বিশ্বজয়ী মেধা ও সংকীর্ণ রাজনীতি: ‘সোনার বাংলা’-র আড়ালে কি হারিয়ে যাচ্ছে ‘সোনার ভারত’-এর স্বপ্ন?
মাসুদ রহমান: ১৯৪৭-উত্তরকালে সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতবর্ষ যখন চরম দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তায় ধুঁকছিল, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এক আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নেরই ফসল আজকের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা আইআইটি। নেহরুর সেই দূরদর্শী পদক্ষেপের সুফল আজ হাতে-নাতে পাচ্ছে দেশ। আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে ইউরোপের বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির সিইও পদে আজ ভারতীয়দের জয়জয়কার। ভারতের মেধা আজ বিশ্ব শাসন করছে। অথচ বিড়ম্বনা এটাই, যে দেশের মেধা বিশ্বমঞ্চে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আজ এক অদ্ভুত আত্মিক সংকটের মুখোমুখি। বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে তাদের বিস্তার ঘটলেও ইতিহাস যে বড় নির্মম, তাই সুযোগ আর ফাঁকফোকর পেলেই আঘাত করে, কাওকে ছাড়ে না।
গ্যালিলিওর তত্ত্ব সঠিক হওয়া সত্ত্বেও তাকে সংখ্যাতত্ত্ব বা তৎকালীন ধর্মীয় গোঁড়ামির কাছে পরাজিত হতে হয়েছিল, গ্যালিলিও ব্যক্তিগতভাবে হেরে গেলেও তার আদর্শ এবং বিজ্ঞান শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিল। তার মৃত্যুর ৩৬০ বছর পর ১৯৯২ সালে ভ্যাটিকান সিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয়, গ্যালিলিও সঠিক ছিলেন। ভারতীয় জনতা পার্টিতে বিজ্ঞানের বিশারদ আছেন, আছেন আইনের দিকপাল, অর্থনীতিবিদ কিংবা দুঁদে বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ। এমনকি আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় শিক্ষাতেও এই দলের নেতাদের বুৎপত্তি কম নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, মেধার এই বিপুল সমারোহ থাকা সত্ত্বেও দলটির রাজনৈতিক দর্শনে অনেক সময় এক ধরনের সংকীর্ণতা ফুটে ওঠে। যার বড় প্রমাণ বারবার ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, সেখানে ‘সোনার ভারত’ গড়ার সেই অখণ্ড জাতীয়তাবাদী চেতনা কোথাও যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিকতার ফাঁদ ও জাতীয়তাবাদের অভাব একটি রাজনৈতিক দল যখন নিজেকে জাতীয়তাবাদী বলে দাবি করে, তখন তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, সমগ্র দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও আত্মিক জাগরণ। কিন্তু অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখেছি, কীভাবে কেবল ভোটব্যাঙ্ক দখল করতে ‘সোনার বাংলা’ শব্দবন্ধকে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যকে ‘সোনা’ করার প্রতিশ্রুতি কি খণ্ডিত জাতীয়তাবাদ নয়? কেন মেধা ও আধ্যাত্মিকতায় শিক্ষিত একটি দল বারবার আঞ্চলিক আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে? কেন তাদের কণ্ঠে ‘সোনার ভারত’ গড়ার সেই রাজকীয় প্রতিধ্বনি শোনা যায় না, যা গোটা দেশের মানুষকে একই সুতোয় বাঁধতে পারে?

আত্মিক জাতীয়তাবাদ বনাম রাজনৈতিক কৌশল: প্রকৃত জাতীয়তাবাদ কখনও বিভাজনের কথা বলে না, তা সবসময় একীকরণের কথা বলে। আমরা যখন ‘আত্মিক জাতীয়তাবাদ’ থেকে দূরে সরে যাই, তখনই রাজনীতিতে সংকীর্ণতার প্রবেশ ঘটে। ভারতের মেধা আজ বিশ্বসেরা। কারণ, তারা সংকীর্ণ গণ্ডির বাইরে চিন্তা করতে শিখেছে। অথচ দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিজেপি যখন কেবল ক্ষমতার লোভে আঞ্চলিক প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন বোঝা যায়, তাদের চিন্তা-ভাবনা দলের আয়তনের মতো বিশাল হয়ে উঠতে পারেনি। আইআইটি বা ইসরো-র সাফল্য যেমন কোনো নির্দিষ্ট রাজ্যের নয়, বরং পুরো ভারতের গৌরব; রাজনীতিকেও সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে হবে। ভারতের ইতিহাস ত্যাগের ও বৃহত্তর ঐক্যের। আধ্যাত্মিকতা আমাদের শিখিয়েছে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’ অর্থাৎ গোটা বিশ্বই এক পরিবার। সেই উত্তরাধিকার বহনকারী একটি দল যখন কেবল ক্ষমতা দখলের অঙ্কে বাংলাকে ‘সোনা’ বানানোর কথা বলে, তখন তা আদতে ভারতের বৃহত্তর সত্তাকেই ছোট করে। মেধার উপস্থিতি যেমন বহুজাতিক কোম্পানিতে ভারতকে সম্মানিত করছে, রাজনীতির আঙিনাতেও তেমনই এক বিশাল হৃদয়ের প্রয়োজন। যতক্ষণ না ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি ছাপিয়ে ‘সোনার ভারত’ নির্মাণের প্রকৃত জাতীয়তাবাদী সংকল্প প্রধান হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে দেশবাসীকে সোনা কেনার প্রতি নিরুৎসাহ করার বিষয়টি বিশেষভাবে পশ্চিমবঙ্গবাসীর জনমনে বিশেষ কৌতূহল ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে মহালগ্নেই লগ্নভ্রষ্ট হবার ইঙ্গিত। ভারতীয় সংস্কৃতিতে সোনা কেবল অলঙ্কার নয়; বরং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়স্থল। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে অনেকেই ‘অকাল্পনিক’ মনে করছেন। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে দেশের গৌরব ও সম্পদ বৃদ্ধির কথা ছিল, সেখানে সাধারণের সঞ্চয়ে রাশ টানার ইঙ্গিত কেন? প্রধানমন্ত্রী নিজেকে ‘নন-বায়োলজিক্যাল’ বা জৈবিক অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে বলে দাবি করার পর থেকে বিতর্কের পারদ আরও চড়েছে। সাধারণ মানুষ আজ দ্বিধাগ্রস্ত, তারা কি এদেশের স্রেফ ভোটার, নাকি এক মহান আত্মিক জাতীয়তাবাদের অংশ? যদি জাতীয়তাবাদই শেষ কথা হয়, তবে কেন ‘সোনার ভারত’ গড়ার দৃপ্ত অঙ্গীকারের চেয়ে ভোটমুখী স্লোগানগুলো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?








