১৯ মে: ভাষা-সংস্কৃতি নিয়েও গণসংগ্রাম সম্ভব
ড. রমজান আলি: আসামের শিলচর স্টেশনের নামকরণ এখনো ‘ভাষা শহীদ স্টেশন’ হয়নি। দাবি অব্যাহত। যদিও সরকারি চাপে সেই দাবি কোথায় যেন ম্লান হয়ে এসেছে। রাজীবদা এখনো হাল ছাড়েননি। তার সঙ্গীসাথীরা অনেকেই তাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু দাবি? ১৯ শে মে প্রাক-পটভূমি ও ব্রিটিশ আমলে আসাম সীমান্ত ছিল অহোম, চুতিয়া, কামতা, কাছাড় ইত্যাদি ক্ষুদ্র রাজ্যের সমাবেশ। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ যখন তা দখল করে, তখন কাছাড় স্বতন্ত্রই ছিল। ১৮৭৪ সালে শিলংকে রাজধানী করে গারো, খাসিয়া, জয়ন্তিয়া ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার পাঁচ জেলা নিয়ে গঠন করা হয় আসাম। ‘অহোম’ শব্দ থেকে আসাম, নাকি ‘আস্ সাম’ শব্দ, যার অর্থ কী সুন্দর বা কী অপূর্ব থেকে এই নামকরণ হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। আর এদিকে ১৮৩২ সালে অধিকৃত কাছাড় ঢাকা প্রেসিডেন্সি থেকে শাসিত হত। তাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হল। শ্রীহট্ট, কাছাড়, গোয়ালপাড়া নিয়ে বৃহত্তর আসামকে দুটি উপত্যকায় ভাগ করা হয় – সুরমা উপত্যকা আর ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় (দেশবিভাগের সময়) শ্রীহট্টের করিমগঞ্জ মহকুমার সাড়ে তিন থানা কাছাড় সীমান্তে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং কাছাড় জেলার একটি মহকুমা বলে গণ্য হয়। আজ বরাক উপত্যকা গঠিত হয়েছে কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি নিয়ে। আর শ্রীহট্ট চলে গেল পূর্ব পাকিস্তানে বিভাজনকে কেন্দ্র করে শুরু হল বাঙালির ট্র্যাজেডি।

আসামে অসমীয় না বাঙালি, কাদের সংখ্যা বেশি? স্বাধীনতার আগে ১৯৩১ সালের জনগণনা অনুযায়ী সুরমা উপত্যকায় বাঙালি ছিল ২৮ লক্ষ ৪৮ হাজার ৪৫৪ জন, আর অসমীয়ার সংখ্যা মাত্র ৩,৬৯২ জন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাঙালি ১১ লক্ষ ৫ হাজার ৫৮১ জন, আর অসমীয়া ১৯ লক্ষ ৭৮ হাজার ৮২৩ জন। মোটের হিসাবে বাঙালিই বেশি। দেশ বিভাগকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের অনেক বাঙালিই আসামে আশ্রয় নিতে বাধ্য হল। বাঙালির সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক; কিন্তু ১৯৫১ সালের আসামের সেন্সস রিপোর্টে একটা ‘বায়োলজিক্যাল মিরাকল’ ঘটে যায়। বৃদ্ধির সূত্রে বাঙালির সংখ্যা যেখানে প্রায় ৪০ লক্ষ হওয়ার কথা, সেখানে কমিয়ে দেখানো হল ১৭ লক্ষ; আর অসমিয়ার সংখ্যা যেখানে হওয়া উচিত ২০ লক্ষ, তা বাড়িয়ে দেখানো হল ৪৯ লক্ষ। পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদের দ্বিতীয় নাগরিক বানানো হল। দেশ বিভাগের ২৫ দিন আগে গৌহাটির নারায়ণী হেণ্ডিক ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি ঘোষণা করলেন আসম হল ‘হোমল্যাণ্ড অফ দি ট্রাইবস্ এণ্ড রেস্’। বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে রাজ্যপাল তার ভাষণে বললেন, “দি নেটিভ অফ আসাম আর নাও মাস্টারস্ অফ দেয়ার ওন হাউস।’ অস্তিত্বের সংকটে পড়ে বাঙালিরা মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈর কাছে গেলে তিনি বললেন, “আসাম ইজ ফর আসামিজ”। ১৯৫৪ সালে গোয়ালপাড়ায় বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন ঘোষিত হলে শুরু হয় নারকীয় তাণ্ডব, দাঙ্গা। বাঙালিরা অসমীয়াকে আসামের সরকারী ভাষা হিসাবে মেনে নিল; কিন্তু তাদের দাবি বাঙালির সংখ্যা কম নয়, তাই বাংলা হোক দ্বিতীয় ভাষা।
১৯৫৭ সালের নির্বাচনে কাছাড়ের বদরপুর থেকে বিমলা প্রসাদ চালিহাকে ভোট দিয়ে বাঙালিরা বিধানসভায় পাঠালে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হলেন; কিন্তু বাংলাভাষা ও বাঙালিদের জন্য কিছু করলেন না। শুরু হল বাংলাভাষা ও বাঙালিদের জন্য আন্দোলন। ১৮ই মে যেদিন ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হল, সেদিন শিলচর শহরে অন্তত ১০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী মশাল মিছিল বের করল। ভাষা আন্দোলনে হাইলাকান্দিও পিছিয়ে ছিল না। পুরোভাগে ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী, কেশবচন্দ্র চক্রবর্তী, হরিদাস দেব, রথীন্দ্রকুমার সেন, নৃপেন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ নেতৃত্ব। চারদিন গ্রাম পরিক্রমার পর পদযাত্রীরা ফিরে আসেন। মাত্র সাড়ে তিন মাসের সংগঠন প্রায় ৫০ হাজার সত্যাগ্রহীকে নিয়ে ১৯শে মে কাছাড়ের সরকারি অফিস ও রেলপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এক সপ্তাহ আগে থেকেই রাজপথে সেনাদের রুট মার্চ শুরু হয়েছিল। কিন্তু কাছাড়ের ছাত্র-যুবদের ভয় দেখাতে পারেনি। একদিন আগে ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হলে প্রায় ১০ হাজার ছাত্র-যুব মশাল মিছিলে অংশ গ্রহণ করে। এই ভাষা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক ছিলেন গান্ধীবাদী সত্যাগ্রহী পরিতোষ পালচৌধুরী। তিনি তখন অন্তরালে থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাত্রি ১২ টার পর থেকেই শিলচর স্টেশনে রেললাইনে বসার নির্দেশ এল।
মেয়েদের মধ্যে এই আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন আলো পালচৌধুরী। সত্যাগ্রহীরা গিয়ে দেখলেন, তার আগেই পুলিশ-সেনা স্টেশন ঘিরে রেখেছে। ব্যারিকেড ভাঙ্গার দায়িত্ব নিলেন পরিতোষ বাবুর স্ত্রী আলো। মেয়েদের দ্বারা অসম সেনা পরাস্ত হল। ১৯মে সকাল থেকেই হাজার হাজার মা-বোন ঘর থেকে বের হয়ে আন্দোলনে অংশ নিলেন। সাড়ে পাঁচ হাজার মেয়ে ভলান্টিয়ার ছিলেন। কোন আন্দোলনে মেয়েদের এরকম স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এর আগে দেখা যায়নি। নির্দেশ এল, পুলিশ-সেনাদের উপর যেন কোন প্রকার হামলা না হয়। শান্তিপূর্ণ অবস্থানই চলছিল। ঘড়িতে তখন ২.৪৫ মিনিট। হঠাৎ করে সত্যাগ্রহীদের ধরে নিয়ে যাওয়া একটি গাড়ির ইঞ্জিনে আগুন লাগলে, আঁতকে উঠে একজন সেনাকর্তা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেন ‘ফায়ার’। সেনারা ভাবল, তাদেরকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হল। শুরু হল গুলিবর্ষণ। মাতৃভাষার মর্যাদার লড়াইয়ে শহিদ হলেন কমলা ভট্টাচার্য (বাংলাভাষা অন্দোলনের প্রথম মহিলা শহিদ)। এরপর একে একে শচীন্দ্র পাল, হীতেশ বিশ্বাস, সুকোমল পুরকায়স্থ, কুমুদ দেব, সত্যেন্দ্র দেব, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, বীরেন্দ্র সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, সুনীল সরকার প্রমুখ। আহত হলেন অনেক বাংলা ভাষাপ্রেমী মানুষ। ঈদানীং বিভিন্ন প্রদেশ জুড়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরাই আজও বেশি আক্রান্ত, বেশি দুর্দশাগ্রস্ত। গণ সংগ্রামের একটা পটভূমি তৈরি হচ্ছে সর্বত্রই। বলা যেতে পারে, বর্শাফলক স্নান করছে।








