প্রবাহমান জীবন এবং আমরা
আজিজ রসুল
ইংরেজ কবি জেওফ্রে চসার (Geoffrey Chaucer) ১৩৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর গল্পমূলক কাব্যগ্রন্থ ‘The Canterbury Tales’-এর এক জায়গায় লিখেছিলেন, “Time and tide wait for no man (none)”, যা আজ প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ সময় ও স্রোত কাহারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময় নদীর স্রোতের মতো প্রবাহিত। সময়কে সময় দিলে, সময়ও একদিন আমাকে তোমাকে সময় দেবে। তবে সময়ের শেষ নেই। আর আমাদের এই জীবনটা কীরকম? জীবন সময়ের কাছ থেকে কিছু দিনের জন্য ধার নেয় এবং জীবনের শেষ রয়েছে। আমাদের জীবন প্রবহমান। তার মানে হল জীবনের সেই ধারা, যেখানে সবকিছু ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, গতিশীল এবং অপ্রতিরোধ্য। নদীর জল যেমন এক মুহূর্তের জন্য থামে না, তেমনি জীবনও থামে না — সুখ, দুঃখ, সাফল্য, ব্যর্থতা সবই আসে এবং চলেও যায়।
প্রবাহমান জীবনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা বেশ গভীর। জীবন যেমন একটা নদীর মতো বয়ে চলে, আমরাও সেই স্রোতে ভেসে থাকি, কখনো স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে, কখনো স্রোতের বিপরীতে বা প্রতিকূলে গিয়ে। প্রবহমান জীবন মনে করিয়ে দেয় যে, সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, সবকিছুই বদলায়। আমরা যদি পরিবর্তনকে গ্রহণ করি, তবে মানসিক চাপ, দুঃখ, আশা সবকিছু সহজে মেনে নিতে পারি। কখনো জীবনের স্রোতের সাথে চললে, অর্থাৎ পরিস্থিতি মেনে নিয়ে এগিয়ে গেলে, কম শক্তি খরচ হয়। যেমন, প্রবাহের সাথে পাল তোলা নৌকা। কখনো আমরা নিজের লক্ষ্য, মূল্যবোধ বা স্বপ্নকে ধরে রাখতে স্রোতের বিপরীতে চলি। তখন লড়াই করতে হয়, কিন্তু এটাও জীবনের এক রূপ।
প্রবহমান জীবন মনে করিয়ে দেয় আমরা ক্ষণস্থায়ী। এটা আমাদের বর্তমান মুহূর্তকে বেশি করে উপভোগ করতে, সম্পর্কগুলোকে আরো গভীর ও নিবিড় করতে উৎসাহ দেয়। সুতরাং, প্রবহমান জীবনের ধারণা আমাদের সচেতনতা, গ্রহণশীলতা, এবং অভিযোজন শেখায়।
একটা জীবনে নানা কিছু পরিবর্তন ঘটে। সেটা যে কেউ তার নিজের জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝতে পারবে। কেবল যে দৈহিকভাবে ছোট থেকে বড় হচ্ছে তা-ই নয়, চরিত্রগত, সংস্কৃতিগত এবং মানসিকভাবেও পরিবর্তন ঘটতেই থাকে, যতক্ষণ না জীবনদীপ নিভে যাচ্ছে। শুধু সময়কেই বেঁধে রাখা যায় না। ইংরেজ কবি টেনিসনের ‘The Brook’ (ছোট নদী) কবিতায় ছোট নদী বলে, “..men may come and men may go, But I go on forever ” ঠিক সেভাবেই সময়ও বলতে পারে, সে-ও বয়ে চলেছে কত ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে। জীবনে অনেক বাঁক আসে। আর তা আসে সময়ের সাথে সাথে। এভাবেই সময় বয়ে চলেছে, কিন্তু জীবনের পুঁজি অর্থাৎ সময় বা আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাচ্ছে। মাঝ-খানে শুধু জীবনের কর্মের প্রতিফল রেখে যাচ্ছে, যার উপর ভিত্তি করে মানুষের বিচার করে পরবর্তী প্রজন্ম। এটাই চিরন্তন সত্য।
জীবনের বাস্তবতা বড় কঠিন। আমার আপনার ইচ্ছা বা প্রত্যাশা অনুযায়ী চলে না। নদীর মতোই এক এক সময় এক এক দিকে এঁকেবেঁকে চলে। আমাদের এই প্রবহমান জীবনের গতিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। নিজেকে সেই গতিতে মানিয়ে নেয়ার নামই বেঁচে থাকা। বেঁচে থাকার যুদ্ধে যৌবনের জোয়ারে প্লাবিত এ জীবন-নদীতে একদিন ভাটা পড়ে যাবে। যদি আমরা জীবন গঠন করতে চাই, তাহলে সময়কে গুরুত্ব দিয়েই গঠন করতে হবে। চলমান সময়ে এটাই জীবনের চাহিদা। সময়ের হারিয়ে যাওয়াকে ভুলে না গিয়ে আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে জীবন সাজাব। বেঁচে থাকাটাই অনেক বড় কথা। মানবিক বোধ, স্বনির্ভরতা, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাকেই বলে সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকা। আমরা অনেক সময় নিজের জন্যই কেবল বেঁচে থাকি। কিছুটা স্বার্থপরের মতো। কিন্তু অন্যের জন্য বেঁচে থাকাই সুন্দর। তাই নয় কি?
আমরা প্রায়শই দেখি মানুষের অহংকার এবং স্বার্থপরতা সর্বদা বিভাজন সৃষ্টি করে। সেইসঙ্গে তৈরি করে উদাসীনতা, বিদ্বেষ এবং হিংসার দেয়াল। অহংকার এবং স্বার্থপরতা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে, অন্যের প্রতি সহানুভূতি কমায়, এবং ‘আমি বনাম তারা’ মানসিকতা তৈরি করে, যা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতাকে ব্যাহত করে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। আমাদের চেষ্টা কী হবে? হ্যাঁ, আমাদের নিরন্তর চেষ্টা থাকবে আমাদের অহংবোধকে নিজের সীমার মধ্যে রাখা। আমি কী চেয়েছি, আর আমি কী পেয়েছি… এটাই যেন সবসময় মুখ্য বিষয় না হয়ে ওঠে। আমি নিজে কতটা বুঝছি, সেটাই আমাদের ভাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। আমাদের আয়ু আর কতদিন? সময় নষ্ট করার অর্থ নিজেকেই নষ্ট করা। সময়কে যদি কাজে লাগায়, জীবনও কাজে লাগবে। যে বেঁচে থাকায় কেবলই নিজের লাভসিদ্ধি, যে বেঁচে থাকায় যদি অন্যের জন্য ভাল কিছু বয়ে নিয়ে না আসে, সেই বেঁচে থাকাকে কি আমরা আসলেই বেঁচে থাকা বলব?
যারা লিও টলস্টয়ের ‘Three Questions’ গল্পটি পড়েছেন, তারা জানেন সেখানে তিনটি প্রশ্নের অন্যতম ছিল What was the most important thing to do? গল্পের শেষে উত্তর পাওয়া গিয়েছিল, “…and the most important affair is to do that person good, because for that purpose alone was man sent into this life.” এই যে অপরের ভাল করা, কারোর উপকারে লাগা এভাবেও আমরা বিষয়টাকে একটু আলাদাভাবে ভেবে দেখতে পারি। এই ভাল করার কাজে না থাকবে কোন ধর্ম, না থাকবে কোন জাত, আর না থাকবে কোন রাজনৈতিক রঙ। থাকবে কেবলই মানবধর্ম। পরোপকার মানবতার অলংকার। কবির কথা দিয়েই শেষ করি: ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি / এ জীবন মন সকলি দাও / তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও… আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে / সকলের তরে সকলে আমরা / প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’ প্রবাহমান জীবনে শুধু নিজেকে নয়, চারপাশের পৃথিবীকেও আলোকিত করার চেষ্টা করা উচিত। জীবনের স্বল্প পরিসরে কেবল নিজের জন্য বাঁচা নয়, বরং নিজের আলো দিয়ে চারপাশের পৃথিবী ও মানুষজনকে আলোকিত করা। আত্ম-উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজ ও অন্যের জীবনেও ভাল কিছু অবদান রাখা, যা জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে এবং সামগ্রিক কল্যাণ বয়ে আনে।








