ইসলামে বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ
পাশারুল আলম
নতুন পয়গাম: ইসলামে বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, বরং এগুলো সামাজিক, নৈতিক ও আইনি কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়, ভারসাম্য এবং মানবিকতার ওপর জোর দেয় এবং বিবাহ ও তালাকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। অন্যদিকে, ভারতের সাম্প্রতিক আইনি সংস্কার, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের অধিকার সুরক্ষা এবং তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ, এই বিষয়ে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই প্রবন্ধে আমরা ইসলামে বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভারতের আইনি কাঠামোর সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইসলামে বিবাহ; এক পবিত্র বন্ধন:
ইসলামে বিবাহ (নিকাহ) একটি পবিত্র চুক্তি, যা দু’জন মানুষের মধ্যে ভালবাসা, সম্মান, দায়িত্ব এবং প্রশান্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ বলেন, “আর তার নিদর্শন সমূহের অন্যতম হল তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জীবনসঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মাঝে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা রূম: ২১)। রাসূল (সা.) বলেছেন, “বিবাহ আমার সুন্নাত, আর যে আমার সুন্নাত থেকে বিমুখ হয়, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। এই বাণী থেকে বোঝা যায়, বিবাহ শুধু একটি সামাজিক রীতি নয়, বরং এক ধর্মীয় দায়িত্ব, যা মানুষকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের পথে পরিচালিত করে। বিবাহের উদ্দেশ্য হল চরিত্র সংরক্ষণ, সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে প্রজন্মের ধারাবাহিকতা, এবং পারস্পরিক ভালবাসা ও সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি। এটি শুধু শারীরিক সম্পর্কের বৈধতা নিশ্চিত করে না, বরং পারিবারিক জীবনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করে।
বিবাহের শর্তাবলি:
ইসলামে বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়, যেমন- স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি: পাত্র ও পাত্রী উভয়ের সম্পূর্ণ এবং স্বাধীন সম্মতি অপরিহার্য। জোরপূর্বক বিবাহ ইসলামে নিষিদ্ধ।
মাহর: বরের পক্ষ থেকে কনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ প্রদান করা ফরয বা আবশ্যিক, যা নারীর আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে।
সাক্ষী: কমপক্ষে দু’জন মুসলিম পুরুষ বা একজন পুরুষ ও দু’জন নারীর উপস্থিতিতে বিবাহ সুসম্পন্ন হয়।
ইজাব ও কবুল: পাত্র-পাত্রীর মৌখিক সম্মতির মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হয়। এই শর্তগুলো বিবাহকে একটি সুসংগঠিত ও ন্যায়ভিত্তিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বিবাহ বিচ্ছেদ; ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তি:
ইসলাম তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদকে অপছন্দনীয় হিসেবে বিবেচনা করে, তবে এটি এমন পরিস্থিতিতে বৈধ বলে গণ্য করে, যেখানে সমঝোতার জন্য শত চেষ্টার পরেও দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাদিসে বলা হয়েছে, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল বস্তু হল তালাক।” (আবু দাউদ)।
তালাকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এমন ক্ষেত্রে, যেমন- স্বামীর নির্যাতন, স্ত্রীর কর্তব্যচ্যুতি, মানসিক বা শারীরিক অসুস্থতা, বিশ্বাসঘাতকতা বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব। তবে, তালাকের অপব্যবহার রোধে ইসলাম সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করেছে।
তালাকের প্রক্রিয়া:
ইসলামে তালাকের তিনটি প্রধান প্রক্রিয়া রয়েছে- (১)স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক: স্বামী তার স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে তালাক দিতে পারেন। তবে এটি তিনটি পৃথক পর্ব বা পর্যায়ে দেওয়া উচিত, যেখানে প্রতিটি তালাকের পর ইদ্দতকাল অতিক্রম করতে হয়। একবারে তিন তালাককে বলা হয় ‘তালাক-ই-বিদআত’, এক বৈঠকে এভাবে তালাক দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ ও গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। (২) স্ত্রীর পক্ষ থেকে খোলা তালাক: স্ত্রী যদি বিবাহ বিচ্ছেদ চান, তবে তিনি মাহর ফিরিয়ে দিয়ে বা স্বামীকে কিছু দিয়ে খোলার মাধ্যমে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। এবং (৩) ফাসখ বা ইসলামী আদালতের মাধ্যমে তালাক: চরম অবিচারের ক্ষেত্রে ইসলামী বিচারক বা কাজী বিবাহ ভঙ্গ করতে পারেন।
ইদ্দত; নারীর নিরাপত্তার জন্য একটি ব্যবস্থা:
তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যা ‘ইদ্দত’ নামে পরিচিত। এর সময়কাল নির্ভর করে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর। যেমন- তালাক প্রাপ্ত মহিলার জন্য তিনটি হায়েয/মাসিক চক্র। গর্ভবতী মহিলার জন্য সন্তান জন্ম পর্যন্ত। স্বামীর মৃত্যুর পর চার মাস দশ দিন। ইদ্দত নারীর আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং পুনর্বিবাহের আগে সম্পর্কের স্পষ্টতা ও সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণে সহায়তা করে।
নারী-পুরুষের অধিকার ও সামাজিক গুরুত্ব:
ইসলাম বিবাহ ও তালাকের ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষ উভয়ের অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। স্বামীর দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে রয়েছে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, সঠিক পথে পরিচালনা এবং সম্মানজনক আচরণ। স্ত্রীর অধিকারের মধ্যে রয়েছে মাহর, ভরণ-পোষণ, শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা এবং সম্মান। এই অধিকারগুলো পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।
ইসলামে বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত নীতিমালা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা সুনিশ্চিত করে। এই মৌলিক নীতিগুলো পরিবার ভেঙে পড়া রোধ করে, নারীর সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করে এবং তালাকের অপব্যবহার প্রতিরোধ করে।
ভারতের আইনি কাঠামো: মুসলিম বিবাহ ও তালাক:
ভারতে মুসলিম পার্সোনাল ল’ (শরীয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট-১৯৩৭ অনুযায়ী, মুসলমানদের বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও ওয়াকফ বিষয়ে শরীয়তের বিধান প্রযোজ্য। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে তিন তালাকের অপব্যবহার রোধে ভারত সরকার একটি আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
মুসলিম ওমেন (প্রোটেকশন অফ রাইটস অন ম্যারেজ) অ্যাক্ট-২০১৯:
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে একবারে তিন তালাককে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে ‘মুসলিম ওমেন প্রোটেকশন অফ রাইটস অন ম্যারেজ অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের মূল বিষয়গুলো হল: একবারে তিন তালাক (তালাক-ই-বিদআত) অবৈধ ও অপরাধ হিসেবে গণ্য। এই ধরনের তালাক প্রদানকারী স্বামীকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান। তালাকপ্রাপ্ত মহিলা ভরণ-পোষণ (অলিমনি) এবং সন্তানের হেফাজত দাবি করতে পারেন — এই আইন মুসলিম নারীদের অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বলা হলেও এই আইন একতরফা বলে সমালোচিত হয়েছে। প্রয়োজনীয় তালাক বিবেচিত হয়নি। তার সঙ্গে যে ব্যক্তি তিন বছর জেলে থাকবে, সেই ব্যক্তি কীভাবে খোরপোষ দেবে, তার ব্যাখ্যা নেই। এটি ইসলামী শরীয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তবে শরীয়তী আইন একবারে তিন তালাককে গর্হিত অপরাধ বলে বিবেচনা করে।
ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে বিতর্ক:
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ (ইউসিসি) বা ‘অভিন্ন নাগরিক বিধি’ প্রণয়ন বিষয়ে বিতর্ক চলছে। এই প্রস্তাবিত আইনের লক্ষ্য হল সব ধর্মের মানুষের জন্য বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে একটি সাধারণ আইনি কাঠামো প্রণয়ন। তবে, এটি মুসলিম-সহ বৃহত্তর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আশঙ্কা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকে মনে করেন, এটি শরীয়তের ওপর ভিত্তি করে তাদের ব্যক্তিগত আইনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। অন্যদিকে, সমর্থকরা বলেন, এটি লিঙ্গ সমতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। এই বিতর্ক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো এবং সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রশ্ন তুলেছে। বৈচিত্রময় ভারতবর্ষে অভিন্ন দেওয়ানী বিধি চালু করা অসম্ভব। এই আইন লাগু হলে শুধুমাত্র মুসলিম সমাজ সমস্যায় পড়বে, তা নয়। আদিবাসী, দলিত, উপজাতি এবং অন্যান্য জনজাতিগুলির যে নিজস্ব নিয়ম কানুন রয়েছে, সেসব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তাই এই ধরনের আইন সমাজ, ঐতিহ্য, প্রথা ও সংস্কৃতির বিপরীতে যাবে বলে অনেকেই মনে করেন।
অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইন:
স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট-১৯৫৪: ধর্ম নির্বিশেষে রেজিস্ট্রি বিবাহের সুযোগ প্রদান করে। প্রোহিবিশন অফ চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট-২০০৬: নাবালক/নাবালিকা বিবাহ নিষিদ্ধ করে। প্রোটেকশন অফ উইমেন ফ্রম ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট-২০০৫: গার্হস্থ্য সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীদের সুরক্ষা প্রদান করে।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামে বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। বিবাহের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠিত হয়, আর তালাকের নিয়মাবলি ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করে। এই নীতিগুলো পারিবারিক জীবনে ভালবাসা, সম্মান ও দায়িত্বের শিক্ষা দেয়। ভারতের আইনি সংস্কার, বিশেষ করে তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ, মুসলিম নারীদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে দাবি করা হলেও এই আইনে অনেকগুলি বিতর্কিত বিষয় থেকেই গেছে। তবে, ইউনিফর্ম সিভিল কোডের মতো বিষয়গুলো ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আধুনিক ন্যায়বিচারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। একটি ন্যায়সঙ্গত সমাজ গঠনে ইসলামী নীতিমালা এবং আধুনিক আইনের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।








