ব্যাঙ্ক, সুদ ও ইহুদি
বিশ্বে সর্বপ্রথম সুদভিত্তিক অর্থনীতি চালু করেছিল ইহুদিরা। ইতিহাস তা-ই বলে। বর্তমান বিশ্বে যে সুদভিত্তিক অর্থনীতি এবং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা রমরমিয়ে চলছে, সেটা হল ইহুদিদের মস্তিষ্ক প্রসূত। ইহুদি ধনকুবের মেয়ার রথসচাইল্ডের পত্তন করা আধুনিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এই মুহূর্তে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বিশ্ববাজারকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছে। তার থেকেও বলা ভাল, বিশ্বকে আর্থিকভাবে শাসন ও শোষণ করছে।
পরবর্তীতে আরেক ইহুদি ধনকুবের জেকব বা ইয়াকব হেনরি শিফ তার পূর্বসূরি রথসচাইল্ড প্রবর্তিত ব্যবস্থাটিয় বহু আকাঙ্ক্ষিত মাত্রা যোগ করেন, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত জরুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভ আইন পাস করিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে এটা অত্যন্ত সুকৌশলে করা হয়েছিল। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়, যার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাজনী শক্তির ছড়ি ঘোরানো সুনিশ্চিত হল।
১৯১৩ সালে এই আইন পাস করিয়ে নেওয়ার নেপথ্য কাহিনি বেশ জটিল। ইহুদি ধনকুবের জেকভ শিফ স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে উড্রো উইলসনকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রোমোট করেছিলেন। কীভাবে? মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ফাণ্ডিং করে সমগ্র নির্বাচন ব্যবস্থা তথা মার্কিন জনতার মগজকে উইলসন-ময় করে দিয়ে! আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা যাকে গণতন্ত্র বলে জানি, মাথায় তুলে রাখি, সেটিও এই মহাজনী শক্তির দ্বারা পরিচালিত ‘মিডিয়া যার, গণতন্ত্র তার’ সেটিকে পুরোপুরি হস্তগত বা কুক্ষিগত করে জেকব শিফ নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে জিতিয়ে এনেছিলেন। উড্রো উইলসনও কথা রেখেছিলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই পাস করিয়ে নিয়েছিলেন ফেডারেল রিজার্ভ আইন। এই মহামান্য জেকব শিফের কীর্তিকলাপের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ইনিই লেনিন, ট্রটস্কির বলশেভিক পার্টিকে ব্যাপক হারে ফাণ্ডিং করে রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পতন ঘটান, যার ফলশ্রুতিতে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার উত্থান। যদিও ক্ষমতা দখলের পর লেনিন তাঁবেদারি করতে অস্বীকার করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে, শুরু হয় ঠাণ্ডা লড়াই। এই কারণেই ১৯৪৭ সালের মহাজনী স্বপ্ন GATT রূপায়ণ বিলম্বিত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যা নবকলেবরে WTO নামে (1995) আত্মপ্রকাশ করে। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।
ইহুদি ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার অমানবিক, পৈশাচিক বিষদাঁত ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যেই ইসলামী শরীয়াহ ব্যাঙ্কিংয়ের আইডিয়া বা কনসেপ্ট। সুদকে প্রত্যাখ্যান করে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে মানবিক মুখ দেওয়ার আর্তি। শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এই বিপদটি তাঁর সময়েই উপলব্ধি করেছিলেন বলেই সুদ এবং সুদখোরদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে বলেছেন, বার বার সতর্ক করে গেছেন। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছেন এদেশের মুসলমান সম্প্রদায়। যাতে সুদবিহীন ইসলামী অর্থনীতি বা ইসলামী ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাও পাশাপাশি রাখা যায়।
বলাবাহুল্য, এই প্রস্তাব বারে বারে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কেন্দ্র সরকার দ্বারা। কারণ, এর অনুমোদন মানেই প্যান্ডোরা বক্স খুলে দেওয়া। ইহুদি ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় বিন্দুমাত্র আঁচড় ওরা বরদাস্ত করবে না। ফলে এদেশের অসংখ্য মুসলমান এখনও “আধুনিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার” বাইরে। তাঁরা একে বর্জন করে চলেছেন, অথবা অংশগ্রহণ করলেও উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও সুদ গ্রহণ করেন না, করলেও নিজের গরিব, দুস্থ, অসহায় মানুষদের সেবায় অকাতরে বিলিয়ে দেন। শোনা যায়, ২০২২ সালের শেষে এমনই দেশের বিভিন্ন ব্যাঙ্কে ৬৫ লক্ষ কোটি টাকা পড়ে আছে, যেটা মুসলিমদের সঞ্চয়ের ওপর প্রাপ্য সুদ। তারা এই হারাম টাকা নেয়নি, তাই পড়ে আছে বিভিন্ন ব্যাঙ্কে।
অবশ্য প্রত্যেক মুসলমানই এমন করেন না। অর্থাৎ অনেক মুসলমানই সুদ নেন। আধুনিকতা বা প্রগতির হাওয়া এই সম্প্রদায়টিকেও প্রভাবিত করছে, করে চলেছে। ইহুদি ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার জয়জয়কার নিশ্চিত করার জন্য মূল প্রতিপক্ষকে পরাজিত, পদানত করা জরুরি। কারা এই প্রতিপক্ষ? এর উত্তর জলের মতোই সহজ। সেটা হল ইসলাম ধর্ম। একমাত্র এই মতাদর্শেই সুদকে হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইসলামের অর্থনীতি হল বিনাসুদী বা সুদবিহীন অর্থনীতি। সুদের বিপরীতে ইসলামের কনসেপ্ট হল যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি। তাই ইসলামের শরীয়াহ আইনে সুদকে হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুদ গ্রহণ বা ভক্ষণের পাপ বহুমুখী এবং ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে জীবনবিধান আল কুরআনে। আর এখানেই ইসলামের সঙ্গে অন্যান্য সমস্ত মতবাদ বা মতাদর্শের সংঘাত। বিশেষ করে ইহুদিদের সুদভিত্তিক অর্থনীতি বা সুদী ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের সঙ্গে বিশ্বজুড়েই ইসলামের স্নায়ুযুদ্ধ সংঘর্ষ প্রবল। তাই ইহুদি লবি যেখানে পুঁজিবাদের পৃষ্ঠপোষক বা যায়নবাদের মূল ভিত্তি যেখানে সুদ ও পুঁজিবাদ, সেখানে ইসলামের নীতিমালা সুদের ঘোরতর বিরোধী। এই কারণেই আদর্শিকভাবে যায়নবাদের চোখের বালি হল ইসলাম। আর সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের চোখের মণি হল যায়নবাদ। ইসলামের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের দ্বন্দ্বের নেপথ্যে সবার আগে এই ক্রনোলজি বুঝতে হবে। এর জন্য অবশ্যই এলেম লাগবে। আর সে জন্য প্রয়োজন থার্ড আই এবং সিক্সথ সেন্স। নেহাৎ কমন সেন্স দিয়ে এটা বোধগম্য হবে না।








