ে বাড়ির সবাইকে বাধ্য করল সোনা-দানা, টাকা-পয়সা সবকিছু তাদের হাতে তুলে দিতে। বিনা প্রতিরোধে সবাই গায়ের গয়না খুলে দিলেও কোলে শিশুপুত্র নিয়ে উপস্থিত এক তরুণী বধূ কিছুতেই তার অলঙ্কার দিতে রাজি নয়। ধমক-ধামকেও কাজ হল না, এদিকে দলপতির কড়া হুঁশিয়ারি মহিলাদের গায়ে হাত দেয়া যাবে না। হঠাৎ হরিদাস দত্ত কোল থেকে বাচ্চাটিকে ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, এবার গয়না না খুলে দিলে কেটে ফেলা হবে একে!
নির্বিকার তরুণী শুধু জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে রইল দলপতির দিকে। শরীরের কোথাও স্পর্শ না করে অলঙ্কার কীভাবে কেড়ে নেয়া যায়, সে বিদ্যা তাদের জানা ছিল না। বাধ্য হয়ে সর্দার ইশারা করলেন বাচ্চাটি ফিরিয়ে দিতে। নিজের গর্ভজাত শিশু সন্তানকে কোলে ফিরে পেয়ে মেয়েটি বলে উঠল, আমি জানি আপনারা কে। বাপের বাড়ি এসে নিরাপদে থাকার জন্য রাত কাটাতে এসেছি এই বাড়িতে। গয়না খুলে দিতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই, কিন্তু সেজন্য আমার বিধবা মা’কে শ্বশুরবাড়ি থেকে আজীবন গঞ্জনা শুনতে হবে। তারা ধরেই নেবে যে, এটা আমার অভাবী মায়ের একটা সাজানো গল্প। দোহাই, আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। একথা শুনে দলপতি মেয়েটির মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন, তারপর দলবল নিয়ে নিমেষে মিলিয়ে গেলেন অন্ধকারে।
দেশের স্বাধীনতার জন্য স্বদেশী এই ডাকাত দলের দলপতিকে চেনেন? আমজনতার কাছে অপরিচিত সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহমেদ। ১৮৮৪ সালে জন্ম ঢাকার আশক জমাদার লেনে। প্রতিবেশী ও সহপাঠী ছিলেন বিভি’র প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ। ১৯০৬ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। তবে হঠাৎ বাবার মৃত্যু হওয়ায় আর্থিক কারণে এফ.এ পরীক্ষা দিতে পারেননি। পড়াশোনা বন্ধ করে ঢাকা কালেক্টরেটে চাকরি নেন। অবসর সময়ে বাড়িতে কিছু ছাত্র পড়াতেন, আর সেই থেকে এলাকার মানুষের কাছে ‘মাষ্টার সাহেব’ নামে পরিচিত হন।
কুস্তি লড়ায় তাঁর ছিল অসম্ভব আগ্রহ। তাই নিজের বাড়িতেই খুলেছিলেন কুস্তির আখড়া। সেখানে লাঠি, তরোয়াল, বল্লম ও ছুরি খেলাও শেখানো হত। আদতে এই আখড়াই ছিল বিপ্লবী দলের রিক্রুটিং সেন্টার এবং সেই কাজটি করতেন মাস্টার সাহেব স্বয়ং। ১৯০৫ সালে হেমচন্দ্র মুষ্টিমেয় যে কয়েকজনকে নিয়ে ‘মুক্তিসংঘ’ স্থাপন করেছিলেন, ইনি ছিলেন তার অন্যতম। দুরদর্শী মানুষটি বুঝেছিলেন, পুলিশের হাত থেকে দলকে বাঁচাতে একজনকে অন্তত আড়াল নিতে হবে বা আত্মগোপন করে থাকতে হবে। ফলে কুস্তিপ্রিয় ও পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া মানুষটি ছিলেন বরাবরই সন্দেহের ঊর্ধ্বে।
এই সুযোগে তিনি অস্ত্রশস্ত্র, পুস্তিকা ও পলাতক বিপ্লবীদের শেল্টারের ব্যবস্থা করতেন। ১৯১৫ থেকে ১৯২০ এই পাঁচ বছর অধিকাংশ বিপ্লবী কারান্তরালে গেলেও যোগাযোগের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন দলের ভরকেন্দ্রটিকে। তাঁরই অনুপ্রেরণায় ঢাকা ও মানিকগঞ্জের অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের যুবক নেপথ্য থেকে এগিয়ে এসেছিলেন বিপ্লবী কর্মকান্ডে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আইনজীবী নইমুদ্দিন আহমেদ, যার বাবা ছিলেন আসাম সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। দলগঠন এবং আর্থিক সাহায্য ছাড়াও ইনি বাড়িতে অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন। আরেকজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন ঢাকা কলেজের আব্দুল জব্বার। দুঃখের বিষয়, অকালে মারা যান তিনি। হেমচন্দ্র শেষ বয়সে তার স্মৃতিচারণে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছিলেন, “জব্বারের মতো ছেলে আরো ক’টা জন্মালে স্বাধীনতা যুদ্ধ আরো অনায়াস, সাবলীল ও সহজ সুন্দর হত। সব ভেদাভেদ ভুলে হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের মুক্তি সংগ্রামে আত্মদান করতে পারত। বিধাতা অকালে জব্বারকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে তা হতে দিলেন না।”
১৯৩০ সালে বিভি’র কর্মকাণ্ড চূড়ান্ত পরিণতি নেওয়ার আগেই দুরারোগ্য গ্যালপিং থাইসিস রোগে হঠাৎ চলে গেলেন মাস্টার সাহেব। দেখে যেতে পারলেন না সেই বছরেরই আগস্ট মাসে মিটফোর্ড মেডিক্যাল কলেজে তাঁর আখড়ার এক ছাত্রের অসামান্য বাহাদুরি। তাঁর কীর্তির কথা শুনে সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ধন্যি ছেলে, বুঝিয়ে দিল প্রয়োজন হলে আমরাও জবাব দিতে জানি !
আলিমুদ্দিন সাহেবের কথা আজ আর কারও মনে নেই। মধ্য কলকাতার এন্টালি অঞ্চলে তাঁর নামাঙ্কিত একটি রাস্তা শুধু বহন করছে আজন্ম বিপ্লবী, নাম-যশ ও প্রচার বিমুখ সেই মানুষটিকে। প্রণাম !
(২)
এখন আলিমুদ্দিন স্ট্রিট মধ্য কলকাতার এক ঘিঞ্জি এলাকার ব্যস্ত রাস্তা। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটকে পশ্চিমবঙ্গ চিনেছে অন্যভাবে। ৩১-নং আলিমুদ্দিন স্ট্রিটেই রয়েছে রাজ্য সিপিএমের সদর দপ্তর। যেখানে বসে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর রাজ্য-রাজনীতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করেছেন বামফ্রন্ট নেতৃবর্গ। কিন্তু আদতে কে ছিলেন এই আলিমুদ্দিন? কার নামাঙ্কিত এই রাস্তা? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে পিছিয়ে যেতে হবে ঊনিশ শতকে।
ঢাকার জমাদার লেন। একটা সরু অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে গলি। দিনের বেলায় কতটুকু সময় সে রোদের মুখ দেখে, তা বোঝা দায়। এখানেই ১৮৮৪ সালের এক বর্ষণমুখর দিনে জন্ম নিলেন স্বাধীনতা যুগের এক অগ্নিপুরুষ, সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহম্মদ। বাবা আমিরুদ্দিনের ছিল সামান্য এক দর্জির দোকান। সংসার-সীমান্তে যুদ্ধরত বাবাই ছিলেন আলিমুদ্দিনের অনুপ্রেরণা। তখন খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছিল মানুষের জীবন যাপন। স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন তখন পুরোদমে জ্বলছে। বাতাসে বারুদের গন্ধ তখনও টাটকা। স্বাভাবিক ভাবেই পাল্টে যাওয়া সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছিল সমাজ, অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির মানচিত্র। কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হল জাতীয় কংগ্রেস। শুরু হল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। ফলে প্রতিদিনই নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল দেশীয় রাজনীতি। পরিবর্তিত সময়ও নিজের মতো করে গড়েপিটে নিয়েছিল যুবক আলিমদ্দিনকে। যদিও তার বহু পূর্বেই সময় তার দাগ রেখে গেছে আলিমুদ্দিনের ব্যক্তিগত জীবনে। ঘটে গেছে এক অনাকাঙ্খিত বিপর্যয়। মারা গেছেন আলিমুদ্দিনের বাবা। গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য আলিমুদ্দিনকে নিতে হয়েছে প্রাইভেট টিউটরের জীবিকা।
জীবনের এই সমস্ত ভাঙা-গড়ার খেলাকে পাথেয় করেই পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিলেন তরুণ-তুর্কি আলিমুদ্দিন। ঘটনাচক্রে হেমচন্দ্র ঘোষ ছিলেন আলিমুদ্দিনের বন্ধু। এই বন্ধুই স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন আলিমুদ্দিনকে।
সাল ১৯০৫। ইতিহাসের পাতা বলছে সময়টা উত্তাল। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তখন পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। ইংরেজ সরকারের দমননীতির গ্রাফ প্রতিদিনই ঊর্ধ্বমুখী। এমন সময় বিপ্লবী হেমচন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলেন এক গুপ্তসমিতি। যার অন্যতম সভ্য ছিলেন আলিমুদ্দিন ওরফে মাস্টার সাহেব। তাঁর নেতৃত্বে যুবকদের শারীরিক কসরতের জন্য প্রতিষ্ঠিত হল বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মাধ্যমেই চলত বিভিন্ন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড, এমনকি স্বদেশি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করার প্রাথমিক পাঠও দেওয়া হত এই প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমেই। না এখানেই থেমে থাকেননি মাস্টার সাহেব আলিমুদ্দিন। একের পর এক বিপ্লবীকে প্রয়োজনীয় শেল্টার দিয়েছেন। সাহায্য করেছেন অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে। বিপ্লবের কাজে প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য করার জন্য আলিমুদ্দিন গঠন করেছেন স্বদেশি ডাকাতদল। সেই যুগে পুঁজিপতিদের ত্রাস হয়ে উঠেছিল তারা, আলিমুদ্দিনের হাতে গড়া এই ডাকাতদল আদতে ছিল রবিনহুড। কুবেরদের অর্থ-সম্পদ লুট করে গরিব মানুষদেরকে অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। ব্রিটিশের দমন নীতির ফলে হেমচন্দ্র-সহ একাধিক স্বদেশী নেতা যখন জেলে, তখনও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রায় একাই অক্সিজেন জুগিয়েছেন আলিমুদ্দিন। নিজে ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। সেই সূত্রেই সাম্প্রয়িকতাকে কোনোদিন প্রশ্রয় দেননি। ছদ্মবেশে একের পর এক বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন। এমনকি পুলিশি ধরপাকড়ের কারণে আত্মগোপন করেও চালিয়ে গেছেন ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ। কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশ কোনোদিন তার টিকিও স্পর্শ করতে পারেনি।
সাল ১৯২০। যক্ষ্মা রোগে বেশ কিছুদিন ভোগার পর চলে গেলেন মাস্টার সাহেব। পরবর্তীকালে তার নামানুসারে মধ্য কলকাতার একটি রাস্তার নামকরণ করা হল ‘আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।’ তাঁর ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বর্ণময় অধ্যায়। এমন কতশত বিপ্লবী আমাদের চোখের আড়ালে কাজ করে গেছেন। ইতিহাস তাদের মনে রাখেন








