ওয়াকফ-বন্দির নেপথ্য কোন অভিসন্ধি
দেবদুলাল চট্টরাজ
বেশ কয়েক মাস ধরে দেখছি ওয়াকফ ইস্যুতে গোটা দেশ উত্তাল। বিভিন্ন রাজ্যে মূলত মুসলিম ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো প্রতিবাদ, বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মূল দাবি হল, মোদি সরকারের আনা বিতর্কিত অভিসন্ধিমূলক সংশোধিত ওয়াকফ আইন বাতিল বা প্রত্যাহার করতে হবে।কারণ, সংবিধান প্রদত্ত অধিকার হল, যে কোনও ধর্মের মানুষ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে স্বাধীনভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবে। সেখানে সরকার বা রাষ্ট্রের খবরদারি বা কর্তৃত্ব কায়েম ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান সকল ধর্মের মানুষকেই সেই অধিকার ও স্বাধীনতা দিয়েছে। যদি কোথাও গুরুতর কোনও অনিয়ম বা বেআইনি কাজ হয়ে থাকে তবে সরকার অবশ্যই আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সরকার যদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের থেকে কেড়ে নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায় তাহলে বুঝতে হবে সরকার নিজেই সংবিধানকে অস্বীকার করছে, সংবিধানের বিরুদ্ধাচারণ করছে। সেক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করবে, এটাই স্বাভাবিক। যথারীতি সুপ্রিম কোর্ট সেটাই করেছে।
মোদী সরকারের তৈরি করা ওয়াকফ সংশোধনী আইন-২০২৫ এর কয়েকটি বিতর্কিত ধারা অন্তর্বর্তীকালীন রায় স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। যে ধারাগুলি স্থগিত হয়েছে, তার সবগুলি সম্পর্কেই গুরুতর আপত্তি জানিয়েছিল বিরোধী দলগুলো। সরকার সেগুলিকে বিবেচনার ন্যূনতম আগ্রহ না দেখিয়ে পত্রপাঠ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রমাণ হয়ে গেছে মুসলিমদের দাবি এবং বিরোধীদের অভিযোগই সঠিক ছিল। সেদিন যদি কেন্দ্র সরকার এসব দাবি ও মতামতকে গুরুত্ব দিত, তাহলে আজ এমন বেইজ্জত হত না।
মূলত দু’টি প্রধান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সরকার সংবিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তড়িঘড়ি ওয়াকফ আইন সংশোধনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। প্রথমত, সংখ্যালঘু মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে দেশজুড়ে ধর্মীয় বিরোধ ও সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করা। তাতে প্রবল বিদ্বেষ-ঘৃণার আবহে ধর্মীয় বিভাজন ও মেরুকরণ তীব্র করা যাবে। আরএসএস-বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির স্বার্থেই সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় পরিসরে হস্তক্ষেপ করার ব্যবস্থা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ওয়াকফের অধীনে সারা দেশে বিপুল সম্পত্তি আছে। মূলত শহরাঞ্চলে এই সম্পত্তির মূল্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকা। মোদি সরকারের শকুনের নজর পড়েছে এই বিপুল পরিমাণ ধর্মীয় সম্পত্তির দিকে। ছলে বলে কৌশলে ওয়াকফ থেকে এসব জমি সরকারের হাতে এনে তারপর বেসরকারি কর্পোরেট ও প্রোমোটারদের হাতে তুলে দিতে চায় কেন্দ্র সরকার। একদিকে বেসরকারি সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় লোভনীয় জমি পাবে অপেক্ষাকৃত কম দামে, আর সরকার ফাঁকতালে পেয়ে যাবে মোটা টাকা।
সংবিধানকে উপেক্ষা করে এই দুই প্রধান উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই আইন সংশোধন করা হয়। ওয়াকফের হাতে নতুন করে সম্পত্তি আসা ঠেকাতে শর্ত যুক্ত হয় যে, অন্তত পাঁচ বছর মুসলিম ধর্মাচরণ না করলে ওয়াকফে সম্পত্তি দান করা যাবে না। বিতর্কিত ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে জেলাশাসকের হাতে। অর্থাৎ আজ্ঞাবহ আমলাকে দিয়ে ওয়াকফ সম্পত্তি হাতিয়ে সরকারের অধীনে আনার হীন কৌশল নিয়েছে কেন্দ্র। কোনও জমি সরকার দখল করতে চাইলে কাউকে দিয়ে অভিযোগ দাখিল করে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সেই জমি জেলাশাসক সরকারের অধীনে নিয়ে আসতে পারবেন।
পাশাপাশি কেন্দ্র ও রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য বাড়িয়ে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাত থেকে কেড়ে নেবার ফন্দি আঁটছে মোদি-শাহরা। অমুসলিম বেশি থাকলে মুসলিমদের ধর্মীয় সংস্থা পরিচালনায় মুসলিমদের ভূমিকা কমে অমুসলিমদের ভূমিকা বাড়বে। অথচ হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি বা শিখ, পাঞ্জাবি, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় সম্পত্তি নেহাৎ কম নয় অথচ কোন ধর্মের ক্ষেত্রেই তাদের ধর্মীয় সম্পত্তির পরিচালন কমিটিতে মুসলিম বা ভিন্ন ধর্মের লোকদের রাখা হয়নি। এটা কেউ মেনেও নেবে না। অবলা ও অভিভাবকহীন মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর এই খাঁড়া নামিয়ে এনেছে হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার। সংবিধান সংশোধন করে এই তিনটি ধারা যুক্ত করেছে বর্তমান কেন্দ্র সরকার। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত তিনটি ধারার ওপরেই আপাতত স্থগিতাদেশ দিয়েছে। বাকি ধারাগুলি নিয়ে অবশ্য কোর্ট হস্তক্ষেপ করেনি। যদিও মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এবং মুসলিম সংগঠনগুলো, বিরোধী দলগুলো গোটা সংশোধনী আইনটাকেই বাতিল করার দাবিতে সরব হয়েছে।








